Friday, February 24, 2017

কবিতা / স্মৃতিমঞ্জুষা / প্রজ্ঞা পারমিতা ভাওয়াল

একটা একাকিত্ব থাকে
 একটা নিজস্ব বোঝাপড়া .
 একটা স্বপ্নের বাস  গোপনে ,
 একটা মলিন উপবাস থাকে।
 একা  একা ঘর বেঁধে 
 একটা  প্রতীক্ষা   থাকে
 থাকে একটা চরম পাওয়া।

ভালোবাসা ফেরাতে ফেরাতে নিঃস্ব দরজায় দাঁড়িয়ে ;
ভাবলেশহীন শ্রুতিলিপি বর্ণলিপি হয় অকারণে।
শ্বাশত নয় কিছুই
স্মৃতিমঞ্জুষা ভর করে পথচলা
পাশের গাছে দেখি সারাক্ষণ বাসা বাঁধছে একটি পাখি
খুব একা-একা।





গল্প / ভ্যালেন্টাইন গিফট / অরুণ চট্টোপাধ্যায়



আজকাল কাফেতে যা ভীড়! তাতে এ অঞ্চলে সাইবার কাফে বলতে এই একটিই। ডাটা অনলাইন এন্টারপ্রাইজএই ডাটাটা ডাটা মানে তথ্য নাকি দত্ত অর্থাৎ কোনও বাঙ্গালীর টাইটেল এ বিষয়ে বন্ধু মহলে অনেক চর্চা হয়েছে কিন্তু উত্তর পাওয়া যায় নি। এ দোকানের মালিকের পূর্ব পুরুষদের কেউ বাঙ্গালী বলেও শোনা যায় নি। কিন্তু ঠিক দত্ত না হলেও ডাট বলে পাঞ্জাবীতে একটা টাইটেল আছে। যেমন অভিনেতা সুনীল ডাট।
এ কদিন রোজই তার নাম থাকছে ওয়েটিং লিস্টে। আধঘন্টা একঘন্টা অপেক্ষা করে তবে মেশিন খালি পাচ্ছে কাজরি। পেলেও কপাল দোষে সার্ভার ডাউন। সার্ভারের আর দোষ কি। তার ওপর চাপ আর কি কম পড়ছে? নেট ব্যাংকিং, মোবাইল, ডেবিট কার্ড তারপর পে-টি-এম, -টি-এম কত কত কি। মেশিন পাওয়া যায় তো নেট পাওয়া যায় না। ইন্টারনেট লিংক পাওয়া যায় না। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট ধরে হ্যাং হয়ে থাকছে মেশিন।  
সবেমাত্র সাইট খুলেছে। গুগল খুলে সার্চ করতে যাবে এমন সময় নীলাদ্রি এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। ----হাই কাজরি! টু উইকস অনলি। সে বলল, ফোর্টিনথ ফেব্রুয়ারির কথা বলছি।
মেশিন থেকে মুখ না তুলে চোখের তারাটা সামান্য বাঁ দিকে ঘুরিয়ে আবার সোজা করে নিল কাজরি। তারপর গুগলের পাতায় লিখতে লাগল এইচ-টি-পি ডব্লিউ-ডব্লিউ করে ওয়েব সাইটের ঠিকানাটা। লিখতে লিখতেই বলল, সো হোয়াট?
--সো হোয়াট মানে? গিফট দিবি না? সবই কি ভুলে যাস তুই?
--কিচ্ছু ভুলি না। কাজরি চোখমুখে উপেক্ষার ভাব এনে নিজের কাজে মন দিল।
নীলাদ্রি অসহিষ্ণু ভীষণ। চঞ্চল হাতে কাজরির মাউসটা ধরে বলল, বল কি দিবি?
--তোকে দিতে যাব কেন?
---দিতে যাব কেন মানে? ভ্যালেন্টাইন ডে তে সারাদিন আমাদের মিলেনিয়াম পার্কে ঘোরার কথা ছিল না? তুই আমায় গিফট দিবি। আমিও দোব অবশ্য। তবে এখন বলব না। সারপ্রাইস।
মাউসটা টেনে ছাড়িয়ে নিল কাজরি। নিজের কাজ করতে করতে বলল, কোনও কথা ছিল না।
--কথা ছিল না মানে? নীলাদ্রি তো রেগে কাঁই। গলার উচ্চতা একটু বাড়াল। যা এখানে একটু বেমানান বটে। পাশের কিউবিকলসের মেয়েটা পর্যন্ত কৌতূহলী ঘাড় একটু ঘোরাল এদিকে। তারপর আবার কাজ করতে শুরু করল।
---সিন ক্রিয়েট করিস না নীল। আমি এখন বিজি। বিরক্ত হলেও ঠান্ডা গলায় বলল কাজরি।
---তোর ব্যস্ততা মানে তো অনিন্দ্যকে চ্যাট করা। মানে ওর সঙ্গে প্রেম করা।
 নীল! প্লিজ কন্ট্রোল ইওরসেলফ। যার সঙ্গে খুশি প্রেম করব তোর তাতে কি?
রেগে কোনও কথা না বলেই বেরিয়ে গেল নীল। পাশের মেয়েটি বলল, খুব রেগেছে মনে হচ্ছে।
--ওসব পিড়িংবাজ অনেক দেখেছি। ভ্যালেন্টাইন গিফট নেবে? ওঃ কত রে!
এরপর নেট সার্ফ করতে লাগল কাজরি। একটু চ্যাটিং না করলে হবে না। অবশ্য অকাজের চ্যাটিং নয়। তার ক্লাস নোটের ব্যাপারে ডিটেলস একটু দরকার ছিল পিঙ্কা আর মণিমালার সঙ্গে। যেটা ফোনে হবে না। একটা বইয়ের দরকারি কিছুটা অংশ ওরা স্ক্যান করে রেখেছে সেটা পাঠাতে বলবে।
কিন্তু কাউকেই এখন পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এসব কাজ মোবাইলে ঠিক হয় না। বাড়িতে কোনও মোবাইল এমন কি নেট পর্যন্ত নেই। অন্তত একটা ল্যাপটপ নেট কানেকশন আর ওয়াইফাই থাকলেই চলে যেত। কিন্তু নেই।
কিন্তু কেউ নেই। খানিক্ষন এদিক ওদিক মাউস নিয়ে নাড়াচাড়া করে বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ে কাজরি। মনের ভেতরটা যেন কেমন খিঁচড়ে রয়েছে। নীলাদ্রির ঐ সিন ক্রিয়েট করাটা মনে থেকে মেনে নিতে পারছে না কিছুতেই। নিজেকে কি মনে করে ছেলেটা? প্রেমের সম্রাট নাকি একচ্ছত্র অধিপতি? এভাবে কাফের মধ্যে ঢুকে পড়ে ছিঃ!
পাশের মেয়েটা মুখ একটু ঘুরিয়ে কাজরির মনের অবস্থাটা একটু আঁচ করার চেষ্টা করল। তারপর কি-বোর্ডে খট খট করতে করতে বলল, এখনকার ছেলেরা খুব ইমপেসেন্ট হয়। বড্ড আনস্মার্ট আর অগোছালো। বলে একমুখ নীরবে হেসে নিল মেয়েটি।
রাগে একেবারে গা-পিত্তি জ্বলে গেল কাজরির। মেয়েটির এই হাসিটায়। নিজের পাঁঠাকে মানুষ কোন দিকে কাটবে সে সিদ্ধান্ত নেবার মালিক কেবল সে। তার লাভারকে কেমনভাবে ব্যাঙ্গ করবে সে ভাবনা একমাত্র কাজরির। ঐ মেয়েটির নয়। আজ তার বয়ফ্রেন্ড হোক বা না হোক এককালে ভাল তো বাসত সে নীলকে?
মেয়েটির এই হাসি যেন কাজরির উদ্দেশ্যেই। যেন তার প্রেমের সিলেকশনে অপদার্থতার জন্যেই। তার দিকে একবার কটকটে চেয়ে কথা না বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেল কাজরি কাফে ছেড়ে।
সময়ের আগেই বেরিয়ে পড়েছে তাই খানিক উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে ঢুকল একটা আউট ফিটের দোকানে। পুজোয় দেওয়া বড়মাসির জিনস টা পড়েই রয়েছে। পরতে পারছে না ম্যাচিং করা টপের অভাবে। কি করবে টপের কালারটা আর পছন্দ হচ্ছে না কাজরির। কালারটা পছন্দ করেছিল নীলাদ্রিই। কিন্তু সে তো তখন তাকে ভালবাসত সেআজ বাসে না। তাই এটা পরলে নিজের মনকেই সে নিজে বলবে, কিরে কাজরি সেই তোর নীলাদ্রির কাছেই বশ্যতা স্বীকার করতে হল নাকি?
এ হতে পারে না। নীল তার এক্স ছিল। এখন ধরা যাক ওয়াই হয়েছে। তাতে মেজাজ তো আজ আরও খিঁচড়ে দিয়েছে। এখন আর সেটা পরা যায় না। কদিন ধরে ধর্মতলা, নিউ মার্কেট, গড়িয়াহাট চষে বেড়িয়েছে মনের মত রং-এর জন্যে। কিন্তু পায় নি। গত সপ্তায় হাতিবাগানে গিয়ে পড়েছিল আচমকাই। আর সেখানে একটা দোকানে সেই পছন্দমত রং-এর কাপড়টা পেয়ে গেছে আচমকাই।  
আজ একেবারে টপটা নিয়েই বেরোল দোকান থেকে। কারিগর অবশ্য কমপ্লিট করে রাখতে পারে নি আজও। বলল, কি করব দিদি ভ্যালেন্টাইনের বাজার বুঝতেই তো পারছেন। বাজার একেবারে তেতে হট হয়ে রয়েছে। তবে যদি একটু বসতে পারেন তো করে দিই।
ঘন্টা দেড়েক ঠায় হত্যে দিয়ে বসে থেকে সেটা নিয়ে তবেই বেরোল কাজরি। কি জানি কালকে আসবে বললে যদি ফেলেই রাখে? চোদ্দ তারিখ তো আর দেরি নেই একেবারে হাতের গোড়ায়।
দুপুরটা গড়িয়ে গেল। আজকে আর ইউনিভার্সিটির ক্লাস ফ্লাস করা হল না। শীতটা বেশ কমে এসেছে। রোদের তেজটাও বেশ। ফেরার বাসেই উঠে পড়ল। বাড়ি ফিরেই আবার মেজাজ বিগড়োল।
--কে এসেছিস রে? গোপাল? কোথায় থাকিস বাছা সারাদিন? আয় বাবা একটু পাশে বোস।
কাজরির ঠাম্মা। মানুষ নয় যেন একটা কাকাতুয়া। মাঝে মাঝে ভাবে কাজরি। সব সময় বকে যাচ্ছে। আসলে চোখে একটু কম দেখে বলেই বোধহয় মুখে তার এত কথা। ঐ যে কথায় বলে না এক অঙ্গ দুর্বল হলে অন্যটার ক্ষমতা বেড়ে যায়?
বিরক্তভাবে কথা না বলে ঠাম্মাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে আবার থামতে হল। কেননা ঠাম্মা আবার ডেকেছে, ও গোপাল, আয় না। বোস না একটু পাশে।
কাজরি একটু থেমে বলল, কে তোমার গোপাল? আমি তোমার নাতনি। কাজরি গো কাজরি। আমায় কি মনে ধরে না নাকি যে নামটা পর্যন্ত মুখে আনতে পার না?
--ও তুই কাজি বুঝি? তা চোখের যে মাথা খেয়েছি দিদি।
--চোখের মাথাফাতা নয় আসলে এটা তোমার একটা কাকাতুয়া মার্কা স্বভাব ঠাম্মা। ডাকছি তোমার আদরের নন্দদুলাকে। আর গোপাল গোপাল কি কথা? কতবার বলেছি ওসব সেকেলে নামে ডাকবে না ভাইকে? কেন ওর অর্ধেন্দু নামটা ধরে ডাকতে কি হয় শুনি?
ফোকলা দাঁতে বেশ মিষ্টি করে হাসল ঠাম্মা, দাঁতের মাথাও যে খেয়েছি দিদিভাই। কড়াই ভাজার মত অত শক্ত নামটা মুখে আনি কি করে বল? গোপালটাই বেশ ডাক। আহা যেন কেষ্ট ঠাকুরকে ডাকছি।
ঠাম্মা মাথায় হাত ঠেকাল বেশ ভক্তিভরে।
--থাকো তোমার কেষ্ট ঠাকুরকে নিয়ে। যত্তো সব! ব্যস্তভাবে নিজের ঘরে চলে গেল কাজরি। আর ঠাম্মা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল যেন কি দোষ করেছে নিজেই যেন বুঝতে পারছে না এমনি ভাবে।

--মা মা, টপটা পেয়েছি জানো? অনেক করে দেড় ঘন্টা ঠায় টেলারিং শপে বসে থেকে তবে করিয়ে এনেছি। আজকে হবে  না বলে ফেলে রাখছিল।  
পাঁচ মিনিটের মধ্যে টপটা পরা হয়ে গেল কাজরির। একটা জিনস তো পরেই ছিল। তার ওপরেই পরে ফেলল টপটা। পরেই হাসিমুখে মায়ের সামনে হাজির, বল তো আজ না হলে কি হত? চোদ্দ তারিখ আর কটা দিন মা? কেমন হয়েছে বল তো?
মা তো প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ। টপের আর টপের মালকিনের। উজ্জ্বল হেসে কাজরি বলল, এটা মলয়ের পছন্দ মা। মানে কালারটা। কেমন হয়েছে বল তো?
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে কাজরি বলতে লাগল, জানো তো সেই নীলাদ্রি এসেছিল। কি সাহস! কাফেতে ঢুকে একেবারে হাত ধরে টানাটানি। বলে ভ্যালেন্টাইন গিফট দিতে হবে। সারাদিন ঘুরবে মিলেনিয়াম পার্কে। তারপরে আবার নাকি সেই নন্দনে।  
কাজরির মা আর কি বলেন। চুপ করেই থাকেন। কাজরি এক স্পীডে বলে যায়, আমিও ঝেড়ে দিয়েছি একেবারে স্কোয়ার কাট।
--তা বেশ করেছিস। ভারতী মুচকি হাসল, বেশ করেছিস। তা এবার কার সঙ্গে ঘুরবি? পিংকা আর মণিমালা
থামিয়ে দিল কাজরি, আরে ওদের তো নিজেদেরই একটা একটা করে আছে। মলয় কি আকাশ তো মুখিয়েই আছে। তবে মলয়কে নেব না। ও কিচ্ছু খাওয়ায় না শুধু ফুচকা ছাড়া। বলে পেট ভরে ফুচকা খাও আর কিছু খাবার দরকার হবে না। আরে বাবা সে তো আমিও জানি। একগাদা তেঁতুল গোলা জলে পেট ঠেসে দিলে কি আর কিছু খাবার কথা মনে হয়। যেমন পাজি তেমনি চালাক ছেলেটা।
--তোদের এখন এই বেশ একটা হয়েছে। ভ্যালেন্টাইন ডে। আমাদের সময়ে এসব ছিল না। বেশ প্রশ্রয়ের হাসি হাসে ভারতী। বয়েস এখন চল্লিশের বেশ কিছু ওপরে। দু দুটো ছেলেমেয়ের মা। একটা মাঝারি সংসারের কর্তৃ। মনে যৌবন নেচে বেড়ালেও দেহে যে ভাটার টান দেখে বেশ বোঝা যায়।
ওদিকে ঠাম্মা বেশ চেঁচামিচি জুড়েছে। অনেক্ষণ থেকেই চলছিল কানে আসছিল দুজনেরই। কিন্তু কান না পাতার জন্যে সেগুলো ফিরে যাচ্ছিল। ভারতী গিয়ে বলল, কি হল মা? আপনার সব সময় চেল্লামিল্লি আর ভাল লাগে না।
--বলি আমার সঙ্গে ঠাট্টা? ঠাম্মা তো রেগে একেবারে কাঁই, চোখে দেখতে পাই না বলে ঠাট্টা! আমি খবরের কাগজ পড়তে পারি? আমায় যে দিয়ে গেল কাজি?
ভাঙ্গা দাঁতের জন্যে কাজরি উচ্চারণ করতে পারে না ঠাম্মা। বলে কাজি। সকালে কলেজ যাওয়ার সময় বাংলা খবরের কাগজটা দুম করে ফেলে গিয়েছিল ঠাম্মার কোলে। বলেছিল, সব সময় কাকাতুয়ার মত না কপচে চুপ করে কাগজটা পড় তো ঠাম্মা। আমাদের কানগুলোকে একটু বিশ্রাম দাও।  
সকালে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গিয়েছিল নাতনি। তখন খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিল। কোলের ওপর যেটা পড়ল সেটা কি বস্তু তা ঠাওর হতে না হতেই কাজরি তো পগার পার। বিকেলে সে বাড়ি ফিরতেই রাগটাও ফিরে এসেছে। এখন তার শোধ তুলছে বুড়ি।  
কাজরিও এসেছিল মায়ের পিছু পিছু। বলল, ঐ ফোকলা দাঁতে আর ফক ফক কর না তো।
--তা তো বটেই। বলি দে না দাঁতগুলো বাঁধিয়ে। কতবার তো বলেছি। তাহলে তো আর ফক ফক করতে হয় না।
--কেন বাদাম ভাজা খাবে নাকি ঠাম্মা? কাজরি ঠাট্টা করে হেসে উঠল। ভারতীও যোগ দিল।
--না খেতে তো আর সাদ-আহ্লাদ যায় না? বুড়ি গজ গজ করতে থাকে।   
আসলে আগেকার দিনের হিসেবে বুড়ি হলেও আজকালের হিসেবে মোটেই বুড়ি বলা চলে না সাতষট্টি বছরের ঠাম্মাকে। কিন্তু বুড়ি আখ্যা দিয়ে তার দাবিগুলোকে তো দমিয়ে রাখা যায়।
--কখন থেকে বলছি গোপালকে ডেকে দে। আমাকে নিয়ে একটু বাথরুমের দরজায় ছেড়ে আসবে। তা শুনলি আমার কথা?
ডায়াবেটিসে সাতষট্টি বছরেই কাবু করেছে ঠাম্মাকে। দাঁত গেছে চোখ গেছে। বাতে প্রায় পঙ্গু। প্রথম কিছুদিন চিকিৎসা হয়েছিল। কিন্তু ডাক্তার কোবরেজে ব্যতিব্যস্ত ছেলে আর ছেলের বৌ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডায়াবেটিস তো বড় তেমন কোনও রোগ নয়। ও একটু খাদ্যসংযম করলেই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ভোরে এক কাপ নিমপাতা কি করলার রস। ব্রেকফাস্টে একটা ক্রিম ক্র্যাকার আর এক মুঠো শুকনো খোলায় চিঁড়ে ভাজা। দুপুরে একহাতা ভাত, একটা রুটি আর পেঁপে বেগুনের ঝোল। সারা সন্ধ্যেতে পেটে কিল মেরে বসে বসে ডিনারের সময় ঘুমিয়ে পড়া। আর রাতে না ঘুমিয়ে বিছানায় শুয়ে ছেলে বৌকে খেতে না দেবার জন্যে শাপ শাপান্ত। এই হল আপাতত বুড়ির রুটিন।
সকালে, বিকালে আর রাত্রে অন্তত বার ছয়েক ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যেতে হয়। গোপাল ওরফে অর্ধেন্দুই সেটা করেঠাম্মা তো গোপাল অন্ত প্রাণ। স্নানের কাজটা বারান্দায় বসে নিজেকেই সারতে হয় ঠাম্মাকে। এক গামলা জল বসিয়েই ছুটি ভারতীর। সংসারের নানা হ্যাপা। এসব সামলে এখন আবার বুড়ির সেবা।
এক গামলা জলে কোনমতে চানটা সারে ঠাম্মা। তখন ভারতী টিভিতে রান্নার রেসিপি আর নয় টেলিশপিং-এ শাড়ি দেখায় ব্যস্ত থাকে।
--ভুলে গেছি বাবা। কাজরি এবার একটু নরম গলায় বলল, তা তুমিও তো একটু উঠতে টুটতে চেষ্টা করতে পার ঠাম্মা। এভাবে পরের ভরসায় কদিন থাকবে?
--থাকতুম না থাকতুম না। বুড়ি গজ গজ করে, চোখটা থাকলে ভরসা করতুম না। তোরাও তো আর চশমাটা করিয়ে দিলি না।  
ভারতী বলল, ওভাবে বলবেন না মা। কতগুলো টাকা খরচ করে চোখ দেখিয়ে আনলুম সেটা বলুন?
কাজরি ফস করে বলে ফেলল, তুমি তো আর গল্প উপন্যাস পড়বে না ঠাম্মা।
বুড়ি তো খুব খাপ্পা হয়ে তার দিকে এমনভাবে দেখতে লাগল যেন চোখ দিয়ে ঠিকরে পড়া আগুনে এক্ষুনি সে ভস্ম করে ফেলে আর কি।
ভারতী বলল, চশমাটা রয়ে সয়ে হবে মা। ভাবছেন কেন? ছেলের অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছেন। সিমলা মানালি যেতে আমাদের কতগুলো টাকা বেরিয়ে গেল বলুন? আপনার ছেলে এল-টি-সিতে শুধু গাড়িভাড়াই পায়। আর বাকি খরচ? হোটেল খরচ কি কম পড়েছে আজকাল? পুজোর সময় জিনিসের দাম যে দশ গুণ করে বাড়ে তা কি বলে দিতে হবে তবে সে জানবে?
আসলে মাস কয়েক আগে ভারতী বলেছিল অঞ্জনকে, রোজই বুড়ি গজরায়। দাও না যাহোক একটা সস্তা দরের চশমা। পঞ্চাশ একশ যা হয়।
--পঞ্চাশ একশতে আজকাল চশমা দূরে থাক তার ডাঁটিও পাওয়া যায় না ভারতী। সাড়ে তিনশ চারশোর কমে কিছুই নেই।
কথাটা নিয়ে আর বেশি কিছু উচ্চবাচ্চ করে নি ভারতী। চশমার প্রেসক্রিপশনটাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বেশ কিছুদিন। তা প্রায় মাস তিন চার হল। অঞ্জন চশমা কেনার মতি করলে তো ফ্যাসাদ। প্রেসক্রিপশন হারাবার হ্যাপাটা সামলাতে হবে তাকেই। তাছাড়া ঐ কাজরির কথায় গল্প-উপন্যাস তো আর পড়বে না বুড়ি? ফালতু একটু নড়াচড়ার জন্যে কি দরকার?
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সিমলা যাবার সময় মাস খানেকের মত মাকে কাজরির ছোটকাকার বাড়ি রেখে এসেছিল অঞ্জন। হতে পারে সেই সময়ই প্রেসক্রিপশনটা এদিক ওদিক হয়েছে। তখন নাকি ঠাম্মার খুব কষ্ট হয়েছিল। বুড়ি কাকাতুয়ার মত বারবার সেকথা বলত। হয়ত বুড়ির বকুনির ঠেলাতেই মাথার ঠিক রাখতে না পেরে ভারতী হারিয়ে ফেলেছে।
তখন তো খুব রেগে গিয়েছিল ভারতী। বলেছিল, দেখুন মা আজকাল অনেক বৃদ্ধাশ্রম হয়েছে। ইচ্ছে করলে আমরা অনায়াসে আপনাকে সেখানে রাখতে পারি। কিন্তু তেমন ছেলে নয় আপনার। নই আমিও।
অর্ধেন্দু ওরফে গোপাল এসে হাজির। কাজরি হাসল খিলখিল করে, এবার যাও ওর কোলে চেপে বাথরুমে।
মা মেয়ে চলে গেল। গোপাল বেশ যত্ন করে ধরে ধরে নিয়ে গেল ঠাম্মাকে। উচ্চ মাধ্যমিক দেবে। পড়াশোনায় একেবারে মাঝারি। বাড়িতেই থাকে সর্বদা। কাজরি ওর নাম দিয়েছে ঘরকুনো বলে। কারো সঙ্গে মেশে না বা কোনও অনুষ্ঠানে যায় না। ঠাম্মাই যা গোপালের ভক্ত। নাহলে সে অন্য সকলের করুণা আর তাচ্ছিল্যের পাত্র।

মলয় বা আকাশ নয়। এবারে মিলেনিয়াম পার্কে সম্বিতের সঙ্গে ঘুরে বেড়াবে কাজরি। সাড়ে ছ হাজার দিয়ে কাজরিকে একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিয়েছে সে। মাকে কাজরি বলেছে, দেখবে মা সামনের বছরে সম্বিত আরও দামি উপহার দেবে বলেছে। ও একটা নতুন ব্যবসা ধরেছে।
নিজের বিছানায় বসে কি সব করছিল অর্ধেন্দু। ভারতী ঢুকতে একটু আড়াল করার চেষ্টা করল। ভারতীর কৌতূহল বেড়ে গেল। উঁকি দিয়ে দেখল বেশ কিছু টাকা মানে দশ টাকা পাঁচ টাকা আর কয়েন গুণছে।
--এই কিসের টাকা রে?
--আমার টাকা। অনেক দিন ধরে জমিয়েছি।
--জমিয়েছিস? ভ্রূ কুঁচকে ভারতী প্রশ্ন করল, কি করে জমালি শুনি?
বাড়ি থেকে অটো বা টোটো ভাড়া পায় সে স্কুলে যাওয়ার জন্যে। অটোয় যেতে ওর নাকি ভাল লাগে না। কিছুদিন ধরে হেঁটেই যায় পথটা। মাকে জানায় নি। তাতে যদি গাড়িভাড়াটা বন্ধ হয়ে যায়? ভারতি আবার প্রশ্ন করল, তা কত হল?
--সাড়ে তিনশর কিছু বেশিঠিকভাবে গুণলে মনে হয় চারশোর কিছু বেশিও হতে পারে।
--তা গুণছিস কেন? কি করবি? বরং বাবাকে দিয়ে দে ব্যাংকে তোর অ্যাকাউন্টে জমা করে দেবে। ব্যাংক সুদ দেয় জানিস তো?
--না জমাবো না। গিফট কিনব। অর্ধেন্দুর মুখে লাজুক হাসি, ভ্যালেন্টাইন গিফট।
ভারতী তো আর হেসে বাঁচে না। মায়ের মুখে কথাটা শুনে হো হো করে হেসে উঠল কাজরিও। একটা ঘরকুনো ছেলে সাতজম্মে কারোর সঙ্গে মেশে না সে কিনবে ভ্যালেন্টাইন গিফট? কার জন্যে কিনবে শুনি? ওর আবার প্রিয়জন কে? নাকি ডুবে ডুবে জল খাচ্ছে ছেলেটা?
--জানো মা এখন খুব অল্প বয়েসেই পেকে যাচ্ছে ছেলেগুলো। ওকে একটু চোখে চোখে রেখো কিন্তু।
কাজরির কথাটা নীরবে সমর্থন করল ভারতীও। কি জানি বাবা। আজকাল এই ক্লাস ইলেভেন টুয়েলভের ছেলেমেয়েগুলো খুব প্রেম টেম করে। কাগজে টিভিতে অনেক বাজে বাজে খবর পাওয়া যায়। কাজরি তো ঠিক কথাই বলেছে।
চোদ্দ তারিখে সারাদিন খুব ঘোরাঘুরি হল কাজরির। রাত সাড়ে নটায় সম্বিতের দেওয়া গিফট নিয়ে ফিরে সে খুব ক্লান্ত। তাছাড়া খুব খাওয়া দাওয়াও হয়েছে। এখন একটু বিশ্রাম চাই। আরও বেশ কিছুক্ষণ থাকার কথা বলেছিল সম্বিত। কিন্তু বাবা আসবে রাত দশটায়। এর মধ্যে না বাড়ি ঢুকলে খুব রাগারাগি করবে সে। মাকে একেবারে পাত্তা না দিলেও বাবাকে কিন্তু খুব ভয় করে কাজরি। আসলে ভালবাসে খুব তাই তাকে রাগাতে ইচ্ছে করে না একেবারে।
--কে রে কাজি এলি?
ঠাম্মাকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরের দিকেই চলে যাচ্ছিল সে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বুড়ি তাকে চিনতে পেরেছে? দিনের আলোতেই যে ভাল করে লোক চিনতে পারে না সে ভরা রাত সাড়ে নটার সময় চিনল কি করে?
বেশ হাসি হাসি মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে ঠাম্মা। সারা মুখে রসিকতার রেখা এঁকে তার দিকে আবার একটা প্রশ্নও ছুঁড়ে দিয়েছে, প্রেমের দিনটা কেমন কাটল দিদিভাই?
ঘরে বড় আলোটা জ্বলছে। অন্যদিন তো নাইট ল্যাম্প ছাড়া আর কিছু জ্বলে না। ঠাম্মার কোলে আজকের খবরের কাগজটা বড় করে পাতা। চোখে নতুন কেনা চশমা। একেবারে সদ্য নতুন। ঝকঝকে।

কবিতা / বসন্তাভাষ / গৌতম সেন



এক ঝলক রঙে ভেজা ভোরের আকাশ,
গতপ্রায় শীতের হিমেল স্মৃতি মাখা
বসন্তের আগমনী বাতাস। আভাষ
দিল বনে বনে নব কিশলয়, পত্রপুটে
নবীন জীবন সম্ভার আনন্দপ্রসাদ -
অশোক পলাশ কৃষ্ণচূড়া শিমুলেরা জোটে -
আনন্দবন্যা হ’য়ে বসন্তদুত ওই ফোটে।

কোকিলের কণ্ঠ হ’তে গাছের আড়ালে
কুহু-কুহু রবে গীতমুখরিত দিন- বসন্তবীণ
বাজে পরজের সুরে, ছন্দ মাত্রা তালে।
রঙের আবির মেখে ভালে, দিকচক্রবালে
দখিনা বাতাস দোলে বসন্ত রঙ্গিন।

নবীন-নবীনা, প্রাণযৌবন নব যৌবনা
আনমনা ধরা, প্রেম-ভাবনা বিভোর -
ভালবাসা ভাল বেসে আঁকে আলপনা,
আঙিনায় আনন্দ-খুশির তোড়-জোড়।
সাজো সাজো রব মাঝে উৎসব সম্ভাবনা,
পরিধি ব্যপ্ত এক সুললিত বসন্ত বন্দনা।

গল্প / গঙ্গাপ্রসাদ / নারায়ণ রায়।



বাঁকুড়া জেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম পলাশ ডাঙ্গা, আর সেই গ্রামের ছোট্ট একটি ছেলে গঙ্গাপ্রসাদ মুখার্জি। দামোদরের একদিকে বাঁকুড়ার পলাশডাঙ্গা আর অপর প্রান্তে বধর্মান জেলার কাঁকসা। গঙ্গা বড়দের কাছে শুনেছে দামোদর নদ পার হয়ে ওপারে গিয়ে কাঁকসা থেকে রেল গাড়ি চেপেই যাওয়া যায় কলকাতায়। তখনও বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন চালু হয়নি। বাষ্প ওড়াতে ওড়াতে সে ট্রেন যন্ত্রের সাহায্যে ছুটে চলে। সেটা বিংশ শতাব্দীর মাঝা মাঝি। তখন ভারত সবে স্বাধীন হয়েছে।


গঙ্গাপ্রসাদের গ্রামের যারা কলকাতায় থাকে তাদের মুখে সে শুনেছে যে কলকাতায় নাকি হাওয়ায় টাকা ওড়ে শুধু ধরে নিতে জানতে হয়
সেই কলকাতায় যাওয়ার জন্য গঙ্গা প্রসাদের যেন আর তর সয় না গঙ্গা প্রসাদ তার সমবয়সী বন্ধুদের বলে, “জানিস একদিন আমি ওই নদ পার হয়ে কলকাতায় চলে যাব। তারপর অনেক অনেক টাকা রোজগার করব।তবে তার এই কথায় সমবয়সী ইয়ার বন্ধুরা কেউ তেমন উৎসাহ দেয় না। বরং সবাই তাকে উপহাস আর বিদ্রূপের করে; তবে কথাটি যখন তার খেলার সাথী দশ বছর বয়সের সুলতাকে বলল, তখন সুলতা বলল, “সেই ভা্ল, তবে আমাকে কলকাতায় নিয়ে যাবে তো?” গঙ্গা গম্ভীর মুখে বলে, “দূর বোকা কলকাতায় মেয়েরা যায় না সেখানে শুধু পুরুষ মানুষরা যায়।বারো বছর বয়সের গঙ্গা- মুখে পুরুষ মানুষ শব্দটা শুনে সুলতারও কেমন যেন হাসি পেল। সুলতার মা তার বাবা-কে বলে, ‘পুরুষ মানুষ সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে লজ্জা করে না’? বাইরে বেরিয়ে কিছু কাজ কর্ম তো করলে পার? কিন্তু সুলতার দাদাকে তো কোনদিন ওর মা পুরুষ মানুষ বলে না ? তাকে বলেছেলেরা সংসারে কত কাজ করে আর তুই সারাদিন শুধু ঘুরে ঘুরে বেড়াস’?


সেই গঙ্গা একদিন আরো বড় হল, গ্রামের পাঠশালার পাঠ শেষ করে বাবার কাছে কিম্বা খুড়োর কাছে তাদের পৈত্রিক চাষ বাস সংক্রান্ত কাজকর্ম শিখে নিলো এখন সে ষোল বছরের তরতাজা কিশোর। কিন্তু এখনও সে মাথায় সযত্নে দুটি জিনিস পোষন করে চলেছে। এক নম্বর হচ্ছে যত দিন যাচ্ছে সুলতা যেন তার মাথায় আরও বেশী করে চেপে বসছে। এমন কোনদিন নেই ওর মাথায় সুলতার মুখ-টা ভেসে ওঠে না। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে কলকাতা যাওয়ার সেই সুপ্ত বাসনা, এবং দিন দিন দুটি বাসনাই যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ইতিমধ্যে সুলতার বয়স চোদ্দ বছর হল, সেই যুগে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বয়সের পরেও কুমারী রাখা আর সমাজে একঘরে হয়ে যাওয়া প্রায় সমার্থক। শেষে একদিন গঙ্গা ঠিক করেই ফেলল, আপাতত সে কলকাতাতেই চলে যাবে এবং কিছু পয়সা উপার্জ্জন করে গ্রামে ফিরে আসবে। গঙ্গা প্রভুত অর্থের মালিক হলে সুলতা নিশ্চই সব কিছু মেনে নেবে। সুলতারাও ব্রাহ্মণ, দেখতে ভাল ওর বাবার গ্রামে বেশ প্রতিপত্তি আছে তাই গঙ্গার আশা দুই পরিবারের তরফ থেকে কোন রকম বাধা আসবে না। শুধু একটা বছর কোনরকমে সুলতার বিয়েটা আটকে রাখা


একদিন গঙ্গার মনের কথা সুলতাকে বলতেই, সুলতা চোখের জলে তাকে একটাই উত্তর দিল..., “তুমি আমাকে কেনার জন্য কত টাকা দেবে গঙ্গা-দা ?” গঙ্গা উত্তেজিত হয়ে বলে, “ছি! সুলতা, কথা তুই কি করে বললি ? তোকে কি আমি টাকা দিয়ে কিনব বলেছি? তুই কি জানিস কোন মেয়েরা টাকার বিনিময়ে বিক্রী হয় ?” সুলতা তার উত্তরে খুব শান্ত ভাবেই বলল, “বিলক্ষন জানি, আর জানি বলেই তো আমার মনে এত শঙ্কা। তোমরা ছেলেরা প্রেম, ভালবাসার সঙ্গে টাকাকে বড্ড গুলিয়ে ফেলো। তোমাদের কাছে প্রেম ভালবাসা মানে শুধুই টাকা আর শরীর।


একথা শুনে আরও উত্তেজিত হয়ে গঙ্গা বলল, “ছি সুলতা ছি ! তোর এত অবনতি? তুই কি বলতে চাস যে আমি তোর শরীরটা একদিন পাব সেই আসায় প্রতিদিন তোর কাছে আসি?” হঠাৎ উত্তেজিত গঙ্গা কাঁপতে কাঁপতে বলল, “একমাত্র বেবুশ্যে মেয়েরাই এই ধরনের কথা বলে, তা এই ব্যবসা তুই কতদিন হল শুরু করেছিস?” কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যাবার পরই গঙ্গাপ্রসাদ বুঝতে পারল কি মারাত্মক কথা ওর মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু তার উত্তরে সুলতা এতটুকুও উত্তেজিত না হয়ে বলল, “এখনও শুরু করিনি তবে যদি কোনদিন শুরু করি , জানবে সেদিন তুমিই হবে আমার প্রথম খদ্দের।


সারা রাত এক সুতীব্র অনুশোচনা যেন গঙ্গা প্রসাদের শরীর মনকে জ্বালিয়ে দিতে থাকল। সারা রাত্রি এক ফোঁটা ঘুম হল না। অন্ধকার থাকতেই ভোর বেলায় সবার অলক্ষে গঙ্গা কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তখন ভারত সবে স্বাধীন হয়েছে, সীমিত ক্ষমতার মধ্যেই সরকার দেশ গঠনের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। তার উপর ওপার বাংলা থেকে এসেছে লক্ষ লক্ষ শরনার্থী, তাদের পুনর্বাসন দরকার। বিভিন্ন উদবাস্তু ক্যাম্প গুলোতেও প্রচুর কাজ হচ্ছে। এক কথায় ঠিকাদার দের তখন পোয়াবারো। গঙ্গা তেমনই একটি ঠিকাদার সংস্থায় সামান্য বেতনের চাকরিতে ঢুকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বেশ কয়েক বছর চাকুরিতে রত থেকে বেশ কিছু অর্থের মালিক হল।


মনের জোরে ইচ্ছে করেই এত দিন গ্রামে ফেরেনি। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেও ভাল ছিল না, গ্রামে তার পিতা মাতা এবং গ্রামের অন্যান্য সকলে গঙ্গা চিরকালের জন্য নিরুদ্দেশ ধরে নিয়েই তার প্রত্যাবর্তের আশা ত্যাগ করে দেয়। শুধু সুলতা বিবাহের পরেও আজও প্রতিদিন গঙ্গা নাম জপ করে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে চলেছে। তবে কলকাতা শহরে সে নিজেকে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করে প্রায় পাঁচ বছর পরে প্রথম বার বাঁকুড়ায় নিজের গ্রামে ফিরল এবং আত্মীয় পরিজন দের সঙ্গে সাক্ষাত করে সুলতার বিবাহের খবর শুনে কিছুদিনের মধ্যেই আবার কলকাতায় ফিরে এল। এবার যেন আরও বেশী করে কাজকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং স্বীয় ক্ষমতায় অল্পদিনে নিজেই একটি ঐরূপ একটি ঠিকাদরি সংস্থা খুলে ফেলল। কিছুদিনের মধ্যেই প্রচুর টাকা উপার্জ্জন করে সে কলকাতা উচ্চবিত্ত সমাজে তার স্থান পাকা করে নিল। কলকাতা শহরে তার তখন তিনটে বাড়ি দুটি গাড়ি।


এই ভাবে চলতে চলতে একদিন মধ্য চল্লিশের গঙ্গা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ করল তার মাথার চুলে পাক ধরেছে চোখের কোনে শরীরের উপর অত্যাচারের লক্ষণ স্পষ্ট। অত্যাচার বলতে শুধু কাজ আর কাজ, আর সন্ধ্যায় ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে বসে একটু মদ্যপান। পলাশ ডাঙ্গার সেই কিশোর গঙ্গাপ্রসাদ আজ অনেক পরিণত। সারাদিন পরিশ্রম করে কোম্পানীর সকল কাজ এখন নিজে একাই দেখাশোনা করে। সেই সুবাদে বড় সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা করে ইংরাজীটাও এখন মোটামুটি ভালই শিখেছে


সারাদিন খাটা খাটনির পর অবিবাহিত গঙ্গা ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপান করতে বসে, তবে ইদানিং সে একটা জিনিস লক্ষ করেছে, মনে মনে সে যেন কারও সঙ্গ কামনা করে। তার মনে এখনও কি সুলতার সেই নিষ্পাপ মুখটাই উকি দেয় ? বন্ধুদের কাছে কথা বলতেই তারা উপদেশ দিল...... মনের আর দোষ কি? এই বয়সে শরীর মন দুই তো সঙ্গ কামনা করবে...... আর সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও গঙ্গা যেন সবাইকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারে না। সঙ্গ ঠিক সেই সঙ্গ নয়। এটা ঠিক স্ত্রীর সঙ্গ নয়। কোন নারী সঙ্গ নয়। যেন সারাদিন খাটা খাটনির পর বাড়ির কোন আপনজনের সঙ্গ। যা থেকে গঙ্গা আজ দীর্ঘদিন বঞ্চিত


তবু বন্ধুরা তাকে বোঝায় সারাদিন খাটা খাটনির পর সন্ধ্যাবেলায় একটু নাচ গানের আসরে গেলে মনটা দুদিনে অনেক হাল্কা হয়ে যাবে। কথায় বলে যেখানে টাকা ওড়ে, সেখানেই সুন্দরীরা ঘোরে। কিছুদিনের মধ্যেই গঙ্গার এক ঘনিষ্ট বন্ধু কানাই খবর দিল বউবাজারে একজন বাঙ্গালী বাইজী এসেছে, তার যেমন রূপ তেমন- গানের গলা। বন্ধুদের পরামর্শে পরদিন সদলবলে গঙ্গা সেখানে গিয়ে হাজির। অত্যন্ত সুদৃশ্য এবং সুসজ্জিত একটি ঘরে গঙ্গা সবান্ধব বসল। গঙ্গার একটু অস্বস্তি হচ্ছে। এই প্রথম সে এই রকম একটা পরিবেশে এসেছে। সঙ্গীতের বাজনদাররা যে যার নিজের নিজের জায়গায় এসে বসল। সুসজ্জিত রেকাবে পানপাত্রে অতিথিদের খাদ্য এবং পানীও পরিবেশন করা হল। আর তার সামান্য পরেই এক পরমা সুন্দরী তার দুই সখীকে নিয়ে ওই ঘরে প্রবেশ করল। অষ্টাদশী পরমা সুন্দরী মেয়েটি ঠিক গঙ্গার মুখো-মুখি বসতেই গঙ্গার নজর গিয়ে পড়ল তার মুখের উপর। সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার সমস্ত শরীরে যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত হয়ে গেল। সেই মুখ, সেই চোখ, এমনকি গলার স্বরও ঠিক তার মত। কিন্তু তা কি করে সম্ভব? এর বয়স খুব বেশী হলে আঠারো-কুড়ি বছর হবে আর সে তো...... গঙ্গা কৌতুহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “মা তোমার নাম কি?” বন্ধুরা অবাক... একজন বাইজিকে মা বলে সম্বোধন ? উত্তরে বাইজিটি বলল, “হুজুর বোধ হয় এই লাইনে প্রথম, হুজুরের জানা নেই যে বাইজীদের আসল নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করতে নেই?” গঙ্গা সবাইকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল, “আমার শরীর খারাপ লাগছে আমি এখন- বাড়ি যাবো।বাড়িতে ফিরে গঙ্গা তার চব্বিশ ঘন্টার কাজের লোক কানাই-কে বলল, “যে করেই হোক, যত টাকা লাগে লাগুক ... মেয়েটির আসল পরিচয় খুজে বের করতেই হবে। যতদিন না ওর আসল পরিচয় জানা যাচ্ছে ততদিন কোন কাজ করবে না। মেয়েটি বাইজী হিসেবে প্রতিদিন যে টাকা রোজগার করে সেটা ওকে আমি- দেব।


দুইদিনের মধ্যেই কানাই খবর নিয়ে এল, মেয়েটির আসল নাম বিজয়া, বাবার নাম যাদব ভট্টাচায্য বাড়ি বাঁকুড়ার সোনামুখি গ্রামে। বাবাটি বড়ই চরিত্রহীন স্ত্রী কন্যার প্রতি তার কোন নজর নেই। গঙ্গা উত্তেজনায় কাপতে কাপতে চিৎকার করতে থাকে ...নিকুচি করেছে ওর বাবার নাম ঠিকানায়... ওর মায়ের নাম কি? মামার বাড়ি কোথায় সেই খবর নিয়ে এস।কানাই বলল, “আমি তাও এনেছি, ওর মামার বাড়ি পলাশডাঙ্গা, আর মা সুলতা সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন।একথা শুনেই গঙ্গা পাগলের মত হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বাড়ির যত পরিচারক, পরিচারিকারা তঠস্থ হয়ে ওর মুখ চাওয়া চায়ি করতে লাগল।


পরদিন সক্কালে উঠে গঙ্গা একাই দৌড়ে গেল সেই বাইজী বাড়িতে। উদভ্রান্তের মত ছোটা ছুটি করে খুঁজে বের করল বাড়ির মালকিন মাসীকে। বলল, “কোথায় তোমার বিজয়া? আমার এখন- ওকে চাই।মালকীন ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতে এক টাকা দু টাকা নয় দশ হাজার টাকা গুজে দিয়ে বলল, “বিজয়াকে এখন- আমার চাই।মাসী জীবনে একশো টাকার বেশী কখনো দেখেনি। সেই যুগে দশ হাজার টাকায় একটা ছোটখাটো দোতলা বাড়ি হয়ে যেত। এত গুলো টাকা হাতে পেয়ে কেমন যেন ভয় পেয়ে গিয়ে তখনই সাজিয়ে গুজিয়ে বিজয়াকে গঙ্গার হাতে তুলে দিল। গঙ্গা বিজয়াকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, “কিরে আমাকে চিনতে পারিসনি তো? আমি গঙ্গা মুখুজ্জে, পলাশডাঙ্গার গঙ্গা। আমার একার সংসারে এত সম্পত্তি কে দেখবে বলতো? চল তাই তোকে নিতে এলাম...পারবি না তোর এই বুড়ো ছেলেটাকে শাসন করে সংসারের হাল ধরতে ? আর এই সারাদিন খাটা খাটনি, আর মদ মাংস এসব আর ভাল লাগে না রে ? চল আমি তোকে নিয়ে যেতে গাড়ি নিয়ে এসেছি। তাড়াতাড়ি চল আমরা মা আর বেটায় মিলে নতুন করে সংসারটা শুরু করি।বিজয়া তার মায়ের কাছে অনেকবার গঙ্গা মুখুজ্জের নাম শুনেছে... তাই গঙ্গা-কে চিনে নিতে তার অসুবিধা হল না। সে তার বুড়ো ছেলের সঙ্গে গাড়িতে গিয়ে উঠল। ওদিকে এই প্রথম কুঠির মানুষরা তাদের দোর্দন্ড প্রতাপশালী মাসীর চোখে জল দেখলো


সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া