Saturday, November 25, 2017

গোয়েন্দা গল্প /মুক্তো কোথায় ? / দূর্বা মিত্র



গোয়েন্দা অফিসার সৌমাভ সান্যাল অবাক হয়ে তাকায় অধস্তন অফিসার এর দিকে -" কি বললে ? স্যার আমাকে যেতে বলেছেন ? মুক্তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে ?"
-"হ্যাঁ স্যার | ওনার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু , তাছাড়া মুক্তোটাও খুব দামী | লকার থেকে এনেছিলেন নতুন বেয়াই কে দেখাবেন বলে | দুপুরে খেয়ে সবাই শুয়েছিলেন , বিকেলে আলমারি খুলে দেখেন বাক্স খালি - মুক্তো গায়েব | বাড়ির গেট  তালা লাগিয়ে উনি স্যার কে ফোন করেন | বিশেষ অনুরোধ করেন কোনো জানাজানি নাকরে মুক্তোটা খুঁজে দিতে - আজ রাতের মধ্যেই চাই | আর স্যার - বড়ো স্যার বলে দিয়েছেন - ইউনিফর্ম বা অফিস জীপ্ নিয়ে না যেতে |"
সৌমাভ ঘাড় নেড়ে কাগজ টা হাতে নেয় - A4 কাগজে নাম ঠিকানা ফোন নম্বর - মুক্তোটার বিবরণ সহ  একটা ফটো | দাম ১০ লক্ষ হবে |
পেছনের ঘরে গিয়ে জিন্সসাদা  টি-শার্ট , পায়ে কালো স্নিকার্স পরে নিয়ে একটা ওলা ক্যাব ডেকে নেয় - ঠিকানা দিয়ে ওই কাগজটা আরেকবার পড়তে থাকে | মালিক ভদ্রলোক গেট বন্ধ করে দিয়েছেন | কেউ ঢোকেনি বা বেরোয়নি | তার মানে বাড়িতেই আছে মুক্তোটা | অত ছোট একটা জিনিস যে কোনো জায়গায়লুকিয়ে রাখা যেতে পারে | আজ রাতের মধ্যে উদ্ধার করা ? কি করে সেটা সম্ভব হবে ?

বাড়িটা তিনতলা - সামনে পেছনে বাগান - বড়ো লোহার গেট | ক্যাব থেকে নামতে নামতে কাগজে লেখা মোবাইল নম্বর  ফোন করে নিজের পরিচয় দেয় | মালিক নিজে এসে গেট এর তালা খুলে ওকে একতলার  একটা বসার ঘরে নিয়ে যান |
সুরুচি পূর্ণ ঘর | এসি চলছে | সৌমাভ সেই দিনের ডিটেলস জানতে চায় | মালিক বলেন সকালে লকার থেকে এনেছেনবেয়াই বাড়ির সবাইকে দেখিয়ে আলমারিতে রেখেছেন - চাবি ওনার পকেটে থাকে - দুপুরে খাওয়ার পর ঘন্টা খানেক শুয়েছেন | বিকেল চারটে নাগাদ আলমারি খুলেছেন লকার  ফেরত রেখে আসারজন্যে - বাক্স খালি | এখনো কাউকে কিছু বলেন নি | বড়ো ছেলের বিয়ে হয়েছে - সেই বেয়াই বাড়ির লোকজন এসেছেন - কাল সকালের ফ্লাইটে দিল্লি ফিরে যাবেন |

ছোট ছেলে কলেজ পাস্  করেনি - গানের ব্যান্ড তার স্বপ্ন | উনি আর গিন্নি তিনতলায় একদিকে থাকেন - অন্যদিকে ছোট ছেলে | দোতলায় বড়ো ছেলে একদিকে - অন্যদিকে অফিস | একতলায় ঠাকুর - চাকর - ড্রাইভার - মালি - দারোয়ান থাকে | অন্যদিকে রান্নাঘর - খাবার ঘর - বসার ঘর - গেস্ট রুম |

চুরি ধরার পরে কেউ এখনো বাইরে যায়নি বা আসেনি - কিন্তু কাল সকালে তো গেট বন্ধ রাখা যাবে না | চুরির কথাও প্রকাশ পাবে | পুলিশ  যাওয়া মুশকিল - বড়ো ছেলে আর তার শ্বশুরবাড়ি কি ভাববে ? ডিসি ডিডি  ওনার স্কুলের বন্ধু | এখন সৌমাভ ভরসা |

সৌমাভ বলে উনি যেন সবাইকে বলেন যে সৌমাভ একটা উপন্যাস লিখছে - কিছু চরিত্র চিত্রণের জন্যে সবার ঘরে গিয়ে আলাদা কথা বলতে চায় | উনি ইন্টারকম  সবাইকে খবর দেন |
সৌমাভ সাইড ব্যাগ থেকে আই-প্যাড বার করে একতলায় নেমে আসে |

যাবতীয় কাজের লোকেদের ফটো আর ডিটেলস নেয় - পোর্টিকোর চেয়ার  বসে কফি খেতে খেতে কো-রিলেট করে কিছু সন্দেহ জনক দেখতে পায়না | সবকটা প্রোফাইল পিক খুঁটিয়ে দেখে - কোনো মুখেই কিছু লুকিয়ে রাখার চাতুরী খালি চোখে ধরা পড়েনা | লাই ডিটেক্টর পেলে ভালো হতো !
আই-প্যাড হাতে নিয়ে দোতলায় আসে | অফিস পোরশন তালাবন্ধ শুক্রবার থেকে - এখন শনিবার   বিকেল - সে চাবিও মালিকের পকেট  | সৌমাভ ডানদিকে ঘোরে বড়ছেলের সুইটের দিকে |

বড়ো ছেলে একটু অবাক চোখে তাকায় - বাবার কোনো উপন্যাস লেখা বন্ধুর ছেলে মনে করতে পারে না বোধয় | সে নিজে চার্টার্ড একাউন্টেন্ট - বাবার ব্যবসার অংশীদার - মাস তিনেক হলো বিয়ে হয়েছে | শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আসাতে মুক্তোটা দুপুরে দেখেছে | ঘুম থেকে উঠে ক্যালকাটা ক্লাব  যাবে ভেবেছিলোসবাইকে নিয়ে - বাবা বারণ করেছেন | ওনার স্ত্রী বা শ্বশুরবাড়ির লোকেরা  নিজেদের পরিচয় দিলেন - কে কি করেন তাও বললেন | ফটো বা ডিটেলস  কোনো ফাঁক নেই | গুগল সার্চ করে সব কোম্পানি ডিটেলস  চেক করলো সৌমাভ - no red flag anywhere ! 

তিনতলায় উঠে বাঁদিকে ঘুরে ছোট ছেলের সুইটে বেল দেয় সৌমাভ | কেউ দরজা খোলেনা | আরেকবার বেল দেয় | no response ! উল্টোদিকের দরজা খুলে গিন্নিমা বেরিয়ে আসেন - মোবাইল থেকে ছোট ছেলেকে ফোন করেন | একটু পরে দরজা খুলে দাঁড়ায় ছোট ছেলে - রোগা,লম্বা,কোমর পর্যন্ত লম্বা চুলে রঙিনফিতে | মুখটা অসম্ভব শুকনো - এক হাতে পেট চেপে ধরে আছে | গিন্নিমা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন - " ছোটু কি হয়েছে তোর ? ডাক্তার কাকাকে খবর দেব রে ?"

সৌমাভ গিন্নিমার কাঁধে আস্তে একটা টোকা দেয় -"জেঠিমা আমি ফার্স্ট এইড জানি - একটু দেখি প্লিজ ? তারপর না হয় ডাক্তার কাকাকে খবর দেবেন |"

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে সৌমাভ - একহাতে ছেলেটির কনুই এর নার্ভ চেপে ধরে ভেতরে ঢোকায় - আর অন্য  হাতে দরজার লাচ  আর ছিটকিনি লাগায় | ছেলেটি ঘুরে দাঁড়িয়ে সৌমাভর কলার ধরতে চায় পেট থেকে হাত সরিয়ে - সৌমাভ ওর কানের পেছনে রদ্দা লাগায় - কনুইয়ের চাপ  বাড়িয়ে দেয় |
ছেলেটা বসে পড়ে সামনের চেয়ার এর ওপর |

সৌমাভ ওর দুই কাঁধে হাত রেখে বলে -" এর পরের  মিনিটে  মাস হাসপাতাল  থাকার ব্যবস্থা করে দেব | চুপচাপ কথার উত্তর দাও | দুপুরে খাবার পর ঘরে ঢুকে কি কি খেয়েছিলে ? আমি ঘরে যা গন্ধ পাচ্ছি - মারিজুয়ানাহুইস্কি আর চরস এর মিশ্রণ | কেস টা কি ?"
-"    আপনি কে ?"
- " আমার প্রশ্নের উত্তর তুমি দেবে - উল্টোটা নয় | বলো কি খেয়েছিলে ?" - বলতে বলতেই কাঁধের ভেতরের নার্ভ  চাপ বাড়ায় নিজের দুই বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে |
-"  লাগছে - বলছি বলছি | লাঞ্চের পরে শরীর খারাপ লাগছিলো - তাই সবগুলোই একটু একটু খাচ্ছিলাম - যাতে পেট ব্যথা কমে যায় |"
-" কমেছে ?"
-"না মানে হ্যাঁ - মানে একটু -"
বাঁ  হাতে কাঁধ ধরে তুলে ডান হাতে ওর পেটে ফুল ফ্রন্টাল ঘুঁষি চালায় সৌমাভ  | ছেলেটা দুহাতে পেট চেপে বমি করে ফেলে |
-" খাবার পরে আর মদ খাবার আগে কি করেছিলে ?"
-"   কই কিছু না তো ?"
এবারের ঘুষিটা পড়ে ডানদিকের চোয়ালে - অরণ্যদেব হলে নির্ঘাত ছাপ পড়তো  - এতটাই জোরে |
চেয়ার থেকে গড়িয়ে পড়ে ছেলেটা - চিবুকে রক্ত | সৌমাভ একটা পা তুলে দেয় ছেলেটার পেটে - চিৎকার করে ওঠে সে - " পেটে না -প্লিজ পেটে না - অন্য যেখানে খুশি মারুন |"
সৌমাভ ঝুঁকে পড়ে ওর মুখের ওপর -" কেন পেটে নয় কেন ?" বলতে বলতে পেটের ওপর পায়ের চাপ বাড়ায় একটু |
-"ভেঙে যাবে - ভেঙে যাবে " - বলতে বলতে কান্না আর বমি শুরু করে দেয় |
দু হাতে তুলে চেয়ার  বসায় সৌমাভ - টেবিল থেকে জলের বোতল এনে মুখে চোখে ছেটায় | নরম গলায় জিগেস করে -" চাবি তো বাবার পকেটে ছিল - আলমারি খুললে কি করে ?"
-" ঘু ঘু ঘুমের সময়ে বাবা বালিশের নিচে চাবি রাখে | মা তখন   ওপরে আসেনি - দরজা খুলে দেখলাম বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে -   তখন ভিতরে ঢুকে ----"
-"মুক্তোটা গিলতে গেলে কেন ?"
-"একটা সিনেমায় দেখেছিলাম |"
-" নেশার জিনিস গুলো খেলে কেন?"
-"পেট ব্যথা করছিলো যে !"
-"এতো টাকার তোমার দরকার পড়লো কেন ?"
-"বাবা আর টাকা দেবে না বলছিলো - বাজারে অনেক ধার | বিশ্বাস করুন - ব্যান্ড টা দাঁড়িয়ে গেলেই আমি টাকা শোধ করে দিতাম - আমি তো আর বস্তির ছেলে নই !"
-"তোমাকে বিক্রি করলেও দশ লক্ষ টাকা তুমি শোধ করতে পারতে না - আর মুক্তোটা চোরা বাজারে বিক্রি করলে অতো দাম  তুমি পেতে না | এই পরিবারের ছেলে হয়ে তুমি  কি করলে ?"

বলতে বলতে ছেলেটার বেল্ট খুলে চেয়ারের পেছনে হাত দুটো বাঁধে সৌমাভ | মোবাইল  গৃহকর্তাকে বলে ডাক্তারকে খবর দিতে - সঙ্গে স্টমাক ওয়াশ আর পারগাটিভ ইনজেকশন যেন আনা হয় |
দরজায় বেল বাজতে সৌমাভ খুলে দেয় - কর্তা  গিন্নি ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে |
-" বসুন আপনারা | ডাক্তার এলেই আপনার মুক্তো পাওয়া যাবে |"
-"সে কি ? কোথা থেকে ?"
-"ওর পেট থেকে |"- বলে ছোট ছেলের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখায় সৌমাভ |






কবিতা / ফেরিওয়ালা / দেবাশীষ সেন



চলো যাই সমুদ্র স্নানে -
নোনা জলে, নোনতা দুঃখ ধোবো
তারপর ভেজা বালুচরে
সুখ খুঁজে খুঁজে ঝিনুক কুড়োবো।

তুমি বুঝি পাহাড় ভালোবাসো!
রডডেনড্রেনের গুচ্ছ ছোঁবে?
উচ্ছ্বল কোন ঝর্ণার পাশে  
প্রজাপতি খুঁজে বেড়াবে।

চলো যাই মরুভূমির প্রান্তরে
ধূধূ বালিয়াড়ি পেরিয়ে মরুদ্যানে
একফালি সবুজ জীবন
মুঠো ভরে মরীচিকা লুটি দুজনে।

তুমি জঙ্গলে যেতে চাও?
রাতে বনবাংলোর কাঠের বারান্দায় আরামকেদারায় বসে,
ধূমায়িত কফি হাতে দুজনে -
জোনাকির আলোয় দেখবো আকাশ থেকে তারা পড়ছে খসে।

কত স্বপ্ন এমনি আঁকা আনমনে
জ্যোৎস্না ঢলানো চাঁদনি রাতে,
মেঠো আলপথ ধরে হাঁটছি দুজনে
দিকশুন্যপুরের দিকে, হাত রেখে হাতে।





বেয়াক্কেলে অন্যমনস্কতা / অর্পিতা ভট্টাচার্য



আমরা অনেকেই হয়তো অন্যমনস্ক হয়ে অনেক ভুল করে ফেলি। আমরা যখন একটা কাজ করতে করতে অন্য কথা ভাবি , তখন আমরা অনেক সময়, এমন অনেক কাজ করে ফেলি, যেটা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। সেটা কখনো বা মজার কখনো বা লজ্জার। আমি যখন রাস্তায় কোনো কাজে থাকি , এতোটাই অন্যমনস্ক থাকি যে , অনেক সময় অনেক চেনা মানুষ কে দেখেও হয়তো খেয়ালই করিনা। এর জন্য অনেকে আমায় অহংকারী, অভদ্র ভাবতেই পারে । এটা তাদের দোষ নয় , দোষ টা আমার। কখনও বা সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ কে কারো সাথে গুলিয়ে অকারণ আন্তরিক ভাবে কথা বলতে শুরু করি। সেই মানুষটির অবস্থা ভাবো তো কেমন হয়। এসব অদ্ভুত ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এ হেন আমি একদিন এমন এক কান্ড ঘটিয়েছিলাম যেটা কেউ করতে পারবে না , এটা আমি নিশ্চিত। প্রায়ই অদ্ভুত ঘটনা ঘটাই , তাবলে এতোটা ? এতদিন পরে আজও মনে পরলে যেমন হাসি পায়, তেমন লজ্জা করে। একদিন সারাদিনের কাজকর্ম সেরে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরছিলাম বাসে করে, খুব ঘুম পাচ্ছিল, ভীষন ক্ষিদেও পেয়েছিল। বাস টার্মিনাল থেকে উঠেছিলাম বলে ফাঁকা বাসে পছন্দ মতো জানলার পাশের সিটে বসে , একটু পরে ঘুমিয়ে পড়লাম। এর মধ্যে বাসে বেশ ভিড় হয়ে গেছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি , আমার পাশে বসে একজন বাদাম খাচ্ছে। আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিলাম, আমার পাশের মানুষটি অনেকক্ষণ ধরে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে ফুঁ দিয়ে পরিস্কার করে মুখে যেই দিতে যাবেন, আমি হঠাৎ হাত বাড়িয়ে তার হাত থেকে বাদাম তুলে নিলাম। তিনি এতোটাই অবাক হয়েছিলেন যে মুখ হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। এক মূহুর্তে আমি অনুভব করি কি করেছি । লজ্জায় আমার তখন মরে যাওয়ার মতো অবস্থা। তাড়াতাড়ি বাদামগুলো ফিরিয়ে দিতে যাই। উনি বলে ওঠেন অদ্ভুত ভাবে " না না ঠিক আছে , খান খান " । আর আমি কি করব বুঝতে না পেরে তাড়াতাড়ি বাদামগুলো ভদ্রলোকের হাতে দিয়ে উঠে পরি , আমার স্টপেজের অনেক আগে বাস থেকে নেমে পরি। ভাবতে থাকি সম্পূর্ণ পারিপার্শ্বিক অবস্থা ভুলে এ আমি কি করলাম।মুখ লাল হয়ে গেছে তখন লজ্জায়।আজও ঘটনাটা মনে পরলে যেমন হাসি পায়, তেমনি লজ্জা করে। আর সেই মানুষটিও নিশ্চিত এই ঘটনাটা ভুলতে পারেননি। কারণ এমন অদ্ভুত অন্যমনস্ক মানুষ বোধহয় সে জীবনে কখনো দেখেনি । 

বংশীলাল / নারায়ণ রায়।




সে অনেকদিন আগের কথা। ষাটের দশকের মাঝামাঝি কোন এক বছরে দুর্গাপুজোর শেষ,
আবার কালী পুজো শুরু হতে এখনো কয়েকদিন বাকী। সেই সময়ে একদিন আমি আর আমার
স্কুলের সহপাঠী বন্ধু বাপ্পা, ছুটির এই কটা দিন কি কি দুষ্টমি করে কাটানো
যায়, তাই ভাবছি। এমন সময়ে বাপ্পা বললে, "চল যাই, তুই আর আমি দুজনে আমার
মামার বাড়ি গিরিডিতে ঘুরে আসি ক'দিন।" আমিতো অবাক! বললাম, " বাহ! গিরিডি
যেতে পারলে তো ভীষণ মজা হবে, কিন্তু তা কি করে সম্ভব ? অত দূরে তোর
সঙ্গে আমার বাবা মা আমাকে ছাড়বে কেন? আর তোর বাড়ি থেকে কি তোকে একা
ছাড়বে?" বাপ্পা বললো, সে নাকি গত দু-তিন বছর ধরে একাই গিরিডি যায়। আমি যে
সময়ের কথা বলছি তখন একজন সতেরো কিম্বা আঠারো বছরের ছেলের এখনকার ছেলেদের
মত এতটা স্বাধীনতা ছিল না।


যাই হোক বাপ্পার বাবা বাণেশ্বর কাকু আমার বাবার বিশেষ বন্ধু ছিলেন, তাই
তাঁর পক্ষে আমার বাবাকে রাজী করাতে বিশেষ দেরী হল না। অবশ্য বাপ্পার
মামার বাড়িতে এখন আর তেমন কেউ থাকে না। ওর বড় মামা তার দাদুর অর্থাৎ
বাপ্পার প্রমাতামহ'র তৈরী ওদের তিন পুরুষের ওই গিরিডির বাড়িটা দেখাশোনা
করতেন। সেই মামা মারা গেছেন কয়েক বছর আগে, মামাতো দাদারা সবাই জীবিকার
সন্ধানে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বাপ্পার বড় মামীমা এখনও সেই বাড়ি ঘর
সম্পত্তি সব আগলে রেখেছেন। আমি কখনও কলকাতার বাইরে অতদুরে কোনদিন যাইনি।
আর বাবা-মাকে ছেড়ে একা যাওয়া্র তো কোন প্রশ্নই ওঠে না।


সেই যুগে মোবাইল ফোন দুরের কথা, আমরা যে এলাকায় থাকতাম সেই পাড়ায় ল্যান্ড
লাইন ফোনও আমাদের গোটা পাড়াতে একজনেরও ছিল না। বাপ্পা বলল, "মামীমাকে
চিঠি দিয়ে, তার উত্তর পেতে পেতেই দশ বারোদিন কেটে যাবে, তার চেয়ে চল হটাৎ
গিয়ে মামীমাকে সারপ্রাইজ দেবো।" যথারীতি অক্টোবর মাসের শেষ দিকে এক
রবিবার দুপুর নাগাদ হাওড়া স্টেশনের আট নং প্লাটফর্ম থেকে ছাড়লো আমাদের
ট্রেন। কয়লায় চলা বিশাল কানাডিয়ান স্টিম ইঞ্জিনের এক্সপ্রেস ট্রেন। সেই
সময়ে ট্রেনের তিনটে ক্লাশ ছিল। ফার্স্ট, সেকেন্ড আর থার্ড ক্লাশ। আমরা
অবশ্যই থার্ড ক্লাশের যাত্রী ছিলাম। নামেই এক্সপ্রেস ট্রেন, বসার জন্য
খুবই সাধারণ মানের কাঠের আসন। তবে ট্রেনে তেমন ভিড় না থাকায় আমরা দুজন
জানালার ধারে দুটো মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম। ট্রেনে জানালার ধারে বসার
জায়গা পাওয়ার আনন্দই আলাদা। আবার জানালার ধারে বসার বিড়ম্বনাও ছিল
যথেষ্ট, প্রতি মুহুর্তে কয়লার গুঁড়ো উড়ে এসে চোখে পড়ার ভয়। তবুও সেই বয়সে
জীবনে প্রথম কারও শাসন ছাড়া একা বন্ধুর সঙ্গে দূর ভ্রমণ। তাই এক অব্যক্ত
আনন্দে কয়লার গূড়োর মত তুচ্ছ জিনিসকে উপেক্ষা করে দুজনে গল্প করতে করতে
যাত্রা শুরু করলাম। তবে সঠিক সময়ে ছাড়লেও প্রথম থেকেই ট্রেনটি মাঝে মাঝেই
কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ছিল।


অবশ্য সে কারনে আমার বিদেশ ভ্রমণের আনন্দের কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। বরং আমি এই
মন্থর যাত্রাটাকে বেশ উপভোগই করছিলাম। এই ভাবে ট্রেনটি থামতে থামতে
ব্যান্ডেল, বর্ধমান, দুর্গাপুর পার হয়ে আসানসোল পৌঁছুতেই বেলা পাঁচটা,
মানে বেশ সন্ধ্যে হয়ে গেল। আমার তো ভারি মজা। বাড়ি থেকে বেরনোর সময়ে বাবা
আমাকে কুড়িটা টাকা দিয়েছিল, আর মা আমাদের দুজনের মত লুচি হালুয়া আর
নারকোলের নাড়ু বেঁধে দিয়েছিল সঙ্গে। আমি আর বাপ্পা সেগুলির সদব্যবহার
করতে শুরু করলাম। তবে আসানসোলের পরে গাড়ি আর যেন এগোতেই চায় না। একটা
ছোট্ট অজানা স্টেশনে ট্রেনটা সেই যে দাঁড়ালো আর নড়াচড়ার যেন কোন লক্ষণই
নেই। স্টেশনটিতে কোন উঁচু প্লাটফর্ম নেই। প্রত্যেকটা কামরার নীচে কাঠের
সিঁড়ি দিয়ে মানুষ জন উঠছে, নামছে।


এইসব স্টীম ইঞ্জিনের গাড়ি এক জায়গায় বেশিক্ষন দাঁড়ালে আস্তে আস্তে বগির
ডাইনামোর চার্জ যত কমতে থাকে গাড়ির আলোর তেজও ততই কমতে থাকে। একটা নির্জন
স্টেশনে আধো-অন্ধকারে এই ভাবে বেশ কিছুক্ষন থাকার পর আমার কেমন যেন ভয় ভয়
করতে লাগল। এইসব ছোট খাটো স্টেশনে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। প্লাটফর্মে মাত্র
সাত-আট ফুট উঁচু কয়েকটা লোহার খুঁটির উপর কাঁচের বাক্স মত করা আর তার ভিতরে
কেরসিনের আলোয় চারিদিকে আবছা, যেটুকু যা দেখা যায়। বেলা পাঁচটা নাগাদ
যেখানে ট্রেনটার মধুপুরে পৌছোনর কথা সেখানে বেলা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এই
ছোট্ট স্টেশনে দাঁড়িয়েই আছে।


এমন সময়ে লক্ষ্য করলাম আমাদের কামরা থেকে একজন বেশ লম্বা চওড়া ব্যক্তি
প্লাটফর্মে নেমে একটি আলোর নীচে দাঁড়ালো। বাপ্পা লোকটিকে দেখেই এক গাল
হেসে "আরে ও বংশীদা, বংশীদা ......" বলে চিৎকার করতে লাগলো। লোকটা যেন
সেকথা শুনতেই পেল না। এক বারের জন্যও আমাদের দিকে না তাকিয়ে জয় সিয়ারাম
জয় সিয়ারাম বলতে বলতে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের বাইরে কোথায় যেন
অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। লোকটার পরনে খাটো ধুতির উপরে অদ্ভুত একটা ঢল্লা মত
জামা। আর মাথায় পশ্চিমের লোকেদের মত কান ঢাকা পাগড়ি থাকার জন্য লোকটার
মুখটা ভাল করে দেখতেই পেলাম না।


বাপ্পা তাড়াতাড়ি ট্রেন থেকে নেমে লোকটার দিকে দৌড়তে যাবে এমন সময় এতক্ষন
ধরে অচল পাহাড় হয়ে স্থবির থাকা আমাদের ট্রেনটি একটি লম্বা টানা হুইসেল
দিয়ে নড়ে উঠল। ট্রেন চলতে শুরু করতেই আমি বাপ্পার হাত ধরে টেনে কামরার
ভিতরে ঢুকিয়ে নিলাম। আমাদের আসনে বসেই আমি বাপ্পাকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুই
চিনিস ওকে...?" উত্তরে বাপ্পা বলল,"আরে, ও তো বংশীলাল।" তবে একটা বিষয়ে
দুজনে খুবই অবাক হলাম সেটা হচ্ছে লোকটি এতক্ষন আমাদের কামরাতেই ছিল।
কামরাতে তেমন কিছু ভিড়ও নেই অথচ ও আমাদের কারও নজরে পড়ল না কেন? আমি
জিজ্ঞেস করি, "বংশীলাল আবার কে?" বাপ্পা খুব ছোট্ট বয়সে ওর দাদুর কাছে
শুনেছে, দাদুর বাবা অর্থাৎ বাপ্পার প্রমাতামহ নিবারণচন্দ্র সরকার ছিলেন
বিশেষ ধার্মিক লোক। ভারতের এমন কোন তীর্থস্থান নেই যেখানে নিবারণচন্দ্র
যাননি। আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই নিবারণবাবুই একবার কুম্ভমেলায়
পিতা মাতা বিচ্ছিন্ন এই বংশীলালকে কুড়িয়ে পান। তখন তার বয়স মাত্র আট-দশ
বছর। তারপর তাকে এই গিরিডিতে নিয়ে এসে নিজ-সন্তান তুল্য মানুষ করেন। পরে
বংশীলালের বিবাহ দিয়ে নিজের বাড়ির কাছাকাছি কিছুটা জমির উপর একটা ছোট্ট
ঘর করে দেন এবং বংশীলালও গিরিডিতে বাপ্পার মামার বাড়ির পরিবারের তিন
পুরুষ ধরে দেখভাল করতে করতে কখন যেন তাদের সংসারেরই একজন হয়ে ওঠে।


হাওড়া থেকে ট্রেনটি ছাড়ার পর থেকেই অনেক ভুগিয়ে অবশেষে আমাদের এক্সপ্রেস
ট্রেন এতক্ষনে এক্সপ্রেসের মতই দৌড়তে আরম্ভ করল এবং নির্ধারিত সময়ের
প্রায় দুঘন্টা পরে সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ মধুপুরে পৌঁছালো। ট্রেন থেকে নেমে
বেশ শীত শীত করতে লাগল। কলকাতায় এখন বেশ গরম কিন্তু বিহারের (এখন
ঝাড়খন্ড) এইসব জায়গায় এই অক্টোবরের শেষে আবহাওয়া বড়ই মনোরম। মধুপুর
স্টেশনে বিদ্যুৎ আছে তবে অতি সাধারণ কয়েকটা বাল্ব প্লাটফর্মে টিম টিম করে
জ্বলছে। মধুপুরে ট্রেন পালটে গিরিডির ট্রেনে উঠতে হবে। পাশের প্লাটফর্মে
দাঁড়িয়ে আছে গিরিডির ট্রেন। আমরা যেই সেই ট্রেনে উঠতে যাবো, বাপ্পা হঠাৎ
থমকে গিয়ে, "আরে ও বংশীদা ... বংশীদা......" বলে চিৎকার করতে লাগলো। অমনি
ঘাড় ঘুরিয়ে আমি দেখি আগের স্টেশনে দেখা সেই লোকটা...। পরনে খাটো ধুতির
উপর অদ্ভুত একটা ঢল্লা মত জামা। আর মাথায় পশ্চিমের লোকেদের মত কান ঢাকা
দেওয়া পাগড়ি। চক্ষের নিমেষে লোকটা দ্রুত জয় সিয়ারাম জয় সিয়ারাম বলতে বলতে
কোথায় যেন এক আধো অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
গিরিডির ট্রেনটি আমাদের এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল তাই
ট্রেনে ওঠার এক দুই মিনিটের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিল।


তবে পর পর দুবার ঐ লোকটিকে অমন অলৌকিক ভাবে দেখে বাপ্পা যেন কেমন ভীত ও
বিমর্ষ হয়ে গেল। আমাকে বলল, "জানিস, আমি নিশ্চিত জানি ও বংশীলাল। সেই
চেহারা, সেই পোষাক আর ঠিক তেমনই কথায় কথায় জয় সিয়ারাম বলা। অথচ ও আমাকে
চিনতে পারছে কেন, সেটাই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। বংশীদা আমাকে অসম্ভব
ভালবাসে। আমি গিরিডি আসবো শুনলেই ও আমাকে নিতে মধুপুর পর্যন্ত চলে আসে।
আসার আগে, আমি গিয়ে খাব বলে দাদুর বাগানের গিরিডির বিখ্যাত সেরা পেয়ারা
আর আতাগুলো আমার জন্য পেড়ে রেখে দেয়। পুকুরের মাছ ধরে রান্না করে রেখে
দেয়। আর গিরিডির সবচেয়ে সেরা দোকানের প্যাঁড়া একদম অর্ডার দিয়ে তৈরী করে
রাখে। কিন্তু এবার তো আমি মামিমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে কোন খবর না দিয়েই
যাচ্ছি, তাহলে বংশীদা জানবে কি করে যে আমরা গিরিডি যাচ্ছি। তাছাড়া বংশীদা
আমাকে চিনতে পারছে না কেন?"


মধুপুর থেকে গিরিডি মাত্র ঘন্টাখানেকের রাস্তা। আমাদের গল্প শেষ হওয়ার
আগেই দেখলাম ট্রেন গিরিডি স্টেশনে ঢুকছে। এই ট্রেন আর যাবে না, আবার
মধুপুর ফিরে যাবে, তাই সব যাত্রী এখানেই নেমে যাওয়ার ফলে ট্রেন খালি হয়ে
গেল। সবাই প্রায় স্থানীয় লোক। খুব বেশী হলে পঞ্চাশ-ষাট জন যাত্রী হবে,
তারা ট্রেন থেকে নেমেই হাঁটা শুরু করলো। এইসব এলাকায় রাত্রি আটটা মানে
অনেক রাত।


মিনিট দশেকের মধ্যে গোটা স্টেশন চত্তর ফাঁকা হয়ে গেল। স্টেশন থেকে বেরিয়ে
আমরাই শুধু দাঁড়িয়ে আছি একট রিক্সা বা টম টমের জন্য। হটাৎ একটু দূরে নজর
পড়তেই আমরা দুজনে আবার চমকে উঠলাম। একটা ইলেক্ট্রিক পোষ্টের নীচে আবছা
আলোয় একজন মাত্র রিক্সাওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে, আর সেই অদ্ভুত পোশাক পরা লোকটা
তাকে কি যেন বলে চলেছে। বাপ্পা আবার বংশীদা বংশীদা বলে চিৎকার করে ডাকতেই
লোকটি জয় সিয়ারাম জয় সিয়ারাম বলে অদৃশ্য হয়ে গেল। এবার সত্যি সত্যিই আমরা
দুজনে খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর চলবে না
তাই ঐ রিক্সাওয়ালা টাকে ডাকতে যাবো, এমন সময় আমাদেরকে আরও আশ্চর্য করে
দিয়ে আমরা না ডাকতেই রিক্সাওয়ালাটি নিজেই আমাদের কাছে এসে, "উঠিয়ে
বাবুজি, আপলোক তো কাছারীপাড়া সরকার ভিলা যানেওয়ালা হায় না?" বলে দাঁড়িয়ে
গেল।
নিতান্তই ভয়ে ভয়ে দুজনে উঠলাম রিক্সাটায়, তবে রিক্সাওয়ালাটা ভারী মজার
লোক ছিল, তাই মুহুর্তের মধ্যেই আমাদের ভয় কিছুটা হলেও উধাও। প্যাডেলের
তালে তালে ... জী আপনা দিল, তু আওয়ারা... গাইতে গাইতে মাত্র আট-দশ
মিনিটের মধ্যে বাপ্পার মামার বাড়ির সামনে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু
রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া মেটাতে গিয়ে আমরা আবার অবাক। রিক্সাওয়ালা "আপকা ভাড়া
বনশীলালজী মিটা দিয়া" বলে রিক্সা ঘুরিয়ে নিয়ে জি আপনা দিল... গাইতে গাইতে
অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।


আবছা অন্ধকারে রিক্সা থেকে নেমে মামাবাড়ির সদর দরজা পর্জন্ত যেতে যেতে
বাপ্পা বলল, "দেখলি তো? আমি বললাম না ও বংশীদা না হয়ে যায় না! আসলে ও আজ
কোন কাজে নিশ্চই আসানসোল গেছিল আর সেখানে আমাদের দেখতে পেয়ে ও আমাদেরকে
সারপ্রাইজ দেবে বলে এতক্ষন আমাদের সঙ্গে নাটক করছিল।" বাপ্পার মুখে একথা
শুনে আমি বললাম, "তার মানে তুই বলতে চাইছিস আগে থেকে খবর না দিয়ে এসে
মামীমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে আসতে গিয়ে উল্টে আমরাই সার প্রাইজড হয়ে
গেলাম? হা হা হা।"



যাইহোক এতক্ষনের একটা ভয়ের বাতাবরণ থেকে মুক্তি পেয়ে বাপ্পার মামার বাড়ির
কড়া নাড়া দিতেই মামীমা নিজেই দরজা খুলে আমাদের দুই মুর্তিমানকে দেখে
একেবারে আক্ষরিক অর্থেই অবাক। যাই হোক আমরা বাড়ি থেকে পালিয়ে আসিনি,
নিতান্তই মামীমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য যে এই ভাবে না জানিয়ে আসা সেটা
নিশ্চিন্ত হয়ে আমাদের প্রতি তার প্রাথমিক অভ্যর্থনা শেষ হতেই বললেন,
"তাহলে বংশীর কথাই ঠিক হল।" এ কথা শুনে আমরা দুজনে অবাক হয়ে শুধাই,
"বংশীদা তোমাকে কি বলেছে মামীমা?"



উত্তরে মামীমা বললেন, "আরে ওই পাগলটা নাকি স্বপ্ন দেখেছে যে আজ ওর বাপ্পা
দাদাবাবু আসবেই, আর সেই জন্যই সকালে থেকে এক মুহুর্তের জন্য নিজের বাড়িতে
পর্যন্ত যায়নি। সারাদিন ধরে গাছের পাকা আতা, পেয়ারা পেড়ে রেখেছে। এই তো
বিকেলে পুকুরে মাছ ধরল। আর তোরা ঢুকছিস দেখেই রান্না ঘরে গিয়ে তোদের জন্য
টিফিন করতে গেল। আমি আর কিছু বললাম না, আসলে এই বাড়িতে আমার চেয়ে তো ওরই
অধিকার বেশি।" এ কথা বলে মামীমা জোরে জোরে হেসে উঠলেন। আমি আর বাপ্পা
সমস্বরে মামিমাকে জিজ্ঞেস করলাম, "বংশীদা কি আজ একবারের জন্যও বাড়ির
বাইরে যায়নি?"



"না না ও তো সারাদিন আমার চোখের সামনেই রয়েছে," বলে উঠলেন মামীমা।
আর তখনই, বংশীদা দুই হাতে দুই প্লেট মিষ্টি হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলো আর
আমাদের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল, " খা লিজিয়ে বাপ্পা ভাইয়া, আপ ভি খা
লিজিয়ে।" তারপর মামীমার দিকে তাকিয়ে বলল, " হাম বোলা থা না মাইজি, আজ
বাপ্পা ভাইয়া জরুর আয়েগা। আধি রাত কি স্বপ্না কভি ঝুটা নাহি হোতা, হা হা
হা।"

Friday, November 24, 2017

কবিতা / ছায়ার সাথে ছুটছি / পিনাকী দত্ত গুপ্ত



ভাবলে দেখো, অনেক কথাই পড়ছে মনে -
টিনের চালে বাদ্যি বাজায় টাপুর টুপুর,
ছলাৎ ছলাৎ চপ্পলে এক হাঁটু জলে
নাক উঁচিয়ে উচ্চস্বরে ডাকছে কুকুর।

ঠিক তখনি ঢং ঢং ঢং ঘন্টা বাজে,
আর্মেনিয়াম চার্চে ঘড়ি ঠিক বারোটা,
বৌটা বাজায় খামখেয়ালি হার্মোনিয়াম,
যাত্রা দলের সঙ কেড়েছে রাত্রি গোটা!

ঠিক তখনই, নাড়ছি কড়া ক্লান্ত শরীর;
আলতো ক'রে ছিটকিনিটা খুলছো তুমি!
দেখছি তেলের  লম্ফ  জ্বলে গেরস্থলির,
দেখছি ভাঙা সান-বাধানো জন্মভূমি।

দেখছি ভাঙা ইঁটের পাঁজর পড়ছে খসে,
টাটকা দোষে দোসর দেওয়াল খামখেয়ালি;
গরাদ ভাঙা জানলা দিয়ে মুখচোরা চাঁদ,
কপাল পোড়া চোখের কোনে জমছে কালি।

এখন আমার অল্টো ছোটে বাতাস কেটে,
বুকের আঁচল প্রায় খসে যায় শ্যাম-দুলালী,
খানসামা'রা হালকা আলোয় বোতাম এঁটে
সুরায় ঢালে নীল-ছবি আর চোখের বালি।

এমনি করেই স্বপ্নগুলোর মৃত্যু হলে -
ডাইনি নাচে আস্তাবলের অন্ধকারে।
এমনি করেই লাগলে গ্রহন মেঘের কোলে,
শয়তানেরা কান পাতে এই রুদ্ধদ্বারে।

কেউ জানেনা, মুখটা আমার বদলে গেছে,
কেউ মানেনা, ঘুন ধরেছে আমার মনে;
কেউ বোঝেনা পিশাচ আমায় ভর করেছে,
কেউ দেখেনা, জিভটা আমার অলুক্ষুনে।

ভাবলে দেখো, রামতিওয়ারি ডিপ্রেশনে,
খাবলে মেখো, চাঁদের আলো কি মৌসুমি;
মধ্যরাতের পিটুইটারি সিক্রেশনে
শুনতে কি পাও - কাঁদছে তোমার জন্মভূমি?



কবিতা / স্মৃতির জলসাঘর / গৌতম সেন



একটা মিশ্ররাগের সকাল
কম্পিউটারে বাজছে গান -
বাছা বাছা, নিজের অতি পছন্দের।

চেতনার বৈঠকখানা ঘরে
বসেছে স্মৃতির স্মরণ সভা।
তোমার আমার একসাথে চলা
সোনালী সে  আভা হলই বা ক্ষয়াটে মলিন।
মগজের মঞ্চে গানের অনুরণন
    জীবন কত্থকের বাজে ব্যস্ত ঘুঙুর।

মেতে উঠি শীতঘুম ভেঙ্গে
তন্দ্রাতুর অতীত জেগে ওঠে।
সুর বাজে কানে চিরচেনা গানে
ভালবাসার চৈতি, ঝুলা, ঠুংরি, দাদরা
         পরিচিত পুরোনো সে ঠিকানা।


অনু গল্প / ছোঁয়াচ / সুজয় চক্রবর্তী



সরমার আর্থারাইটিসের ব্যামো। চল্লিশ বছর ধরে। ইদানীং সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারেন না। ব্যথায় ছটফট করেন দিনরাত। হাত ধরে ধরে সিঁড়ি টপকান। নামেনও একইভাবে।
ডাক্তার রেস্ট নিতে বলেছেন কিছুদিন। কোনও রকমে রান্নাটা সরমা করলেও বাসন মেজে দেন দিলীপবাবু ! যদিও তিনিও বার্ধক্যজনিত অসুখে জর্জরিত।
একমাত্র ছেলে অপু ব্যাঙ্গালোরে। একটা তথ্য প্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করে। বাড়িতে সরমা আর দিলীপবাবু। বিয়ে দেওয়ার বয়স হলেও ছেলে এখনই বিয়েতে রাজি নয়। সে আরেকটু গুছিয়ে নিতে চায়।
সব সময়ের জন্য একটা কাজের লোকের বড় দরকার সরমাদের। কিন্তু এ পোড়া তল্লাটে কাজের লোকের দেখা পাওয়া মানে ভগবানের দেখা পাওয়া। খোঁজ করেও যখন পেলেন না, সেদিন বিকেলবেলায় হালদার পাড়ার তহমিনার মা এসে হাজির। সে কাজ করতে চায়। দেরি না করে সরমা, দিলীপবাবুও রাজি হয়ে গেলেন।
কাল বিকেলে পাশের বাড়ির গোবিন্দর মা এসেছিল সরমাদের বাড়িতে। একথা সেকথায় সে বললো, দিদি, শেষ পর্যন্ত মুসলমান ঢোকালেন বাড়িতে ! ওর হাতের ছোঁয়া...
কথা আর বাড়তে দিলেন না সরমা, শোনো, মুসলমান না, বলো একটা মানুষ ঢুকিয়েছি বাড়িতে। ঐ যে বাজারে ফুল বিক্রি করে, সেও মুসলমান, যে মাছ বিক্রি করে সেও মুসলমান, কই তাদের হাতের ছোঁয়া লাগে না ! নাকি মাছওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করো তুমি হিন্দু না মুসলমান ! যেদিন এই ধারণা থেকে বেরোতে পারবে, সেদিন আমার বাড়িতে এসো, বুঝলে?
বললেন বটে, তবে সরমা এটা বুঝলেন যে চারিদিকে শুধু হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, খোঁজে সবাই ; কেউ মানুষ খোঁজে না


অনুগল্প / খবর উদ্ঘাটন / উৎসব দত্ত




 খবরের কাগজ দেখতে দেখতে তৃতীয় পাতায় নজর যেতেই নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছেনা মলয়বাবুর। অধৈর্যের মতো ছেলেকে ডাকতে লাগলেন ।

 প্লট- ছেলে আসতেই ছেলের মুখের দিকের চেয়ে করুণ ভাবে তাকিয়ে রইলেন। কি বলবেন বুঝতে না পেরে তাকিয়েই রইলেন ফ্যালফ্যাল করে। খবরের কাগজটা ছেলের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে আঙুল দেখিয়ে বললেন আজকের তৃতীয় পাতার খবর।

 ক্লাইম্যাক্স -' পাত্র পক্ষ বিয়েতে টাকা ও গাড়ি চাওয়ায় তিন বছরের সম্পর্ক ভেঙে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার করল এক তরুণী। স্থানীয় সুত্রে খবর গত তিন বছর ধরে এলাকারই এক তরুনের সাথে বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে বাঁধা ছিল দুজনের সম্পর্ক। পুলিশ জানিয়েছে ওই তরুণের খোঁজ চলছে। '

পতন- মিনিট খানেকের নীরবতা। দোষারোপ। পাল্টা দোষারোপ। পুলিশের আগমন। গ্রেফতার।
 শেষ অঙ্ক- ছেলেরা বিয়ে করে। মেয়েদের বিয়ে হয়।



কবিতা / দিকশুন্যপুরের ঝুপড়ি / প্রজ্ঞা পারমিতা ভাওয়াল





হাইবারনেশানে যাই যখন তখন
তার অবগাহনে ডুবে যেতে।
ফিরে যাই সেই মাতোয়ারা দিনগুলোতে
জীবনের জরদ্গভ প্রাচীর ডিঙিয়ে
অদ্ভুত এক লুকোচুরি অহর্নিশ;
দিকশুন্যপুরের সেই ঝুপড়িতে
কল্প আলিঙ্গনে আদরের বানভাসিতে দাঁড় বাই।

"ভালোবাসি" বলিনি কখনো কাউকেই
এ জীবনে হয়তো আর বলবোও না কাউকে।
মোহো মায়া থেকে যোজন ক্রোশ দূরে দাঁড়িয়েও সোহাগের চুম্বন লেপা যায়।

ঠোঁটকাটা, বেশরম ,অহংকারীর তকমা লাগে অজান্তেই
প্রেম পীড়িত সোহাগের দুর্যোগ দেখতে দেখতে ক্লান্ত মন।
প্রেমের মর্ম বোঝে কয়জনা?
অভিসার আর অভিনয়ের মধ্যে পেন্ডুলামের চলন
নিমেষকালের মধ্যে আপোষ হীন ভালোবাসার আকালে
টুকরো হয় হৃদয়
ছিন্ন ভিন্ন হয় সমাজ। ভাসাতেই আনন্দ , ভাসাতেই হিল্লোল , ভাসাতেই আছে প্রাণের দোল।


Drawing by Rishijit

দীপাবলি

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া