Friday, August 24, 2018

রম্যরচনা / এখন কটা বাজে ? / বুবুসীমা চট্টোপাধ্যায়






 সিধু জ্যাঠার  [মানে আমাদের পাড়ার সিদ্ধার্থ ঘোষাল ] ঘণ্টায় ঘণ্টায় অচেতন হয়ে যাওয়াটা দেখে খুব মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম যখন তখন রাত বেড়েছে বেশ  । সকাল থেকে ভালোই ছিলেন জ্যাঠীমা  হঠাৎ কি এমন হল যে ভর সন্ধ্যায় মানুষ টা সিরিয়াল দেখতে দেখতে চলে গেলেন চিরতরে । মন ভার খুব তাই কবিতা পাড়ায় একবার না গেলে কিছুতেই মন শান্ত হবে না আমার । বারবার জ্যেঠীমার চওড়া সিঁথিতে সিন্দুর মাখানো মুখটাই মনে পড়ছে । জ্যাঠীমাকে কাঁচের গাড়িতে তোলার আগে জ্যাঠা আমায় বললেন----- ''মা রে তোর জ্যাঠীকে এই লাল বড় টিপটা পরিয়ে দে না মা কাল সন্ধ্যায় কিনে আনতে বলেছিলেন তার আর পরা হলনা'' । 
জ্যাঠার ছেলে মেয়েরা  বিলেতে পড়সি বলতে আমরা কজন আর এক দূর সম্পর্কের ভাইপোমা-বাপ মরা গরিবের ছেলে জ্যাঠীর কাছে কাছে থাকতো । এতো রাতে তার উপরেই জ্যাঠার দায়িত্ব দিয়ে আমরা নিজের নিজের বাড়ি এলাম পাড়ার প্রায় সব পুরুষেরাই আজ শ্মশানযাত্রী জ্যাঠীমাকে নিয়ে বার্নিং ঘাটে  গেলেন ।
তখন অনেক রাত্রি স্নান করে একবার নেটে বসলাম কিছু পড়বো বলে । ফেসবুক অন করলাম এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল খেয়ে বিছানায় ছেলের ঘুমন্ত গায়ে হেলান দিয়ে মন কে শান্ত করতে গিয়ে দেখি একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট ... কবিতায় মন আজ বসবে না তাই ঢুকলাম রিকোয়েস্ট বাবুর দেয়ালে । আঁতিপাঁতি খুঁজেও আহামরি কিছু প্রোফাইলে দেখলাম না ... দেখলাম নানা বিদেশী সিনসিনারি । ঠিকানাও হাঁওমাঁওচাঁও কি একটা- উদ্ধার করতেও  পারলাম না ।। এই করতে করতেই ইনবক্সে ঢিপ করে একটা মেসেজ ঢুকলো ।
মেসেজ পড়ার আগেই কর্তার ফোন ,  
বলল ----দেরি হবে ফিরতে শ্মশানে লম্বা লাইনতোমরা মেইন গেট বন্ধ করে শুয়ে পড়ো ।
এবার সোফায় বসে পড়তে লাগলাম মেসেজ -
''------ 
হাই ডার্লিং , আমি সিড তুমি  কিন্তু খুব কিউট খুব ভালো কবিতাও লেখো গুনি মেয়ে, অনেক আশীর্বাদ তোমায়। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন তুমি খুব সুইটি লাল বড় টিপ দারুন''  

আমি মেসেজটা পড়ার পরেই ঢিপ করে মাটিতে বসে পড়লাম একি? ?
আমার টিপের দিকে নজর দেয় কে দেখিতো ব্যাটার  পি পি টা / হ্যাঁ ঠিক ধরেছি ...এই ছবিই তো আমায় একদিন দেখিয়েছিলেন জ্যাঠীমা । ভাবতে ভাবতেই আবার ফোন কর্তার ।।
'' --------শোনো আমরা ফিরে আসছি দারুন খবর আছে সাথে জ্যাঠীমাও আসছেন   হাসপাতাল হয়েই ফিরবো । শ্মশানে  হঠাৎ শ্যামলের  ফোনে রিং হচ্ছিল  ''ওপারে তুমি শ্যাম এপারে আমি ...।''  আর সেই সুর মরা  জ্যাঠইমার কানে পৌঁছেই  কি ভাবে যে কি হয়ে গেল ।আমরা  কিছু বোঝার আগেই জ্যাঠীমা উঠে বসে পড়েছে বলে কিনা
 ‘---------------- --কে ফোন করেছে রে? সিড নাকি এ আমি কোথায় এসেছি ?' 
শোনো সুখবরটা সিধু জ্যাঠাকে দিয়ে এসো ডার্লিং তবে এই ‘সিডের’  কথা বলনা জ্যাঠাকে যেন জ্যাঠীমা নিষেধ করে দিলেন বলতে । তাছাড়া জ্যাঠা যা সেন্সলেস হয়ে পড়ছিলেন বার বার । ''
ফোন কেটে যাবার পর আমার আর কিছুই মনে নেই ...।
এখন চোখ খুলে দেখছি একদিকে জ্যাঠীমা মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর একদিকে জ্যাঠা তাকিয়ে আছে জ্যাঠীমার আর আমার দিকে । আর আমার গুনধর ছেলে ? যে কিনা আমায় ফেসবুক একাউনট খুলে দিয়েছিল সে শুধুই হাসে আর হাসে আর হাসে ...... ।। আমি শুধাই ----------
এখন কটা বাজে ???????






ধারাবাহিক / দিয়ার ডায়েরী ২য় ভাগ / পারমিতা চ্যাটার্জী


দিয়াদের দিনকি আজও শেষ হয়েছে ? একটাই প্রশ্ন দিয়ার মনে জেগে ওঠে বার বার—উত্তর খুজে চলে দিয়া – হয়তো কোথাও শেষ হয়েছে, কোথাও আজও দিয়ারা যুদ্ধ করে চলেছে- তবুও তারা ঘরের আগল খুলে বেরিয়ে আসতে পেরেছে—ঘরে বাইরে সমান ভাবে লড়াই করে চলেছে আজকের দিয়ারা—
আজ তাদের এ কথা অন্তত শুনতে হয়না সারাদিন পরিশ্রমের পর ঘরের সবচেয়ে কাছের মানুষটির কাছে –‘ সারাদিন তো ঘরেই বসে থাকো –রোজগার তো আর করতে হয়না ‘। অথচ রোজগার করার পথ যে ঘরের পুরুষরাই সংসার করার জন্য বন্ধ করে দিতে বাধ্য করতেন তা তারা ভুলেই যান। তখন পিতৃবাক্য তাদের কাছে বেদবাক্য হয়ে যায়—স্ত্রীর অপমান , লাঞ্ছনা, যন্ত্রণা সবই তাদের কাছে নিতান্তই মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
প্রতিদিনের এই লাঞ্ছনা সহ্য করতে করতে একদিন দিয়ার মতন সহনশীল মেয়ের চোখেও আগুন জ্বলে ওঠে—যখন দেখে স্বামী তার পরনারীতে আসক্ত। সেদিন দিয়ার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় --- বেরিয়ে আসে ঘরের আগল খুলে—নিজের পায়ের তলায় একটা মাটি পাওয়ার জন্য আপ্রাণ লড়াই করে—সেই সাথে চলে মেয়েদের মানুষ করে তোলার এক অদম্য প্রয়াস—
তারপর একসময় দিয়া সফলতার মুখ দেখতে শুরু করে—যদিও স্বামীর থেকে তার ক্রমশ দূরত্ব বাড়তে থাকে—কিন্তু সাফল্যের চাবিকাঠি তার হাতে আসতে থাকে। স্বামীর মধ্যে কোনোদিনই সে ভালোবাসা খুঁজে পায়নি তাই আজ ও নিয়ে তার নতুন করে কষ্ট পায়না—কিন্তু এক তীব্র অপমানে তার নারীসত্বা জ্বলতে থাকে—দিনের পর দিন স্বামী যখন পরস্ত্রীকে নিয়ে তারই চোখের সামনে বিদেশ বেড়াতে যায় বা ছুটির দিনগুলি কাটায় তার সাথে কখনও রায়চক বা ডায়মণ্ডহারবারে বা কখনও লংড্রাইভে--।
এমন কি দিয়া অপরেশন হয়ে পড়ে আছে নার্সিংহোমে—বড়মেয়ের বি এ পার্ট-১ পরীক্ষা- তার স্বামী তাকে দেখতে আসে ভিজিটিং আওয়ারের প্রায় শেষ পর্যায়- স্কার্ট পরা বান্ধবীকে সাথে নিয়ে—না সেদিনও দিয়া কাঁদেনি—চোখের জল তার শুকিয়ে গেছে –শুধু তীব্র অপমান বোধে ভিতরটা জ্বলতে থাকে আগুনের মতন—
প্রতিশোধের আগুন-।
দিয়া শুরু করে একটি বুটিক – সামান্য কিছু মুলধন সম্বল করে নামে কাজে—কিছু সুন্দর শাড়ী বানায়- তারপর বিভিন্ন কাগজের অফিসে গিয়ে তার শাড়ি দেখায়—নিয়মিত প্রতিবেদন বার হতে শুরু করে – ক্রমশ জমে উঠতে থাকে ব্যাবসা—ব্যাঙ্কলোন নিয়ে ব্যাবসা অনেক বাড়িয়ে তোলে—দিয়ার ক্রিয়েশন নামে চলতে থাকে তার বুটিক--। এক একটা এক্সিবিশনে তার তিন থেকে চার লাখ টাকার শাড়ী বিক্রি হতে থাকে--। স্বনির্ভর হল দিয়া- দেখিয়ে দিল দিয়া তার স্বামীকে রান্নাঘরের বাইরেও সে কিছু করতে পারে আবার সবাইকে নিয়ে সংসারও করতে পারে। স্বামী তাকে একদিন সবার সামনে অপমান করে বলেছিল ওই রান্নাটা ভালো কর ওটা নিয়েই থাকো ওর বাইরে আর কিছু করার চেষ্টা কোরোনা--। কিন্তু দিয়া দেখিয়ে দিল তিন শ্বশুর দেয়র,ননদ, তাদের বিয়ে দেওয়া—বাচ্ছা হওয়া, মেয়েদের মানুষ করেও নিজের পায়ের তলায় মাটি করে নিল।দিয়ার বড় মেয়ে তখন দিল্লী স্কুল অফ ইকনোমিক্স থেকে  পঞ্চম স্থান অধিকার করে মাস্টারস শেষ করে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ থেকেই ৭০হাজার টাকা মাইনের চাকরি পেয়ে যায় আর ছোটো মেয়েও উচ্চমাধ্যমিকে স্টার পেয়ে সেন্টজেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হয়—সেদিন দিয়ার চোখ ভর্তি জল হয়ে যায় না সে তার যুদ্ধ বৃথা যায়নি – সে সফল হয়েছে। শুধু মাঝে মাঝে তীব্র হতাশায় ডুবে যেত – যে স্বামীর সংসারের জন্য জীবনের সোনালী দিনগুলিকে , নিজের সমস্ত ইচ্ছাকে গলা টিপে মেরে ফেলে প্রাণ দিয়ে সংসার করে গেছে- সে স্বামী আজ পরনারীতে আশক্ত- এই অপমানটা মেনে নিতে তার বুক ভেঙে যেত –স্বামীর নিত্য অবহেলা, মহিলা বান্ধবীদের নিয়ে স্ত্রীর সামনেই নির্লজ্জ উন্মত্ততা তাকে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।


ক্রমশ

কবিতা / নদীটা শুকিয়ে যাচ্ছে / পিনাকী দত্ত গুপ্ত



আরো কিছু কথা শুনে রাখো আজ তোমরা
 নদীটা শুকিয়ে যাচ্ছে মরুর বুকেতে,
জনপদ ঘিরে রেখেছে হিংস্র শ্বাপদে,
উদগ্র লাভা পাহাড়ের জ্বালা-মুখেতে!

ভেবোনা সবটা মানতেই হবে তোমাদের
শুধু চেয়ে দেখো চাঁদটাও আজ জ্বলছে,
সীমানা দখলে ধুমকেতু আর তারাদের
হয়ত ক্ষণিক যুদ্ধবিরতি চলছে;

মৃত্যু মিছিলে যদি বলো কেন আমি নেই
চশমাটা খুলে খালি চোখে শুধু তাকিও,
আফিঙের বিষে অর্ধ-সত্য যাপনে,
আমিতো বলিনি বাকি আছো তুমি, বাকি ও!

আবার বৃষ্টি নামবে, বৃষ্টি নামবেই
প্রত্যয় আছে একদিন ফুল ফুটবেই
বদ্ধ-ভূমিতে নবজাতকের কন্ঠে
মুক্তির দাবী নিশ্চিৎ জেনো উঠবেই...

তোমরা বোঝোনি, বুঝবেনা জানি কোনোদিন
নদীটা শুকিয়ে যাচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে,
আমি বেঁচে আছি অমাবশ্যার ছায়াতে
গোগ্রাসে রাহু চাঁদটাকে ছিড়ে খাচ্ছে ;

 বিশ্বাস করো, বুকে হাত রেখে বলছি
 কেন জানি আজ ভীষণ কান্না পাচ্ছে...



কবিতা / দিঘলের এক প্রেম / প্রজ্ঞা পারমিতা



বেজায় দিঘলের এক প্রেম
পেস্টিসাইডে চাপা দিয়েছিলো বুঝি
অহংকারে?
ঘৃণাতে ?
অভিমানে?
নাকি সুন্দর সাজানো অনন্য এক সংসারী পুরুষের তকমার লোভে?
হয়তোবা সমাজের চোখে মহান হতেই।
প্রেমের কাব্য খোশে পড়া।
হলুদ হয়ে যাওয়া পুরোনো প্রেমপত্র
ভাঁজে ভাঁজে নীল লাল কালি কী রাঙিয়ে দিলো মন ?
খুঁজে পেলে হৃদয় একটু মোচড় দিলো
গভীর গোপন কোনো ব্যাথা কি চিমটি কাটলো?
মুখ ঘুড়িয়ে চলে যাবার পরেও
জাবর কাটা থাকে ?
কথায় মুখর না হলেও
মুঠোফোনে অংকের সংখ্যা বাড়ানোর নিস্পৃহতা ,
মোহনবাঁশিটি বাজালেনা।
তাই কৌতূহলের গলাতেও ফাঁস।
ভুলে থাকার ভান ,ভুলতে পারা ,
আদপে ভুলে যাওয়া
ভুলে ভরা নয় কি?
তুমুলের করে চাওয়া যদি
পাওয়ার অভিলাষ নেই ;
তাগিদ নেই।
প্রেম মর্মান্তিক।
প্রেমের পথ ও পাঠ দুরূহ।
মিছে ভান ,মিছে অভিমান,
মিছে ক্ষোভ ,মিছে মোহ।
আমি নারী ,
নীড় নই। নীর ও নই।
জীবন শিখিয়েছে যাপন
ভুলতে চাইলে ভুলতে পারার দক্ষতা রাখি।
সুখের ঘরে মারিনা টোকা ,
লাজ লজ্জা মোহ অভিমান অহংকার
আজ সবটাই খেলো ,খেলা ও খোলা ।


কবিতা / করুণা অন্তহীন ! - সোমা বসু





চক্রবৎ পরিবর্তন্তে... সুখদুঃখের রাশি ।   
জানা আছে জানি চিরন্তন এই কঠিন বিষম বাণী - 
একদিন যে জলের প্রান্তে এলে 
কঠিন ভাষার ফুলঝুরি দিত জ্বেলে -         
আজ 
সে-ই বসেছে জলের প্রান্তে নিভয় নিডর প্রাণ ! 

একদিন যে অগ্নিস্নাত কাতর ব্যথিত প্রাণ, 
মনোহরণ বাঁশির সুরে শুচি পবিত্র প্রাণ - 
আজ 
সে-ই বসেছে আগুনলাল আসন'পর
অনায়াস অজ্ঞাতে ! 

একদিন যে মুখে তুলে দিত অন্ন অসহায় ক্ষুধাতুরে, 
আজ                   
সেই মুখে নেই কোন স্বাদ আর, নেই কোন স্বাদ অন্নে  - 
বুকে বেঁধে রেখে সাবধানতার শেকল নিগড় যত, 
ধাপে ধাপ রেখে পুণ্যবিচারবাণী - 
আজ        
তার ই কাঁপে বুক অসহায় জন, জনতা হাজার মাঝে  -

কাঁপা হাত খোঁজে সমবায় সমব্যথী ! 

একদিন দিল সে দীক্ষা সরস্বতীর ঘরে, 
সে ই আজ দেখো নিথর নিবাক
বন্ধ করেছে  অবাক সবাক একটুকু বাচালতা ! 

একদিন ছিল অভয় সজাগ অবাধ বিচরণ  - 
আজ 
পদে পদে বাধা অক্ষমতার, ঘেরে শৈবাল সহজ জীবনতল ! 

করুণার পথে যাত্রা পিছল চলাচল অসহায়... 
চোখের জলের ধারায় পিছল অসহায় চঞ্চল । 

"একি করুণা করুণাময়... "


অনু গল্প / মধুরেণ / শমিতা চক্রবর্তী






ঝুলন টাকে সত্যিই হিংসে হয় ,না ঝুলন সুন্দরী বলে নয় , পড়াশোনা -নাচ -গান সবেতেই আমাকে হারিয়ে দেয় বলেও নয় ! এমনিতে আমি আর ঝুলন হরিহর আত্মা ! হিংসে টা হয় ওদের বাড়ি টা দেখে -সবাই মিলে কী সুন্দর হৈ হৈ করে একসাথে থাকে ! আর আমি মা -বাবার একমাত্র সন্তান যেন খাঁ খাঁ মরুভূমির বাসিন্দা !  আর রাখী দি -ঝুলনের জ্যাঠতুতো দিদি ,তার তো তুলনাই হয় না ! ঝুলনের সব বিপদের পরিত্রাতা হয়ে দাঁড়ায় ! সুন্দরী ঝুলন অজস্র বার প্রেমে পড়ে |আর তার স্থায়িত্ব ঐ কখনও সপ্তাহ খানেক , কখনও বা মাস খানেক -এর বেশী হয় না ! কেমন করে যেন প্রত্যেকবার ই সে খবর সৌরভ দার কানে পৌঁছে যায়|ব্যস আর যায় কোথায় ! সৌরভ দা ঝুলনের জ্যাঠতুতো দাদা ,ওকে আমরা সব্বাই ভয় পাই ! এতো ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট তার ওপর আবার ভীষণ রাসভারী ! তা ঝুলনের ঐ ক্ষণস্থায়ী প্রেমের খবর সৌরভ দার কানে পৌঁছলেই একেবারে ধুন্ধুমার কান্ড ঘটার উপক্রম হয় |কিন্তু রাখী দি  প্রত্যেকবারই পরিত্রাতার ভূমিকা নেয় ! 

         ঝুলন কে হিংসের প্রধান কারণ বোধহয় এটাই -ঝুলনের রাখী দি আছে !  রাখী দি আমাদের সব্বার বড় প্রিয় | মা বলে দেখেছিস রাখী টাকে? কোন ছোট্টবেলা থেকে কেমন মা -কাকিমার হাতে হাতে সব কাজ করছে --আর তোদের ধিঙ্গীপনা এখনও গেলনা ! জ্যেঠিমা অবশ্য মাঝে মাঝে দুঃখ করেন -এমন ভালো মেয়েটা আমার ,কেউ বুঝলো না শুধু রূপটাই বুঝি সব ! জ্যেঠিমার আক্ষেপের কারণ --দু -দুটো পাত্রপক্ষ রিজেক্ট করে গেলো রাখী দিকে --দেখতে তো তেমন ভালো নয় --তার ওপর লেখাপড়া ও তথৈবচ ! ---আমি অবশ্য বুঝেই পাইনা --রাখী দি কোথায় অসুন্দর ! 

                   সৌরভ দা অবশ্য এতে খুব বিরক্ত হয়েছে !  জ্যেঠিমাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে --মা আমার বোনটা কি ফেলনা নাকি ! এভাবে ওকে বার বার ঐ পাত্রপক্ষের সামনে বসিও না তো ! সৌরভ দার মুখের ওপর কিছু বলেনি বটে জ্যেঠু -জ্যেঠিমা ,যা রাগী ছেলে ! মনে মনে ভেবেছে কন্যাদায় বড় দায় ,এতো গুমর দেখালে চলে ! 

           সৌরভ দা যা রাগী ,আমরা ভয়ে তটস্থ |যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে এখন একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী তে কাজ নিয়ে সুদূর ব্যাঙ্গালোরে এই যা রক্ষে ! কিন্তু সৈকত দা --সৌরভ দার প্রিয় বন্ধু টি এক্কেবারেই আলাদা --যেমন হাসিখুশী তেমনই হৈ -হুল্লোড়ে ! দুই ব্রিলিয়ান্টের বাস দুটি বিপরীত মেরুতে ,তবু বন্ধুত্ব একেবারে গলায় গলায় !  সেই কোন ছোট্টবেলা থেকেই  সৈকত দার এ বাড়িতে অবাধ আনাগোনা !  মা -মরা ছেলেটাকে এ বাড়ির জ্যেঠিমা-কাকিমারা অত্যন্ত স্নেহ করেন |জ্যেঠিমা তো সৌরভ আর সৈকত কে কোনদিন আলাদা চোখে দেখেন ই নি ! 

                    তা সেদিন এ বাড়িতে সবার বেশ মন খারাপ --রাখী দি তৃতীয় বারের জন্য রিজেক্ট হয়েছে ! আমি আর ঝুলন ভীত মুখে বসে আছি |স্কুলের হাতের কাজে দশ রকমের স্টিচের রুমাল করতে বলা হয়েছে |এ ব্যাপারে আমি আর ঝুলন এক্কেবারে অষ্টরম্ভা ,রাখী দি ই ভরসা |এ অবস্থায় কি করে বলি ওকে ! 
সৈকত দা হৈ হৈ করে ঘরে ঢুকলো তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গী তে ----কেস কি --সবাই এমন জলদগম্ভীর মুখে কেন ? ঝুলনের বেণী ধরে টেনে দিয়ে বললো কি ব্যাপার শ্রীমতি সংহিতা --স্বাগতা ম্যাডাম কোথায় ? এই এক স্বভাব সৈকত দার --কক্ষনো কাউকে ডাকনামে ডাকবে না !  আমার দিকে ফিরে বললো আর এই যে সঞ্চারী --বলি ব্যাপার কি --এমন বিমর্ষ কেন !  এরপর তো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে যেন কাউকে শুনিয়ে বললো ,"বলি এক কাপ চা কি আজ জুটবে না এ বাড়িতে !" রাখী দি কাজের কথা শুনলে আর স্থির থাকতে পারেনা --সঙ্গে সঙ্গে ছুটলো চায়ের জল চাপাতে ! সৈকত দা দুগালে হাত দিয়ে বিজ্ঞের মতো বললো ,"বুঝে গেছি --আবার সেই বিউটি কনটেস্ট ছিলো আজ !"
এভাবেই চললো কদিন --জ্যেঠু -জ্যেঠিমার মন ভার ! রাখী দির অবশ্য কোন হেলদোল নেই ! ঘরের কাজ , সেলাইফোঁড়াই নিয়ে বেশ আছে ! জ্যেঠিমা জ্যেঠু কে বললো্এ‌"ভাবে হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না |আবার পাত্র দেখতে হবে --মেয়েটাকে তো আর আইবুড়ো রেখে মরতে পারি না ! "
     
       সুতরাং আবার পাত্রী দেখাবার তোড়জোড় চলছে সেদিন |এবার অবশ্য জ্যেঠু বেশ আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছে --পাত্র জ্যেঠু র কোন কলিগের মামাতো শালার ছেলে ! জ্যেঠু স্পষ্ট বলে দিয়েছে --দেখো বাপু মেয়ে আমার তেমন সুন্দরী নয় -গায়ের রঙ ও বেশ চাপা --আর ঐ টেনেটুনে বি .এ .টা পাশ করেছে ! তবে একথা বলতে পারি --মেয়ের আমার মন টা এক্কেবারে খাঁটি সোনা ! আর ঘরকন্নার কাজ বল , সেলাইফোঁড়াই বল এসবে ওর জুড়ি মেলা ভার ! এতে যদি তোমার শালা রাজী থাকেন তবেই মেয়েকে দেখাবো নচেৎ নয় ! তা এরা মানুষ ভালো --সব জেনেশুনেই আজ আসছেন ! মা বললো ---রাখী কে হলদে রঙের শাড়ি পরিও দিদি --ঐ রঙে সব্বাই কে উজ্জ্বল লাগে ! সেইমতো রাখী দি আজ হলুদ রঙের শাড়ি তে কী সুন্দর লাগছে রাখী দি কে ! আমার চোখে তো রাখী দি আজ সাক্ষাৎ সরস্বতী ! জ্যেঠু -কাকু ভীষণ ব্যস্ত আজ |সৌরভ দা দূরে থাকে বলে সৈকত দা র ওপর ভীষণ নির্ভর করে জ্যেঠু |ভাগ্যে সৈকতটা এখানকার কলেজে ই চাকরী টা নিলো ! সৈকত দাও তদারকি তে ব্যস্ত আজ ! অবশেষে এলেন তাঁরা ,দেখে পছন্দ করে এক্কেবারে আশীর্বাদের দিনক্ষণ ঠিক করে জানাবেন বলেও গেলেন ! সবই ভালো ,শুধু আমি আর ঝুলন পাত্রের নাদুসনুদুস চেহারা নিয়ে খানিক হাসাহাসি করলাম |ঝুলনের নাকি ওনাকে দেখেই গণেশ ঠাকুরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল ! জ্যেঠু -জ্যেঠিমা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন !  মন্দ তো নয় ,সরকারী চাকুরে পাত্র ,বেশ অভিজাত পরিবার ! 

                       ইদানিং একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছিলাম,ঝুলন আর নতুন করে প্রেমে পড়ছে না |পড়াশোনায় গভীর মনোযোগ ! ওমা সেদিন ও বাড়িতে আড্ডা দিচ্ছি ,হঠাত্ দেখি ঝুলন আর সৈকত দা চোখের ইশারায় কথা চালাচালি করছে ! কি ব্যাপার --শেষে কি না সৈকত দা র সঙ্গে ! সৈকত দা কমপক্ষে দশ বছরের বড় হবে আমাদের থেকে ! ইস্ -গেলো রে এবার না সৌরভ দা -সৈকত দা র বন্ধুত্ব টাই ভেঙে যায় !  কি বেহায়া মেয়ে রে বাবা !  সুয়োগ বুঝে পাকড়াও করলাম ঝুলন কে ,"তোর তলে তলে এই !এবার সৈকত দা কে পাকড়েছিস !তোর লজ্জো করে না !" ও বাবা ,সে তো উত্তরই দিলো না !উল্টে চোখ মটকে কিসের ইঙ্গিত দিলো কে জানে ! মহা বদ মেয়ে ! বিপদে পড়লে বাঁচাবে কে ?এবার তো রাখী দির ও বিয়ে হয়ে যাবে ! 

                     নাঃ বিয়েটা হলোনা রাখী দির ,এ সম্বন্ধ টাও ভেঙে গেলো |জ্যেঠু কে তাঁর কলিগ নাকি জানিয়ে দিয়েছেন ,তাঁর শালারা নাকি এ বিয়েতে আগ্রহী নয় |কে নাকি চিঠি দিয়ে জানিয়েছে মেয়ের কোন গোপন রোগ আছে !  কি কান্ড -কে এমন ভাঙচি দিলো কে জানে ! রাখীর সঙ্গে কারই বা শত্রুতা ! 
আবার কিছুদিনের মন খারাপের পর্ব ! এবার আমার বাবা একটি সম্বন্ধ আনলো |ছেলে ভালো ,রেলে চাকরী করে ,তবে বয়স টা একটু বেশী | তা হোক -জ্যেঠু -জ্যেঠিমা রাজী হয়ে গেলো l সুতরাং আবার সেই আয়োজন |এনারও পাত্রী পছন্দই জানিয়ে গেলেন l 

                        কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার ,সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি| কে নাকি চিঠি দিয়ে জানিয়েছে মেয়ের কোন গোপন রোগের খবর !  এবারে জ্যেঠুরা সত্যিই হতোদ্যম হয়ে পড়লেন ! জ্যেঠিমার মন খারাপ ,শরীর খারাপ ,সৌরভ দা কে তলব করা হলো !
সৌরভ দা এসেই রাগারাগি শুরু করলো |তোমরা রাখী টাকে আবার বাজারের আলু পটলের মতো দেখাতে শুরু করলে ! বিয়ে না হলে ও কি জলে পড়বে ! জ্যেঠিমার শরীর নিয়েও উদ্বিগ্ন হলো সৌরভ দা ,বি পি টা বেশ বেড়ে গেছে !  এবার যেন সৌরভ দা ও কেমন মুষড়ে পড়েছে মনে হল |সেটা জ্যেঠিমার শরীরের কারণে না বোনের পাত্রপক্ষের কাছে বার বার প্রত্যাখাত হবার কারণে বোঝা গেলনা ! সেদিন বিকেলের দিকে সৌরভ দা গেলো সৈকত দার বাড়ি l 

           সৈকত দা নাকি নিজের স্টাডি তে তখন |কাশী দা,ওদের বাড়ির বহু পুরোনো কাজের লোক জানালো -সোজা দাদাবাবুর এস্টাডি তে চলে যাও ! সৈকত দা তখন একমনে কি যেন একটা লিখছে ,সৌরভ দার আগমন টেরই পাইনি ! হঠাত্ ই সৌরভ দা কে দেখে চমকে উঠলো চট্ করে কি যেন একটা লুকিয়ে ফেললো বই খাতার তলায় ! "কি রে ভূত দেখলি নাকি ! আমি এসেছি জানতিস না ? " জানবো না কেন ?এই এক্ষুনি তো তোদের বাড়িই যেতাম !  আয় আয় বোস ,কাশী দা কে চা দিতে বলি ? 
"বল ,কিন্তু কি যেন লুকিয়ে ফেললি মনে হল!কি রে প্রেম পত্র টত্র নাকি ? ফেঁসেছিস কোথাও ?"
"ধূর কি যে বলিস!লুকাবো আবার কি?"
 "উঁহু বাবা আমার চোখ কে ফাঁকি দিবি !"এক ঝটকায় খাতাটা টেনে ফেললো সৌরভ দা|
এটা কি!চিঠিই তো মনে হচ্ছে !
"রাখ রাখ ,ভালো হবে না বলছি সৌরভ !"
 আর এ এতো প্রেম পত্রই!চমকে উঠলো সৌরভ দা ,অবিশ্বাস্য !!তুই রাখী কে !!!
মাথা নিচু করলো সৈকত দা |"হ্যাঁ আমি রাখী কে -সেই কবে থেকে -তোকে বলতে পারিনি তুই আমাকে ওর যোগ্য ভাবিস কি না ! তবে ঝুলন টা বুদ্ধিমতী |ধরে ফেলেছে আমায় -আর সেই থেকে আমাকে ব্ল্যাকমেল করে রোজ ফুচকা -আলুকাবলী সাঁটাচ্ছে !  ঐ ভাঙচি চিঠিগুলোর জন্য খুব অপরাধ বোধ হচ্ছে রে |তাই ক্ষমা চেয়ে রাখী কে একটা চিঠি দেবো ভাবছিলাম ! "
সৌরভ দা কি করবে ভেবে পেলোনা খানিকক্ষণ |ঘোর টা কাটলে ছলছল চোখে জড়িয়ে ধরলো সৈকত দা কে ! 

                        এ বাড়িতে এখন খুশীর বন্যা ! আগামী ফাল্গুনেই শুভ কাজ সম্পন্ন হবে !  সৈকত দার বাবা বলেছেন," যাক্ এই লক্ষ্মীমন্ত মেয়ের পাল্লায় পড়ে আমার বাউন্ডুলে টা যদি একটু মানুষ হয় ! "
আমি আর ঝুলন খুব রাখী দিকে খুব জ্বালাতন করছি্রা‌খী দি লজ্জায় মরে যাচ্ছে ! এই ঘটনা টা বোধহয় ও স্বপ্নেও ভাবেনি ! 

জ্যেঠু আর জ্যেঠিমাকে বলতে শুনলাম ,"এতো সৌভাগ্যও লেখা ছিলো -মেয়েটার কপালে !" 
         


কথোপকথন কল্পনায় / বৈশাখী দাস




বলেছিলে --“বিন্যস্ত হও,স্বপ্ন মাখো পশম ওমের,মিশে যাও দ্রাব্যতায় ! ”
বলেছিলাম ---
“গুঁড়িয়ে গেছি, ছড়িয়ে আছি কণাতে!
কুড়িয়ে কুড়িয়ে করো জড়ো, অন্তর ঘিরে গড়ো প্রতিমার দেহ 
মমতায়....”
বলেছিলে --- “ স্নায়ুর অনুভবে রাখো শিহরণের সংজ্ঞা,
দাও প্রতি অনুভব!”
বলেছিলাম --- “ অপেক্ষা দাও।ক্ষত ভরিয়ে,
সময়ের শক্ত খোলস গড়ে,রাখি বয়সের পাশাপাশি ”
বলেছিলে --- “ অপেক্ষা বড়ো আপেক্ষিক এক ঘড়ি!
যদি লাগে শৈথিল্যের শাপ! তার চাইতে,,,,
নামি ঝোড়ো ইচ্ছের বেগে,খুনী আগুন-প্রেমে....”
বলেছিলাম ---  “হারিয়ে যাব  চূর্ণতার উড়ানে,
বরং তন্দ্রা নামুক পশম আলিঙ্গনে।
স্পষ্টতা থাক অবচেতন জুড়ে আর চেতনে একটু আড়াল!
ঠিক একদিন সবুজ হবে জমি,প্রেমের আবদারে !”

তারপর নেমে এসেছিল একক একক গাঢ় রাত্রিরা!
‘ প্রয়োজন' তোমাকে টেনে নিয়ে গেছিল অন্য গোপনীয়তার চাদরে!
প্রেমিকা নয়, আয়নায় তখন অবশিষ্ট শুধুই শরীর ।
বৃত্তচাপ সর্বস্ব,স্বাতন্ত্র্যহীনা!!


কবিতা / মেঘ দূত / সম্পা পাল



মেঘ আজ দূত হয়ে আসুক
আমি তোমার খবর নিতে চাই ।

একা ঘরে বন্ধ জীবন বড়ো একা ।
নতুন করে লেখা হোক মেঘদূতম ।

মেঘে মেঘে অণূরনন।
যক্ষের বিরহ বেদনা উঠে আসে শূন্য পাতায় ।

মাঝখানে সময়ের ঋতু অনেকগুলো ।
ঋতুতে ঋতুতে মেঘেদের বদলে যাওয়া ।

দৈনিক পৃথিবীতে কতো মৃত্যুর খবর ।
তারই মাঝে জীবেদের দৈনিক বংশ বিস্তার ।

যক্ষের বিরহ তবু বন্ধ ঘরের জানালায় ।
কারাগার সেখানে প্রহরী ।
আর নিঃসঙ্গ দেওয়াল একমাত্র বন্ধু ।

কতদিন তোমার খবর পাইনি
ডুয়ার্সের একখণ্ড মেঘ পাঠিয়েছি ।
তুমি ভালো খবর দিয়ো ।



কবিতা / উদাসী হাওয়ার ঝড় / সোমা দে



আমার সীমান্ত তোমার ভালবাসার জন্য খোলা –
তুমি উদাসী হাওয়া পাঠিয়ে দেবে বলেছিলে ,
আমি বলেছিলাম ঝড়-ই আমার পছন্দ –
আকাশ কালো করে মেঘের ঘনঘটা ;
তখন আমি এলো চুলে দাঁড়িয়ে থাকব ছাদে ,
উদাসী হাওয়া মাখব আমি সারা শরীরে |
এক ফোঁটা জল , আর এক ফোঁটা ,
মাথা থেকে মুখ , মুখ থেকে বুক ,
বুক থেকে পা ভাসিয়ে নিয়ে যায় আমাকে স্নিগ্ধ শীতলে |
চোখ বোঁজা মন নিভতে চায় তোমার শরীরে ,
শরীরের কোষে, কোষে, রন্ধ্রে, রন্ধ্রে
নোনা স্বাদের বার্তা নিয়ে তোমার কবিতা !
কবিতায় প্রাণ উঠল জেগে ;
দেহ হল ছারখার |

কবিতা / মেঘ-বৃষ্টি / সুমনা সাহা



বিষাদের মেঘ ছেয়েছে আকাশে
বৃষ্টি বুঝি আসন্ন—
বাতাসের চোখ ছল ছল ভাসে
প্রতীক্ষা কার জন্য?
ওগো মেয়ে তুমি কার কথা ভাবো,
সে কি পরদেশী সখা?
মেঘের পালক আসবে কি ভেসে
গায়ের গন্ধ মাখা!
সখার দেশে কি মেঘ করে আছে?
বাতাস স্তব্ধ ভারী
সখার হৃদয়ে শেল কি বিঁধেছে
সখীর সঙ্গে আড়ি!
এই আড়ি-ভাব ক্ষণিক প্রলাপ
নিমেষে ফুরিয়ে এল,
এপাড় ওপাড় আকাশ জুড়ে
ঘনঘটা ছেয়ে গেল।
বেলা শেষের আলো মুছে
কালো মেঘের মায়া
আকাশ-মাটির মিলন যাচে
দূতী ঝোড়ো হাওয়া।
ঘন মেঘের মান ভাঙিয়ে
ঝরায় বরিষণ
দহন-হৃদয় মেলে ধরে
চাতক-অভিমান।
এখন শুধু অঝোর বৃষ্টি
দুই কূল জলময়
মেঘে আর জলে একাকার
শুধু ভালবাসাবাসি রয়।

Tuesday, July 24, 2018

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

 সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় - / গৌতম সেন





আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে... কবির গানের রেশ নিয়ে কানে চিলেকোঠা তার এবারের ই-ম্যাগ প্রকাশে আবার উদ্যোগী হয়েছে। বর্ষা এসেছে পুরোদস্তুর ভাবে, তার পূর্ণ সম্ভার নিয়ে। মন-প্রাণ স্বভাবতই এখন তৃপ্ত।
গত ৮ই জুলাই, রবিবার আয়োজন করা হয়েছিল প্রতি বছরের মত আমাদের সদস্য-সদস্যাদের সফল ও কৃতি ছেলেমেয়েদের (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা - ২০১৮) সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের। তাদের কে উৎসাহ দান করতে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হল উপহার। সকলের উপস্থিতি এই মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে তুলেছিল।
এবারে থিম অনুযায়ী যে কটি লেখা এসে পৌঁছেছে, তাদের নিয়েই সেজে উঠেছে এবারের ই-ম্যাগ। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে, অন্যান্য বারের তুলনায় এবার নিজ নিজ সৃষ্টিকর্ম নিয়ে এগিয়ে আসার হার যেন কিছুটা হলেও কম। আশা রাখি, আগামী মাসে এই অবস্থাটা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব, আরো বেশি মাত্রায় সদস্য সদস্যারা  এগিয়ে আসবেন, আমাদের নিজস্ব এই ই-ম্যাগকে সম্বৃদ্ধ করে তুলতে।
চিলেকোঠা ই-ম্যাগ তার যা কিছু উৎকর্ষ তা উৎসর্গ করে সমস্ত সদস্য-সদস্যাদের কে। তাঁদের ঐকান্তিক সহযোগিতা ছাড়া এ প্রচেষ্টাকে কেবল এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নয়, তার অস্তিত্বকে টিঁকিয়ে রাখা সম্ভব নয় কোনমতেই। তাই আবারও সকল লেখক ও কবি বন্ধুকে আন্তরিক কৃ্তজ্ঞতা জানাচ্ছে চিলেকোঠা। আরো বেশি সংখ্যায় লেখা পাঠান, আরো বেশি সংখ্যায় সকলে এই ই-ম্যাগ পড়ুন – এ আমাদের একান্ত অনুরোধ।
অবশেষে জানাই বরষার মধুর এ সিক্ত পরিবেশ উপভোগ করুন। সুস্থ থাকুন, সাবধানে থাকুন। সঙ্গে থাকুন – চিলেকোঠার প্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে চলুন।






ধারাবাহিক / স্বপ্নস্বরূপ – ২০ ন ন্দি নী সে ন গু প্ত




‘যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে
             রইব কত আর’... 
অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে এই পৃথিবীর বুকের উপর থেকে প্রতিমুহূর্তে। লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে কোনও না কোনও প্রাণী, উদ্ভিদ, কিংবা কোনও ভাষা, জনগোষ্ঠী। কখনো আবার মানুষেরই হঠকারিতায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সভ্যতা, শিল্প এবং প্রকৃতি। কালের নিয়মে একদিন এই পৃথিবীও ধ্বংস হয়ে যাবে। হয়তো বা মহাপ্রলয়ে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবার অনেক আগেই পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাবে বাংলা ভাষা। তখন আর রবীন্দ্রনাথের ভাষা ধার করে আসন্ন অনাগত দিনের জন্য আশঙ্কা প্রকাশ করে এইকথাটুকুও বলতে পারব না...        
‘আর   পারি নে রাত জাগতে হে নাথ,
             ভাবতে অনিবার।...’

এখন যে মুহূর্তকে ঘিরে বসে রয়েছি, কিছুক্ষণের মধ্যে তা হারিয়ে গিয়ে অতীত হয়ে যাবে। এটাই কালের নিয়ম। হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, সময়ের এগিয়ে চলার অন্যতম স্বাক্ষর। তবুও আমরা হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরে পেতে চাই। কিন্তু সত্যিই কি সব হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরে পেতে চাই? না, শুধুমাত্র প্রিয় জিনিস ফেরত পেতে চাই। অপ্রিয় জিনিস, অপ্রিয় মুহূর্ত যাকে পেছনে ফেলে এসেছি, তাকে আর ফিরে পেতে চাইনা। প্রিয়জন, যিনি হারিয়ে গিয়েছেন জীবন থেকে, ফিরে পেতে চাই তার সান্নিধ্য। রবীন্দ্রনাথের অজস্র গানে কবিতায় দেখতে পাই এই ধরনের ভাবের নিয়ত যাতায়াতস্মৃতিমেদুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে কবি বলে ওঠেন,  ‘আমার হারিয়ে-যাওয়া দিন / আর কি খুঁজে পাব তারে/ বাদল-দিনের  আকাশ-পারে/ ছায়ায় হল লীন...’
আবার কখনো কবির ভাষা হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের মনের কথা; যে কেউ হঠাৎ করে গেয়ে ওঠেন, ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না’...  
এগিয়ে চলা সময়ের নদীর সাথে একই ছন্দে বয়ে যাওয়া, স্বাভাবিক বিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা   কি তবে মানুষ সাধারণভাবে অপছন্দ করে? নাকি একটা বড় অংশের মানুষ অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়? একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে বয়সে অপেক্ষাকৃত প্রবীণ মানুষজন সবসময় বেশি বিলাপ করেন হারিয়ে যাওয়া জিনিসের জন্য। অর্থাৎ যার জীবনে স্মৃতির ভার যত বেশি, তিনি তত বেশি আচ্ছন্ন হতে থাকেন হারিয়ে যাওয়া জিনিসের প্রতি আকর্ষণে। সেইজন্যই প্রবীণতা জরাজীর্ণ অথচ নবীনতা চিরসবুজ। আশিবছরের জীবনে স্মৃতির ভালোমন্দ অজস্র বিচিত্র ভার নিয়েও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক সবুজ গাছের মত চিরনবীন। সময়ের থেকে অনেকখানি এগিয়ে থাকা মানুষটি হারিয়ে যাওয়া কোনও জিনিসের জন্য পা ছড়িয়ে বিলাপ করবার পক্ষপাতী ছিলেন না। আধুনিকতার পক্ষে সওয়াল করে গিয়েছেন আজীবন। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে সাহিত্যে আধুনিকতার ধারাকে দুহাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, বলেছেন... ‘আজ পর্যন্ত আমাদের সাহিত্যে যদি কবিকঙ্কণ চণ্ডী, ধর্মমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, মনসার ভাসানের পুনরাবৃত্তি নিয়ত চলতে থাকত তা হলে কী হত? পনেরো আনা লোক সাহিত্য পড়া ছেড়েই দিত। বাংলার সকল গল্পই যদি বাসবদত্তা কাদম্বরীর ছাঁচে ঢালা হত তা হলে জাতে ঠেলার ভয় দেখিয়ে সে গল্প পড়াতে হত। কবিকঙ্কণ চণ্ডী, কাদম্বরীর আমি নিন্দা করছিনে। সাহিত্যের শোভাযাত্রার মধ্যে চিরকালই তাদের একটা স্থান আছে কিন্তু যাত্রাপথের সমস্তটা জুড়ে তারাই যদি আড্ডা করে বসে, তা হলে সে  পথটাই মাটি, আর তাদের আসরে কেবল তাকিয়া পড়ে থাকবে, মানুষ থাকবে না।’... এই যে মানুষের কথা ভাবা এবং ভেবে অনড় জগদ্দল পুরানো অবস্থান থেকে সরে আসা, এর থেকে বড় আধুনিকতা আর কিছু হতে পারেনা।
   হারিয়ে যাওয়ার চিন্তা কবির ভাবনায় নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। পেয়েছে এক অদ্ভুত মহিমা। কোনও জাগতিক বস্তু, প্রিয়মানুষ কিংবা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির জন্য বিলাসিতা নয়। নিজেকে হারিয়ে ফেলে আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়ার খেলা। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’... সুরে সুরে যেন এক মন্ত্রের মত দোলা লাগে। হারিয়ে ফেলা দিনের স্মৃতি কিংবা অতীত আগলে রাখার ইচ্ছে সচেতনভাবেই কি কবি বর্জন করেছিলেন, নাকি তা ছিল একেবারেই স্বভাবসিদ্ধ? কখনো তিনি ঘোষণা করেন,... ‘বিধাতা আমাকে মস্ত একটি বর দিয়েছেন, সে হচ্ছে আমার অসামান্য বিস্মরণশক্তি। সংবাদের ভাণ্ডারঘরের জিম্মে তিনি আমার হাতে দেন নি। প্রহরীর কাজ আমার নয়; আমাকে আমার মনিব প্রহরে প্রহরে ভুলে যাবার অধিকার দিয়েছেন।... আমার মনটাকে বিধাতা নাট্যশালা করতে ইচ্ছা করেছেন, তাকে তিনি জাদুঘর বানাতে চান না।’ এক অদ্ভুত বিশ্বাস কাজ করে হয়তো বা, যখন কবি বলে ওঠেন, ‘হারিয়ে যেতে হবে আমায়, ফিরিয়ে পাব তবে।’ এই জায়গায় এসে মনে হয়, তাহলে কি জগতে কিচ্ছুটি হারায় না কোনওদিন?
হ্যাঁ, জগতের পরম নিত্যতার বৈজ্ঞানিক সূত্র কবির ভাষায় প্রকাশ পায়... ‘ফুরায় যা, তা ফুরায় শুধু চোখে/ অন্ধকারের পেরিয়ে দুয়ার যায় চলে আলোকে...’ । আলোকের আধার যিনি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পরম আলোকময়ের কাছে বেজে ওঠে কবির প্রার্থনা...  ‘তোমাতে রয়েছে কত শশী ভানু,   হারায় না কভু অণু পরমাণু,/ আমারই ক্ষুদ্র হারাধনগুলি রবে না কি তব পায়...’।        
    

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া