Friday, February 24, 2017

গল্প / গঙ্গাপ্রসাদ / নারায়ণ রায়।



বাঁকুড়া জেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম পলাশ ডাঙ্গা, আর সেই গ্রামের ছোট্ট একটি ছেলে গঙ্গাপ্রসাদ মুখার্জি। দামোদরের একদিকে বাঁকুড়ার পলাশডাঙ্গা আর অপর প্রান্তে বধর্মান জেলার কাঁকসা। গঙ্গা বড়দের কাছে শুনেছে দামোদর নদ পার হয়ে ওপারে গিয়ে কাঁকসা থেকে রেল গাড়ি চেপেই যাওয়া যায় কলকাতায়। তখনও বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন চালু হয়নি। বাষ্প ওড়াতে ওড়াতে সে ট্রেন যন্ত্রের সাহায্যে ছুটে চলে। সেটা বিংশ শতাব্দীর মাঝা মাঝি। তখন ভারত সবে স্বাধীন হয়েছে।


গঙ্গাপ্রসাদের গ্রামের যারা কলকাতায় থাকে তাদের মুখে সে শুনেছে যে কলকাতায় নাকি হাওয়ায় টাকা ওড়ে শুধু ধরে নিতে জানতে হয়
সেই কলকাতায় যাওয়ার জন্য গঙ্গা প্রসাদের যেন আর তর সয় না গঙ্গা প্রসাদ তার সমবয়সী বন্ধুদের বলে, “জানিস একদিন আমি ওই নদ পার হয়ে কলকাতায় চলে যাব। তারপর অনেক অনেক টাকা রোজগার করব।তবে তার এই কথায় সমবয়সী ইয়ার বন্ধুরা কেউ তেমন উৎসাহ দেয় না। বরং সবাই তাকে উপহাস আর বিদ্রূপের করে; তবে কথাটি যখন তার খেলার সাথী দশ বছর বয়সের সুলতাকে বলল, তখন সুলতা বলল, “সেই ভা্ল, তবে আমাকে কলকাতায় নিয়ে যাবে তো?” গঙ্গা গম্ভীর মুখে বলে, “দূর বোকা কলকাতায় মেয়েরা যায় না সেখানে শুধু পুরুষ মানুষরা যায়।বারো বছর বয়সের গঙ্গা- মুখে পুরুষ মানুষ শব্দটা শুনে সুলতারও কেমন যেন হাসি পেল। সুলতার মা তার বাবা-কে বলে, ‘পুরুষ মানুষ সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে লজ্জা করে না’? বাইরে বেরিয়ে কিছু কাজ কর্ম তো করলে পার? কিন্তু সুলতার দাদাকে তো কোনদিন ওর মা পুরুষ মানুষ বলে না ? তাকে বলেছেলেরা সংসারে কত কাজ করে আর তুই সারাদিন শুধু ঘুরে ঘুরে বেড়াস’?


সেই গঙ্গা একদিন আরো বড় হল, গ্রামের পাঠশালার পাঠ শেষ করে বাবার কাছে কিম্বা খুড়োর কাছে তাদের পৈত্রিক চাষ বাস সংক্রান্ত কাজকর্ম শিখে নিলো এখন সে ষোল বছরের তরতাজা কিশোর। কিন্তু এখনও সে মাথায় সযত্নে দুটি জিনিস পোষন করে চলেছে। এক নম্বর হচ্ছে যত দিন যাচ্ছে সুলতা যেন তার মাথায় আরও বেশী করে চেপে বসছে। এমন কোনদিন নেই ওর মাথায় সুলতার মুখ-টা ভেসে ওঠে না। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে কলকাতা যাওয়ার সেই সুপ্ত বাসনা, এবং দিন দিন দুটি বাসনাই যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ইতিমধ্যে সুলতার বয়স চোদ্দ বছর হল, সেই যুগে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বয়সের পরেও কুমারী রাখা আর সমাজে একঘরে হয়ে যাওয়া প্রায় সমার্থক। শেষে একদিন গঙ্গা ঠিক করেই ফেলল, আপাতত সে কলকাতাতেই চলে যাবে এবং কিছু পয়সা উপার্জ্জন করে গ্রামে ফিরে আসবে। গঙ্গা প্রভুত অর্থের মালিক হলে সুলতা নিশ্চই সব কিছু মেনে নেবে। সুলতারাও ব্রাহ্মণ, দেখতে ভাল ওর বাবার গ্রামে বেশ প্রতিপত্তি আছে তাই গঙ্গার আশা দুই পরিবারের তরফ থেকে কোন রকম বাধা আসবে না। শুধু একটা বছর কোনরকমে সুলতার বিয়েটা আটকে রাখা


একদিন গঙ্গার মনের কথা সুলতাকে বলতেই, সুলতা চোখের জলে তাকে একটাই উত্তর দিল..., “তুমি আমাকে কেনার জন্য কত টাকা দেবে গঙ্গা-দা ?” গঙ্গা উত্তেজিত হয়ে বলে, “ছি! সুলতা, কথা তুই কি করে বললি ? তোকে কি আমি টাকা দিয়ে কিনব বলেছি? তুই কি জানিস কোন মেয়েরা টাকার বিনিময়ে বিক্রী হয় ?” সুলতা তার উত্তরে খুব শান্ত ভাবেই বলল, “বিলক্ষন জানি, আর জানি বলেই তো আমার মনে এত শঙ্কা। তোমরা ছেলেরা প্রেম, ভালবাসার সঙ্গে টাকাকে বড্ড গুলিয়ে ফেলো। তোমাদের কাছে প্রেম ভালবাসা মানে শুধুই টাকা আর শরীর।


একথা শুনে আরও উত্তেজিত হয়ে গঙ্গা বলল, “ছি সুলতা ছি ! তোর এত অবনতি? তুই কি বলতে চাস যে আমি তোর শরীরটা একদিন পাব সেই আসায় প্রতিদিন তোর কাছে আসি?” হঠাৎ উত্তেজিত গঙ্গা কাঁপতে কাঁপতে বলল, “একমাত্র বেবুশ্যে মেয়েরাই এই ধরনের কথা বলে, তা এই ব্যবসা তুই কতদিন হল শুরু করেছিস?” কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যাবার পরই গঙ্গাপ্রসাদ বুঝতে পারল কি মারাত্মক কথা ওর মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু তার উত্তরে সুলতা এতটুকুও উত্তেজিত না হয়ে বলল, “এখনও শুরু করিনি তবে যদি কোনদিন শুরু করি , জানবে সেদিন তুমিই হবে আমার প্রথম খদ্দের।


সারা রাত এক সুতীব্র অনুশোচনা যেন গঙ্গা প্রসাদের শরীর মনকে জ্বালিয়ে দিতে থাকল। সারা রাত্রি এক ফোঁটা ঘুম হল না। অন্ধকার থাকতেই ভোর বেলায় সবার অলক্ষে গঙ্গা কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তখন ভারত সবে স্বাধীন হয়েছে, সীমিত ক্ষমতার মধ্যেই সরকার দেশ গঠনের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। তার উপর ওপার বাংলা থেকে এসেছে লক্ষ লক্ষ শরনার্থী, তাদের পুনর্বাসন দরকার। বিভিন্ন উদবাস্তু ক্যাম্প গুলোতেও প্রচুর কাজ হচ্ছে। এক কথায় ঠিকাদার দের তখন পোয়াবারো। গঙ্গা তেমনই একটি ঠিকাদার সংস্থায় সামান্য বেতনের চাকরিতে ঢুকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বেশ কয়েক বছর চাকুরিতে রত থেকে বেশ কিছু অর্থের মালিক হল।


মনের জোরে ইচ্ছে করেই এত দিন গ্রামে ফেরেনি। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেও ভাল ছিল না, গ্রামে তার পিতা মাতা এবং গ্রামের অন্যান্য সকলে গঙ্গা চিরকালের জন্য নিরুদ্দেশ ধরে নিয়েই তার প্রত্যাবর্তের আশা ত্যাগ করে দেয়। শুধু সুলতা বিবাহের পরেও আজও প্রতিদিন গঙ্গা নাম জপ করে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে চলেছে। তবে কলকাতা শহরে সে নিজেকে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করে প্রায় পাঁচ বছর পরে প্রথম বার বাঁকুড়ায় নিজের গ্রামে ফিরল এবং আত্মীয় পরিজন দের সঙ্গে সাক্ষাত করে সুলতার বিবাহের খবর শুনে কিছুদিনের মধ্যেই আবার কলকাতায় ফিরে এল। এবার যেন আরও বেশী করে কাজকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং স্বীয় ক্ষমতায় অল্পদিনে নিজেই একটি ঐরূপ একটি ঠিকাদরি সংস্থা খুলে ফেলল। কিছুদিনের মধ্যেই প্রচুর টাকা উপার্জ্জন করে সে কলকাতা উচ্চবিত্ত সমাজে তার স্থান পাকা করে নিল। কলকাতা শহরে তার তখন তিনটে বাড়ি দুটি গাড়ি।


এই ভাবে চলতে চলতে একদিন মধ্য চল্লিশের গঙ্গা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ করল তার মাথার চুলে পাক ধরেছে চোখের কোনে শরীরের উপর অত্যাচারের লক্ষণ স্পষ্ট। অত্যাচার বলতে শুধু কাজ আর কাজ, আর সন্ধ্যায় ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে বসে একটু মদ্যপান। পলাশ ডাঙ্গার সেই কিশোর গঙ্গাপ্রসাদ আজ অনেক পরিণত। সারাদিন পরিশ্রম করে কোম্পানীর সকল কাজ এখন নিজে একাই দেখাশোনা করে। সেই সুবাদে বড় সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা করে ইংরাজীটাও এখন মোটামুটি ভালই শিখেছে


সারাদিন খাটা খাটনির পর অবিবাহিত গঙ্গা ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপান করতে বসে, তবে ইদানিং সে একটা জিনিস লক্ষ করেছে, মনে মনে সে যেন কারও সঙ্গ কামনা করে। তার মনে এখনও কি সুলতার সেই নিষ্পাপ মুখটাই উকি দেয় ? বন্ধুদের কাছে কথা বলতেই তারা উপদেশ দিল...... মনের আর দোষ কি? এই বয়সে শরীর মন দুই তো সঙ্গ কামনা করবে...... আর সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও গঙ্গা যেন সবাইকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারে না। সঙ্গ ঠিক সেই সঙ্গ নয়। এটা ঠিক স্ত্রীর সঙ্গ নয়। কোন নারী সঙ্গ নয়। যেন সারাদিন খাটা খাটনির পর বাড়ির কোন আপনজনের সঙ্গ। যা থেকে গঙ্গা আজ দীর্ঘদিন বঞ্চিত


তবু বন্ধুরা তাকে বোঝায় সারাদিন খাটা খাটনির পর সন্ধ্যাবেলায় একটু নাচ গানের আসরে গেলে মনটা দুদিনে অনেক হাল্কা হয়ে যাবে। কথায় বলে যেখানে টাকা ওড়ে, সেখানেই সুন্দরীরা ঘোরে। কিছুদিনের মধ্যেই গঙ্গার এক ঘনিষ্ট বন্ধু কানাই খবর দিল বউবাজারে একজন বাঙ্গালী বাইজী এসেছে, তার যেমন রূপ তেমন- গানের গলা। বন্ধুদের পরামর্শে পরদিন সদলবলে গঙ্গা সেখানে গিয়ে হাজির। অত্যন্ত সুদৃশ্য এবং সুসজ্জিত একটি ঘরে গঙ্গা সবান্ধব বসল। গঙ্গার একটু অস্বস্তি হচ্ছে। এই প্রথম সে এই রকম একটা পরিবেশে এসেছে। সঙ্গীতের বাজনদাররা যে যার নিজের নিজের জায়গায় এসে বসল। সুসজ্জিত রেকাবে পানপাত্রে অতিথিদের খাদ্য এবং পানীও পরিবেশন করা হল। আর তার সামান্য পরেই এক পরমা সুন্দরী তার দুই সখীকে নিয়ে ওই ঘরে প্রবেশ করল। অষ্টাদশী পরমা সুন্দরী মেয়েটি ঠিক গঙ্গার মুখো-মুখি বসতেই গঙ্গার নজর গিয়ে পড়ল তার মুখের উপর। সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার সমস্ত শরীরে যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত হয়ে গেল। সেই মুখ, সেই চোখ, এমনকি গলার স্বরও ঠিক তার মত। কিন্তু তা কি করে সম্ভব? এর বয়স খুব বেশী হলে আঠারো-কুড়ি বছর হবে আর সে তো...... গঙ্গা কৌতুহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “মা তোমার নাম কি?” বন্ধুরা অবাক... একজন বাইজিকে মা বলে সম্বোধন ? উত্তরে বাইজিটি বলল, “হুজুর বোধ হয় এই লাইনে প্রথম, হুজুরের জানা নেই যে বাইজীদের আসল নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করতে নেই?” গঙ্গা সবাইকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল, “আমার শরীর খারাপ লাগছে আমি এখন- বাড়ি যাবো।বাড়িতে ফিরে গঙ্গা তার চব্বিশ ঘন্টার কাজের লোক কানাই-কে বলল, “যে করেই হোক, যত টাকা লাগে লাগুক ... মেয়েটির আসল পরিচয় খুজে বের করতেই হবে। যতদিন না ওর আসল পরিচয় জানা যাচ্ছে ততদিন কোন কাজ করবে না। মেয়েটি বাইজী হিসেবে প্রতিদিন যে টাকা রোজগার করে সেটা ওকে আমি- দেব।


দুইদিনের মধ্যেই কানাই খবর নিয়ে এল, মেয়েটির আসল নাম বিজয়া, বাবার নাম যাদব ভট্টাচায্য বাড়ি বাঁকুড়ার সোনামুখি গ্রামে। বাবাটি বড়ই চরিত্রহীন স্ত্রী কন্যার প্রতি তার কোন নজর নেই। গঙ্গা উত্তেজনায় কাপতে কাপতে চিৎকার করতে থাকে ...নিকুচি করেছে ওর বাবার নাম ঠিকানায়... ওর মায়ের নাম কি? মামার বাড়ি কোথায় সেই খবর নিয়ে এস।কানাই বলল, “আমি তাও এনেছি, ওর মামার বাড়ি পলাশডাঙ্গা, আর মা সুলতা সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন।একথা শুনেই গঙ্গা পাগলের মত হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বাড়ির যত পরিচারক, পরিচারিকারা তঠস্থ হয়ে ওর মুখ চাওয়া চায়ি করতে লাগল।


পরদিন সক্কালে উঠে গঙ্গা একাই দৌড়ে গেল সেই বাইজী বাড়িতে। উদভ্রান্তের মত ছোটা ছুটি করে খুঁজে বের করল বাড়ির মালকিন মাসীকে। বলল, “কোথায় তোমার বিজয়া? আমার এখন- ওকে চাই।মালকীন ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতে এক টাকা দু টাকা নয় দশ হাজার টাকা গুজে দিয়ে বলল, “বিজয়াকে এখন- আমার চাই।মাসী জীবনে একশো টাকার বেশী কখনো দেখেনি। সেই যুগে দশ হাজার টাকায় একটা ছোটখাটো দোতলা বাড়ি হয়ে যেত। এত গুলো টাকা হাতে পেয়ে কেমন যেন ভয় পেয়ে গিয়ে তখনই সাজিয়ে গুজিয়ে বিজয়াকে গঙ্গার হাতে তুলে দিল। গঙ্গা বিজয়াকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, “কিরে আমাকে চিনতে পারিসনি তো? আমি গঙ্গা মুখুজ্জে, পলাশডাঙ্গার গঙ্গা। আমার একার সংসারে এত সম্পত্তি কে দেখবে বলতো? চল তাই তোকে নিতে এলাম...পারবি না তোর এই বুড়ো ছেলেটাকে শাসন করে সংসারের হাল ধরতে ? আর এই সারাদিন খাটা খাটনি, আর মদ মাংস এসব আর ভাল লাগে না রে ? চল আমি তোকে নিয়ে যেতে গাড়ি নিয়ে এসেছি। তাড়াতাড়ি চল আমরা মা আর বেটায় মিলে নতুন করে সংসারটা শুরু করি।বিজয়া তার মায়ের কাছে অনেকবার গঙ্গা মুখুজ্জের নাম শুনেছে... তাই গঙ্গা-কে চিনে নিতে তার অসুবিধা হল না। সে তার বুড়ো ছেলের সঙ্গে গাড়িতে গিয়ে উঠল। ওদিকে এই প্রথম কুঠির মানুষরা তাদের দোর্দন্ড প্রতাপশালী মাসীর চোখে জল দেখলো


ফিরে দেখা / সুব্রত ঘোষ (ধারাবাহিক)


    সেটা ১৯৮০ সাল, মাধ্যমিকের ফল বেরল। রেডিওতে খবর পাওয়া মাত্রই বাবার উদ্বেগ। পরের দিন সকালেই ছুটলাম লাইন দিতে নির্ধারিত বইয়ের দোকানে। গেজেট বেরোবে, আর গেজেট দেখেই প্রাথমিক ভাবে ফল জানা যাবে। ফল বেরোল, ভালভাবে স্টার পেয়ে পাস করলাম মাধ্যমিক। দুর্গাপুর বয়েস স্কুলের কৃতি ছাত্র ছিলাম। স্কুলের নাম রেখে ভালো নাম্বার পেয়ে পাস করার পর বাবার হাত ধরে কলকাতা, উদ্দেশ্য নামী স্কুলে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি। সেই থেকেই কলকাতায় চলে আসা। সেন্ট জেভিয়ারস থেকে পাস করে প্রেসিডেন্সি তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সেরে বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির চাকরি। এই জায়গা ওই জায়গা ঘুরে শেষে বর্তমানে মুম্বাই। মাঝে দুর্গাপুর যাওয়া খুব কম সময়ের জন্য। আর বাবা ১৯৮৫ তে রিটায়ার করার পর সেই পাঠ একদম চুকে গেছিলো। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিলো শৈশবের বন্ধুরা, স্মৃতির খাতায় ধুলো জমে সেই দিনগুলো হারিয়ে যেতে বসেছিল যদি না গত বছর এয়ারপোর্টে দেখা হতো আসিফের সঙ্গে।আসিফের সঙ্গে মাঝে মধ্যেই দেখা হতো কলকাতায় পড়ার সময়। ও পড়তো সিটি কলেজে। পরে কলকাতা পুলিশের চাকরি পেলো। সেই পর্যন্ত খবর ছিল, কিন্তু গত বছর এয়ারপোর্টে দেখা হওয়ার পর যোগাযোগ আবার শুরু। সেল নাম্বার বিনিময় আর মোটামুটি নিয়মিত যোগাযোগ। ওঁর মাধ্যমে যোগাযোগ হোল পলাদির সঙ্গে। আমি রজত বাসু, দুর্গাপুর চললাম আজ আবার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে মিলনের জন্য। অনুষ্ঠান হবে বাবুলের বাড়ি, পলাদি আয়োজক, যদিও থাকেন কলকাতায়, ওঁর এনার্জি আজও সেই আগের মতোইশুনলাম বিজয়, কবীর, শুভ আর অহনা আসছে। ওরা প্রায় সব্বাই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক করে। যদিও সময়ের অভাবে আমার সেই ব্যপারটা আজও হয়ে ওঠেনি। সঙ্গে যাবে আসিফ। ও উঠবে কালীঘাট থেকে। প্রায় তিরিশ বছর পর সেই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে যাদের সঙ্গে বড় হওয়া।
হয়তো আজ দেখা না হলে পাশ দিয়ে চলে গেলেও চিনতে পারতাম না কোনদিন। আসিফের একান্ত ইচ্ছে কে মর্যাদা না দিয়ে পারলাম না। বিশেষ কাজে কলকাতায় এসে তাই একদিনের মুক্তি রোজকার ছদ্মবেশের জীবন থেকে।আমার কলকাতায় কাজে আসার সময় মাথায় রেখেই ওরা প্রোগ্রাম ঠিক করেছিলো।ভীষণ নস্টালজিক লাগছে ভাবতেকালীঘাট থেকে আসিফ গাড়িতে উঠলো। গাড়ি চলল কোনা হয়ে দুর্গাপুরের পথে।
গাড়িতে উঠে আসিফের প্রশ্ন,কেমন আছিস,কাজ কর্ম মিটল তোর। কতদিন বাদে আবার সবার সঙ্গে দেখা হিসেব করে দেখলি। প্রায় ৩০ বছর। কতজনের জীবনে কতো পরিবর্তন চেহারায় বা প্রাত্যহিক জীবনে সেটা ভাবতে পারছিস। বাবুল যেমন আজ একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, দুর্গাপুরে বিশাল নাম ডাক, বিয়ে করেছিলো টেঁকে নিবিজয় কলকাতায় থাকে, ছোটবেলার লেখা লেখি নিয়ে আজও আছে, শুনেছি কোন পত্রিকায় লেখে। কবীর থাকে দুর্গাপুরেই, বীমার এজেন্সি করে। শুভ সেই একই রকম আছে মজার মানুষ, শুনেছি একটা মনোহারী দোকান করেছে।অহনা বর্ধমানে থাকে, ওঁর কত্তা স্কুলের শিক্ষক, ও আসবে ট্রেনে। বিড়ি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিস নাকি খাচ্ছিস।আর দারু? একদমে কথা বলে থামল আসিফ। নাহ, বিড়ি পুরদমে খাচ্ছি, আর দারু সপ্তাহান্তে, বললাম। পলাদি কলকাতায় বিয়ে হয়েছে এক মাড়োয়ারি পরিবারে। শুনেছি ওঁর কত্তা খুব ভালো মানুষ। ওরা দুজনেই যাচ্ছে দুর্গাপুর, ওঁর কত্তা বিজনেসের ব্যপারে যাচ্ছেনপলাদিকে নামিয়ে দিয়ে যাবেন, আবার ফেরার পথে তুলে নিয়ে আসবেন।আর পলাদি, আজও একই রকম হাসি খুশি আমুদে আর দুর্দান্ত আয়োজক, বলল আসিফ। বিজয় ওঁর ফ্যামিলি নিয়ে আসছে, ওঁর শ্বশুরবাড়ি দুর্গাপুর। বউকে ওখানে রেখে আসবে। আর তোদের পাশের বাড়িতে থাকতো সেই অহনা বর্ধমানে থাকে। সব্বাই আসবে বলে জানিয়েছে, বলল আসিফ। কথা বলতে বলতে শক্তিগড় এসে গেলোগাড়ি থেকে নেমে একটু চা খেয়ে নিলে হয়না? বলল আসিফ। চা খেয়ে আবার যাত্রা শুরু, ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে দুর্গাপুর, বাবুলের বাড়ি। বিশাল দুধ সাদা রঙের বাড়ির ফটকে নাম লেখা বাবুল নন্দী। কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে দাঁড়ালো একজন সুঠাম চেহারার ভদ্রলোক, একগাল দাঁড়ি ভরা হাসিমুখে সেই ছোটবেলার বাবুলকে চিনে নিতে অসুবিধে হোল না। জড়িয়ে ধরল আমাকে, বলল কিরে কেমন আছিস, কতদিন পর তোর সঙ্গে দেখা, আয় আয় ভেতরে আয়।
মুল দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর গেলাম, এক তলার বসার ঘর পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম দোতলায়, বাবুলের পিছু পিছু, সঙ্গে আসিফ। বেশ বড় একটা ঘরে দুজন বসে আছে, আমি ঢুকতেই উঠে দাঁড়ালো। কিরে চিনতে পারছিস রজত, বলে  এগিয়ে এলো  সুন্দর দেখতে যেই মানুষটি, বুঝে ওঠার আগেই বলল, আমি কবীর, নিশ্চয়ই চিনতে পারিস নি, বলে জড়িয়ে ধরল কবীর। ছোটবেলায় ভীষণ দুরন্ত ছিল, নানা রকম বিটকেল দুষ্কর্মের নায়ক ছিল, আর ছিল মহিলাদের সম্মোহনের রাজা। এখন ও কি তেমনই আছিস, জিজ্ঞাসা করলাম কবীরকে। সেই পুরনো মেজাজে, একই রকম? জোরে হেসে উঠলো কবীর, আরে এখন কি আর সেই বয়স আছে নাকি সেই উদ্যম, তা ছাড়া  এখন আমি পাক্কা সংসারি মানুষ, বলে কবীর। এরপর শুভ হাত বাড়িয়ে গলা জড়িয়ে ধরে গালে আদর করে কেঁদে ফেললো, কিরে চিনতে পারছিস, দ্যাখ আমার সব চুল পেকে গেছে ৩০ বছরের প্রবহমান সময়ের ফাঁদে। তোর সঙ্গে কতো সুখ দুঃখ ভাগ করতাম, কতদিন একসঙ্গে স্কুল ছুটি হওয়ার পর বসে গল্প করেছি মাঠে, বলল শুভ।কথা বলতে বলতে আবার বেলের আওয়াজ। বাবুল নেমে গেলো দরজা খুলতে। এদিকে রান্না চলছে বাবুলের রান্নাঘরে,কেয়ার অফ কাশিদা, বাবুলের রাধুনি কাম ঘর সামলানোর ভার প্রাপ্ত। গলার আওয়াজ শুনে বোঝা গেলো কোন মহিলার আগমন হয়েছে। খানিক বাদে বাবুল এলো পলাদিকে সঙ্গে নিয়ে। কিরে রজত, কতদিন পরে তোকে দেখছি, কেমন জেনটেলম্যান হয়ে গেছিস রে, সেই ছোট রজত কোথায়, বলল পলাদি। অহনা আর বিজয় এখনও আসে নি... জিজ্ঞাসা করলো পলাদি। বাবুল বলল বিজয় ট্রেনে ওঁর গিন্নিকে নিয়ে আসছে, দুর্গাপুরে নেমে শ্বশুরবাড়িতে ওঁকে রেখে আসবে। আর অহনাও বর্ধমান থেকে ট্রেনে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরাও এসে পরবে।
এদিকে বর্ধমান স্টেশনে অহনা দুর্গাপুর গামী ট্রেনে উঠে বসেছে একটা সিটে। উল্টোদিকে এক ভদ্রলোক ও তার গিন্নি বসে। বার বার ভদ্রলোক ওঁর দিকে তাকাচ্ছে, খুব অস্বস্তি হচ্ছিলো, কিছুক্ষণ পর ওঁর গিন্নিও খেয়াল করেছে ব্যপারটা।কত্তা গিন্নি খুব ফিসফিস করে ঝগড়া করতে শুরু করলো। উপলক্ষ অহনা নিজে, সেটাও বুঝতে পারলো। কিন্তু কেন ভদ্রলোক ওঁকে এমন ভাবে দেখছে বুঝতে পারছিলো না অহনা। দুর্গাপুর আসতেই নেমে পড়লো, খেয়াল করলো ওই পরিবারও দুর্গাপুরেই নামলো। স্টেশন থেকে বাস ধরল, কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলো বাবুলের বাড়ি।
আড্ডা জমে উঠেছে পলাদি আসার পরই। আবার বেলের আওয়াজ, বাবুল উঠলো, দরজা খুলে নিয়ে এলো অহনাকে। চিনতেই পারছিলাম না, কতো পরিবর্তন, কি সুন্দর লাগছে অহনাকে। দেখে খানিকক্ষণ চুপ করে রইলাম। আমার পাশেই এসে বসলো। বললাম কিরে চিনতে পারছিস? অহনা বলল রজতদা তোমাকে আমি চিনতে পারবো না সেটা ভাবলে কি করে? আবার বেলের আওয়াজ, বিজয়কে নিয়ে আসরে ঢুকল বাবুল। আমাদের সব্বাই এসে গেছে, এইবার বলেদি, নিচের একটা ঘর মহিলাদের জন্য রাখা, আর আমাদের ছেলেদের জন্য ওপরের ওই ঘরটা। আড্ডা মারতে মারতে কারো একটু বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হলে ওই ঘর দুটোয় যেতে পারো। বিজয় ঢোকার পরই এক দারুণ ঘটনা ঘটলো। আরে ট্রেনএ আপনার সঙ্গে এতো চোখাচোখি, আমার গিন্নির সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেলো......আপনি...অহনা,তাই তো? দ্যাখতোকে দেখে চিনতে পারছিলাম অল্প অল্প, কিন্তু সাহস করে জিজ্ঞাসা করতে পারছিলাম না ট্রেনে, বলল বিজয়। ওহ তুমিই বিজয়দা, তুমি অমন ভাবে দেখছিলে আমাকে আমিও ঘাবড়ে গেছিলাম, কিন্তু খুব চেনা চেনা লাগছিলো, ইশ দ্যাখো তো কি কাণ্ড ছোটবেলার বন্ধুকে চিনতে পাড়ি নি, বলল অহনা। আমি তো তোকে চিনতে পেরেছিলাম, আমার বউকেও বলেছিলাম, তারপর দেখলাম তুই চিনতে পারছিস না, বউ ও অশান্তি শুরু করলো, কোন অচেনা মহিলার দিকে নজর দিচ্ছি বলে, তাই চুপ করেই রইলাম ট্রেনে, বলল বিজয়। তুই তো শালা মেয়েদের দিকে দেখতি না, বুড়ো বয়সে এমন ভিমরুতি ধরেছে বুঝি তোর, কবীর হেসে বলে উঠলো।
কথার মাঝেই বিজয় গিয়ে প্যান্ট চেঞ্জ করে লুঙ্গি পরে এসে বসলো আড্ডায়।  তোরা কেউ চেঞ্জ করবি না...জিজ্ঞাসা করলো বাবুল। মাথায় বেণী করা চুল, লুঙ্গি পরা আঁতেল বিজয়কে দেখে সব্বাই আওয়াজ দিতে শুরু করলো। যদিও ছোটবেলা থেকেই ও একটু অন্য রকম ছিল, তবে এমন টোটাল আঁতেল হয়ে গেছে, আজ না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। আড্ডার শুরু হল নিজেদের পরিবার সম্পর্কে বিবরন দিয়ে। পলাদির দুই মেয়ে, বড় মেয়ে ডাক্তারি পড়ছে, ছোট মেয়ে ল পড়ছে। কত্তা ব্যবসা করেন, সুখী সংসার। বাবুলের খুব দুঃখ জনক পারিবারিক জীবন। একটা বিবাদের সুত্রে গিন্নির সঙ্গে বিচ্ছেদতারপর নিঃসন্তান বাবুল আর বিয়ে করে নি। কবীরের এক ছেলে, ক্লাস ১২ এ পড়ছে। গিন্নি গৃহবধূ।শুভর এক মেয়ে, স্নাতক হয়েছে, বিয়ের দেখা শোনা চলছে। বিজয়ের এক ছেলে, কমার্স নিয়ে পড়ছে কলকাতায়, গিন্নি ঘর সামলায়। অহনার স্বামী স্কুল শিক্ষক, ও নিজে একটা এনজিওর সঙ্গে জড়িত। আসিফের দুই ছেলে, বড় জন রিসার্চ করছে বিদেশে, ছোটজন ক্লাস ১২ এ পড়ছে। আর আমার সংসার এক ছেলে আর গিন্নিকে নিয়ে। ছেলে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশুনো করছে, গিন্নি নিজের ব্যবসা করছে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের, বাড়িতে ঘর সামলায় কাজের লোক রেখা।

কথা বলতে বলতে বাবুল একটা জ্যাক ড্যানিয়েলের বোতল নিয়ে এলো। চিয়ার্স করে খোলা হল। ৭ টা গ্লাসে সাজানো হল পেগঅহনা খায় না, আর পলাদি সঙ্গ দিতে একটা পেগ নেবে। বিজয় শুরু করলো পুরনো কথা। কিরে মনে আছে রজত, তোর টিফিন একদিন আমি খেয়ে নিয়েছিলাম, লুচি আর আলুর দম, তুই স্যরকে বলে দিয়েছিলি, কি প্যাঁদানি খেয়েছিলাম, তারপর যদিও আমি তোর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছিলাম। আর একবার তোর খাতা থেকে টুকছিলাম, বলাই স্যর এসে এক গাঁট্টা দিয়েছিল, খাতা কেড়ে নিতে গিয়েছিল, কিন্তু তুই বারন করেছিলি। সেই দিন গুলো কোথায় যেন চলে গেলো। আর ওই কবীর, রোজ একজন নতুন প্রেমিকার গল্প জুড়ে দিতো, কোনদিন কুহেলী না হয় অপর্ণা। মেয়েদের ব্যপারে কি দুর্বল ছিলি কবীর। এখন ও কি মেয়েবাজি করিস নাকি, জিজ্ঞাসা করে কবীরকে। বিজয় তুই তো নন্দিতার জন্য কতো কবিতা লিখে পাগল হয়েছিলি, তারপর তোর সামনে দিয়ে নন্দিতাকে নিয়ে চলে গেলো কল্লোল, চেঁচিয়ে বলে উঠলো কবীর। শালা আমি না হয় একজনের জন্য কবিতা লিখতাম কিন্তু তুই কি করে এতো মেয়েকে বশ করে ফেলতি, বলি রহস্যটা কিরে কবীর, বলল বিজয়। দুজনের তরজা বেশ জমে উঠেছে, আমরা সব্বাই বেশ উপভোগ করছি।সুভ হঠাৎ গান ধরল পুরান সেই দিনের কথা...সব্বাই গলা মেলালাম। তুই তো শালা গান করে মেয়েবাজি করতিস,কবীর সুভর পেছনে লাগলো। কতো মেয়ে সুভদা সুভদা করে তোর কাছে আসতো, মাঝে যে এক আধজনকে আমিও ফাঁসানোর চেষ্টা করি নি তা বলব না, তবে তুই বস সত্যি মাস্টার ছিলি গানের ব্যপারে।বাবুল ছিল খেলার জগতের মানুষ, ফুটবল খেলা নিয়ে কতদিন সন্ধ্যে গড়িয়েছে, বাড়ি যেতে স্কুল থেকে, বললাম আমি। এখন খেলা দেখিস তো বাবুল, জিজ্ঞাসা করলাম।তোর মনে আছে রজত, সেইবার ক্লাস সেভেনের সঙ্গে আমাদের ফুটবল খেলা। আমাদের কোচ ছিলেন রঞ্জিত স্যর। সেভেনের কোচ ছিলেন লোকেশ স্যর। রঞ্জিত স্যর আর লোকেশ স্যরের মধ্যে একটা মানসিক টানাপড়েন ছিল। আমরা ওদের চার গোলে হারালাম, তারপর রঞ্জিত স্যর আমাদের সঙ্গে সেই প্রথম ও শেষ বারের মতো সিদ্ধি খেয়ে একদম গড়াগড়ি মাঠের মধ্যে। তারপর স্যরকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসার সময় স্যরের গিন্নি আমাদের কি সাঙ্ঘাতিক বকা ঝকা করেছিলেন। আমরা সব্বাই হেসে উঠলাম ঘটনাটা মনে করে।গরম গরম পাকোড়া এলো, পানীয়ের সঙ্গে জমে উঠলো আড্ডা। তুই তো একদম চুপ করে আছিস, কি ব্যপার রে আসিফ, জিজ্ঞাসা করলো বাবুল। আরে নানা সব্বাই একসঙ্গে কথা বললে হবে? কাউকে তো শুনতেও হবে, আমি তো বেশ উপভোগ করছি তোদের কথা। মনে পড়ছে পুরনো দিনের কথা, বলল আসিফ। জানিস বছর দুই আগে আমার ট্রাঙ্ক পরিস্কার করতে গিয়ে কতগুলো প্রেমপত্র বেরোল। মৌসুমি চ্যাটার্জিরা থাকতো পুরনো বাজারের পেছনে, মনে আছে তোর বাবুল? ওঁর বাবা ব্যাঙ্কে কাজ করতেন। প্রেম বিনিময়ের পর এক মাসের মাথায় ওঁর বাবা বদলি হল সিউড়ি। বেশ কিছুদিন ডাকে প্রেম পত্র আসতো। তারপর সময়ের তালে আমাকে ভুলেই গেলো, কতো চিঠি পাঠালাম, কোন উত্তর এলো না। ট্রাঙ্ক থেকে লাল হয়ে যাওয়া সেই সব প্রেম পত্র বের করে পড়লাম, মনটা কেমন করে উঠলো, সেই ছোট মৌসুমি আজ কারো গিন্নি, কোথায় আছে কেমন আছে জানি না, ওই চিঠিগুলো ফেলে দিলাম। আজ আবার মনে পড়ছে সেই সব কথা, বলল আসিফ। পলাদি বাবুনদার কথা মনে আছে...জিজ্ঞাসা করে বিজয়। উফফ সেই সময় পলাদি আর বাবুনদা হিট জুড়ি ছিল। কতদিন পার্কে দুজনে গল্প করত, আমাদের খেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে, সন্ধ্যেবেলায়...আমরা লুকিয়ে দেখতাম,  হেসে বলে সুভ। এই এই এই কি হচ্ছে কি এই সব...জানিস আমি এখন পাক্কা গিন্নি, দুই মেয়ে নিয়ে সংসার আমার। বাবুনদা জীবনে এক সময় এসেছিলো, আবার সময়ের স্রোতে ভেসে গেছে কোথাও, বলল পলাদি। তারপর আমার জীবনে এলো আমার স্বামী অখিল। আজও আমার জীবনের ধ্রুবতারা, পলাদি বলল।

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া