Saturday, February 24, 2018

অনু গল্প / অগোছালো ঘর / রীনা রায় ।



ঘড়িতে এখন দুপুর বারোটা, সারাটারাত বিছানায় শুধু এপাশ ওপাশ করে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলো শুভ, ঘুম ভাঙতে দেখে সকাল পেরিয়ে ঘড়ির কাঁটা দুপুর ছুঁতে চললো।
প্রথমেই মনে হল পৌষালি ওকে এখনও ডাকেনি কেন? আজ কি রবিবার? 
আস্তে আস্তে সব মনে পড়লো, পৌষালি নেই, কেউ ওকে ঘুম থেকে তুলে দেওয়ার নেই, কেউ চা বানিয়ে দেওয়ার নেই। ওহো, খেতে হবে কিছু এখন । কি খাবে শুভ এখন? 
ফ্রীজে কি কিছু আছে? আচ্ছা, কাজের মেয়েটাও তো এলোনা, ও কি বেল বাজিয়ে ফিরে গেছে? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে শুভর মনে হল, আগে স্নানটা সেরে আসি।
ঘরের দিকে তাকাতেই চারিদিকে এলোমেলো জিনিসপত্র নজরে পড়লো।কাল বিকেলে ওরই ছুড়ে দেওয়া জিনিসগুলো কিরকম ওর দিকেই তাকিয়ে আছে দেখো! 
উঠে গিয়ে মোবাইলটা আগে তুললো শুভ--না ভাঙেনি, যাক! 
মনে পড়লো পৌষালির সাথে কালকের ঝগড়া।
'রোজ তোমাকে একই কথা বললেও শুনতে পাওনা নাকি ইচ্ছে করেই করো? জুতোটা জায়গায় রাখতে কতটুকু সময় লাগে বলোতো? আর ঐ নোংরা মোজাগুলো জুতোর মধ্যে ঢুকিয়ে রেখোনা---"
অফিসে বসের কাছে অকারণে কথা শুনতে হয়েছিল, শুভর মেজাজ এমনিই খারাপ ছিল, সেই মুহূর্তে পৌষালির এই পরিষ্কার পরিষ্কার বাতিকটা অসহ্য লাগছিলো।
এমনিতেই ও চিরদিনই একটু অগোছালো স্বভাবের, আর পৌষালি সম্পূর্ণ বিপরীত প্রকৃতির। সবসময় সবকিছু পারফেক্ট হওয়া উচিত, এতটুকু নোংরা ও সহ্য করতে পারেনা। 
শুভ চেঁচিয়ে উঠেছিল, ঘরের সমস্ত জিনিস টান মেরে ছুড়ে ফেলে বলেছিলো, "বেএএশ করবো, নোংরা করবো।এটা আমার বাড়ি, আমি এইভাবেই থাকবো। তোমার যদি না পোষায় তুমি চলে যেতে পারো।''
পৌষালির মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোয়নি, জলভরা চোখে অপার বিস্ময় নিয়ে শুভর দিকে তাকিয়েছিলো।তারপর,নিজের ব্যাগ নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেছিলো, শুভর সামনে দিয়েই।
শুভ বাধা দেয়নি। দরজা বন্ধ করে শুভ সেই যে শুয়েছে উঠলো আজ দুপুর বারোটায়।
হঠাৎই শুভর মনে হলো আচ্ছা, পৌষালি তো বেশি কিছু চায়না, সত্যি ও ঘরটাকে কি সুন্দর গুছিয়ে রাখে! 
শুভ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব জিনিস একটা একটা করে গুছিয়ে তুলে রাখলো! পৌষালির মতো হল কি? 
-----
পৌষালির কাল থেকে সমানে মনে হচ্ছে, সবসময় এতো টিপটপ থাকা, এতো গুছিয়ে রাখা এগুলো কি সত্যিই ওর বাতিক হয়ে যাচ্ছে? 
থাক না শুভ একটু অগোছালো, একটু এলোমেলো -- কিই বা ক্ষতি তাতে? 
শুভকে ছাড়া ও তো বাঁচতে পারবেনা! 
হঠাৎ কি খেয়াল হলো ঘরের সব জিনিস এলোমেলো করতে লাগলো-ওর কান্ড দেখে পৌষালির মা অবাক হয়ে গেল, "কিরে, কি হয়েছে তোর? ঘরদোর এলোমেলো করছিস কেন? "
"থাক না মা একটু এলোমেলো --কিই বা ক্ষতি তাতে! "
---
মোবাইলটা বেজে উঠতেই পৌষালি দেখলো শুভর ফোন --ফোন রিসিভ করেই বলে উঠলো, "শোনো, তুমি না তোমার মতোই থেকো, আমি তোমাকে আর কোনোদিন কিছু বলবোনা! "
"পাগলি একটা! কখন আসবে তুমি? তুমি না এলে তোমার শুভকে কে দেখবে--আমাদের ঘরটা তুমি ছাড়া এত সুন্দর করে কে সাজাবে হুঁ? ----"
----
শুভ দরজা খুলতেই পৌষালি অবাক হয়ে দেখে ঘরের প্রতিটি কোণা ঝকঝক করছে,যেন এইমাত্র ও নিজেই ঘর গুছিয়ে রেখেছে! 
''কি ম্যাডাম,সব ঠিক আছে তো?" "কে করলো? মিনা তো আজ কাজে আসবেনা বলেছিলো--"
"কেন ম্যাডাম, এতদিন ধরে এই অধমকে তাহলে কি ট্রেনিং দিলেন! "
"তুমি?!! তুমি করেছো? আমি তো ভাবতেই পারছিনা--"
--
এরপর দুজন দুজনের মধ্যে এক আকাশ ভালবাসা খুঁজে পায়।
বাইরে বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাস, কাছেই কোথাও কোকিল ডেকে ওঠে।
শুধু বাইরে নয়, শুভ-পৌষালির ঘরেও তখন চিরবসন্ত!

No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া