হু হু করে
বইছে ভেজা বাতাস, বাতাস বইছে কালজানির বুক চিরে, বাতাস বইছে সিঞ্চুলা
পাহাড়ের মেঘ ছুঁয়ে, বাতাস বইছে শিতলা মন্দির চাতালের মাধবীলতার
ঝাড় বেয়ে, ধানক্ষেতের আলে। আমার জালনায় এখন এক টুকরো রাত ছুঁয়ে
আছে। কাঁচের ফাঁকে একটা সকাল উঁকি দেবে একটু পরেই, সদ্য শেষ
হয়েছে চড়ক। বুড়ি দাদীর ঝুপড়ীর পেছনে যে বাবলা ঝোপটা ছিল তার পাশেই আমাদের ছোট ছোট ইঁটপাতা
খেলাঘর। রোদটা রোজ বিকেলে ওখানে কালচে হতে হতে মরে যায়। আজ তুলসীমঞ্চে ঝাড়ি বাঁধা হবে
টুপ টুপ করে ঝরবে আদুরে জল, মাঝদুপুরে জলের শব্দ আর বিদেহী
বাতাস দুজনে লুকোচুরি খেলবে আমার উঠোনে। হ্যাঁ আজ নববর্ষ। মেঘ ছুঁয়ে জল ছুঁয়ে আগুন
ছুঁয়ে বাতাস এক বছর ছিঁড়ে আনে। আমরা সেই বছরটার শরীর থেকে রোজ একটা একটা করে পালক টেনে
তুলে উড়িয়ে দিই। আজ আকাশের গায়ে গাঢ় চন্দন। পান্না সবুজ জংগল ঘেরা পাহাড়টা সূর্যের
সবকটা রঙ মেখে স্নান করবে। চারদিকে আতরের গন্ধ, লাল খেরোর
খাতা বেয়ে ঝরে পড়া হিসেব গুলো মিলিয়ে যাবে বকের ডানায়, শিমুল
তুলোয়, আর বসন্তবৌরির ডাকে। গহীন হিজল তমাল একটা সময় আস্ত
নদী হয় এই দিনে। একটা অদ্ভুত নেশা আজ নামবে পাকদণ্ডীর পথ বেয়ে, মহল্লা মহল্লায় উৎসবের আবহে নদীর ঘূর্ণিজলে ঘুরপাক খেয়ে যার নাম আশা,
ভালো থেকো আশা সুখে থেকো আশা। আশার নেশার মৌতাত আজ আমার আধছেঁড়া ভোর
বেয়ে সারা ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটু পরেই কাঁচের জানলাটা আমি নিজেই খুলে দেব। শব্দ গুলো
আছড়ে পড়ুক আমার ঘরের আনাচে কানাচে, রোদের শব্দ, জলের শব্দ, পাথরের শব্দ, ভালোথাকার শব্দ। গত বছরটাও ত ভালো ছিল। আলপথে হাঁটত মেঠো মানুষ। নদীর সুরে
উঠত তান। ছায়ার সুর ঝুমুর গানে, ভাদুগানে মাথা দুলিয়েছিল ধানের
শীষ।টুসুগানে ঘরবসত। আর আমার দেওয়াল জোড়া স্বপ্ন ছিল নিকোনো উঠোনের, ধানের গোলার, ইঁদারার পলাশ ছায়ার। রোদের আজ বর্ষবরণ।
Monday, April 24, 2017
কবিতা / সোনার পাথর বাটি / পিনাকী দত্ত গুপ্ত
ধর্ম আমায় ধারণ করেছে
আগুন করেছি বর্ম...
দেখতে পাচ্ছ এই দাবানলে জ্বলছে অস্থি, চর্ম ?
দেখতে পাচ্ছ উড়ছে ফিনিক্স,
চাঁদ, তারা গেছে ঝলসে,
দুধের শিশুকে নরবলি দিয়ে ঋতবান হবে কোন সে?
দেখতে পাচ্ছ পাহাড় চূড়ায়
কালপুরুষের রক্ত !
জেহাদি ফকির, মেকি সন্ন্যাসী বিধর্মী নাকি ভক্ত ?
হিন্দু জৈন মুসলিম কবি
আঙ্গুলের পেশি শক্ত;
ক্রান্তি রেখায় বৃষ্টি নেমেছে, জন্মভূমি বিভক্ত !
তবু শেষ কথা বলে যাই শোনো
ধর্ম আামার মাটি ;
কৃপানে-কলমে ভেঙে দেবো আজ 'সোনার পাথর বাটি '!
গল্প / এলেম / -অরুণ চট্টোপাধ্যায়
--ভগবানই ভরসা, সমরবাবু ভাবছিলেন মনে মনে। অটোর পেছনের সীটে একটা ছেলে
আর দুটো পূর্ণবয়স্ক মহিলার মাঝে চিঁড়ে চ্যাপ্টা হয়ে ভাবছিলেন কথাটা। সামনের সীটে
ড্রাইভারের বাঁদিকে একটি সুঠাম সুন্দরী আর তার বাঁদিকে এক প্রৌঢ়। তাঁর অর্ধেক
প্রায় মাটিতে ঝুলছে। তার ডাইনে মানে ড্রাইভারের ডাইনে আর একজন যুবক।
পাশের ভদ্রমহিলার সঙ্গে প্রায় মাখামাখি সমরবাবুর। বেশি চাপ দিতেও
পারছেন না আবার বেশি চাপ নিতেও পারছেন না নিজে। বয়েস এখন আটষট্টি। বয়েস কালের
উন্মাদনাটা নাহয় গেছে কিন্তু সংকোচ?
অটোতে এইভাবেই যাচ্ছে সবাই। এটাই হয়ে গেছে একালের দস্তুর। এটা যুগাবতারের
ফ্যাসান হয়ত। পরিবহণ সমস্যার তুলিতে আঁকা ফ্যাসান। অটো স্টার্ট দিতে যাচ্ছে সেই
অন্তিম লগ্নে আবার একটা মেয়ে এসেছিল, একটা সীট হবে নাকি? ড্রাইভার তাকে এক নজর
দেখে বলল, হবে।
সমরবাবু ভাবছিলেন মেয়েটি বসবে
কোথায়? পেছনের সীটে চারজন। বসার কোনও সীনই নেই। সামনের সীটে ড্রাইভারকে নিয়েও
চারজন। সব মিলিয়ে আট।
ড্রাইভারের টুসকিতে ম্যাজিক। বাঁদিকের মেয়েটিকে আর একটু চেপে ডানদিকের
পুরুষ মানুষটি আর নিজের মধ্যে ইঞ্চি খানেক জায়গা বানিয়ে বলল, বসুন। মেয়েটিকে
ইতস্তত করতে দেখে ড্রাইভারের আর একটা টুসকি, তবে পরেরটায় আসুন। আধঘন্টা পরেই
ছাড়বে।
ড্রাইভারের দৃষ্টিতে মেয়েটির প্রতি একটা কৌতুক ছাড়াও ছিল একটা
উপেক্ষার ভাব। মেয়েটা কী উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। সমরবাবুর মনে হল সত্যিই হয়ত
বেচারির তাড়াতাড়ি যাবার খুব দরকার ছিল নাহলে এমন অসম্ভব দাবি করত না।
অটো স্টার্ট হল। গিয়ারের হাতল উঠল পড়ল। আর সেটা ওঠার সময় তার ধাক্কা
থেকে বাঁচতে বাঁ দিকের মেয়েটি ঝুলন্ত প্রৌঢ়ের ঘাড়ের ওপর পড়ল। রাস্তায় এখানে নাকি একটা
গর্ত আছে বড়। ড্রাইভার একবার মেয়েটির দিকে চেয়ে মুচকি হাসল। এর অর্থ, কেমন ঝুঁকিটা
অনায়াসে সামলে নিলাম দেখলে? এ রুটে অটো বড় কম আর রিক্সাওলারা সব আগের জন্মে কশাই
ছিল বলে সমরবাবুর ধারণা। এরা এমন হাঁকে যে তাঁর মনে হল রিক্সা চালানোর থেকে এরা
বোধহয় রিক্সায় বসে মানুষজন দেখতেই বেশি পছন্দ করে।
সামনের আয়নায় সামনে বসা সুঠাম সুন্দরীর মুখটা নজর পড়ল সমরবাবুর। ভারি
মিষ্টি মুখখানা মেয়েটির। তার বৌমা মানে ছেলের বৌয়ের মত একেবারে বসান মুখ। কিন্তু
সে মুখে আনন্দ নেই এক ফোঁটা। যেন কি একটা ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে অটোতে ওঠা
ইস্তক। মনে পড়ল সেদিন বৌমার কথাটা।
--খুব ভাল হত না বাবা যদি আমাদের একটা গাড়ি থাকত?
সমরবাবু মনে মনে বেশ রেগে গিয়েছিলেন বৌমার ওপর। ছেলে তো একটা
প্রাইমারি স্কুলের টিচার। এই গাড়ির স্বপ্ন কী তার বৌকে মানায়? সমরবাবু বেশ
শান্তশিষ্ট লোক। রেগে গেলেও বোঝা দায়। মৃদু হেসে বললেন, কেন বৌমা হঠাৎ
গাড়ির শখ কেন?
--শখ নয় বাবা প্রয়োজন। রোজ অটোতে আপনার নাতিকে নিয়ে স্কুলে দিয়ে আসতে
হয়। সেদিন তো একেবারে—
থেমে গিয়েছিল বৌমা। কিন্তু তার চোখেমুখে এমন একটা ভীতির চিহ্ন
দেখেছিলেন সমরবাবু। ঠিক যেমন চিহ্ন আজ এই সুঠাম সুন্দরীর চোখেমুখে দেখছেন। সেদিন
বৌমার চোখমুখের ভাষা পুরোটা পড়তে পারেন নি। আজ যেন সম্পূর্ণ হল সেই পড়া।
সামনের সুঠাম সুন্দরীর দিকে নজর করতে গিয়ে নজর হঠাৎ ড্রাইভারের দিকে
পড়ে গেল সমরবাবুর। তার দুই হাত অটোর হ্যান্ডেলে। বাঁ কাঁধটা একটা মোবাইলকে আটকে
রেখেছে তার কানের সঙ্গে। কথা চালিয়ে যাচ্ছে সে দিব্বি। ঠিক যেমনভাবে মোটর সাইকেলের
ড্রাইভার কথা বলে মোবাইলে।
কালের হাওয়া---ভাবলেন সমরবাবু। আজকাল এ ফ্যাসানটা দিব্বি খাচ্ছে সবাই। ট্রেন, বাস, লরি, মোটর, মোটর সাইকেল
সবাই এমন কায়দাতে দিব্বি অভ্যস্ত হতে হয়েছে। সমরবাবু ভাবছিলেন, নিশ্চয় এটা সিনেমার
কোনও পরিচালক কি চিত্রনাট্যকারের মাথা থেকে বেরিয়েছে। নায়ক কি ভিলেনকে ঘ্যাম
স্মার্ট করে বক্স অফিস জিন্দাবাদ করার জন্যে। সেই কায়দা ইনফেকশন হয়ে ছড়িয়েছে
চারিদিকে। অফিসের বসও নিশ্চয় বাঁ হাতে ফাইল সামলে ডান হাতে সই করতে করতে বাঁ কাঁধে
মোবাইল রেখে এমনিভাবেই কথা বলছেন। এমনকি বাড়ীর গিন্নীও কি তবে তেলের কড়ায় মাছ
ভাজতে ভাজতে এমনি ভাবে মোবাইলে গল্প করে নাকি? সেবার হাতের
তেলের ছিটেয় ফোস্কাটা কি তবে এই থেকে? কিন্তু সেবার যে
বলেছিল কাঁচা তেলে মাছ দিয়ে ফেলায় খুন্তিতে আটকে তেল ছিটকে এই দশা? তার মানে একটা
গুল ঝেড়ে দিয়েছে দিব্বি?
অটোর ছেলেটা অনেকক্ষণ থেকে কথা বলে যাচ্ছে। একভাবে তাকে দেখছিলেন
সমরবাবু। বাঃ ছেলেটিকে তো বেশ হীরো হীরো লাগছে? আশপাশটা তাকিয়ে
দেখলেন সুঠাম সুন্দরীর চোখও সেই দিকে। পলক আর পড়ছে না। আগের সেই ভয়ের চিহ্ন মুছে
গিয়ে চোখে বেশ একটা মুগ্ধতা। এক কথায় অটোর টি-আর-পি বেড়ে গেছে। কে
জানে এই অটোয় যদি আবার বসে থাকে কোনও চিত্রনাট্যকার কি পরিচালক তো এই ড্রাইভারকে
দেখে শুরু হয়ে যেতে পারে এক নতুন ভাবনার। উদ্ভব হতে পারে নতুন এক ফ্যাশানের
চিত্রনাট্য।
নায়কের ফোনালাপের দিকে একটু মন দিলেন তিনি। দরকারি ফোন নাকি বাড়ির? সমরবাবুর মনে হল
সংলাপগুলো কেমন যেন মিষ্টি মিষ্টি। বয়েস আটষট্টি হলেও ফুল আর মধুকরের
বাক্যবিনিময়ের ঢং কি আর ভুলে মেরে দিয়েছেন নাকি? নিজের বৌকে এমন
কত মিঠা মিঠা বাত বলতেন সে সব কি গুলে মেরে দিয়েছেন নাকি?
এবার একটু পাশের দিকে নিজের অপাঙ্গ নজরকে বিস্তৃত করলেন। পেছনের একটি
মেয়ের মুখে একটু উদ্বেগ। এদিক ওদিক থেকে আসা বেয়াড়া গাড়িগুলোকে
বিশ্বাস নেই এতটুকু। অথবা তার খুব তাড়া আছে গন্তব্যে পৌছবার। কিন্তু বাকি সবাই
নিঃস্পৃহ, নিশ্চিন্ত আর নিরুত্তর। হয়ত তাদের তাড়া নেই অথবা এমন ঘটনাটাই
স্বাভাবিক সেটাই ধরে নিয়েছে।
উল্টোদিক থেকে একটা অটো। হঠাৎ আচমকা। হ্যান্ডেল বোধহয় একটু কাঁপল
ড্রাইভারের। ছেলেবেলার জ্যামিতিক জ্ঞান সমরবাবুকে বলে দিল সামান্য কৌণিক বিচ্যুতি
দৈর্ঘের কতটা হেরফের ঘটাতে পারে। আর জ্যামিতির সেই নিয়মেই অনেক ডানদিকে চলে এসেছে
তাঁদের অটো। ওদিকের অটোর প্রায় মুখোমুখি হবার জোগাড়।
সবাইয়ের বুক কাঁপছে। চোখ স্থির। দুর্ঘটনা থেকে মাত্র একচুল দূরে ছিল
সবাই। কিন্তু ড্রাইভার তার হাতের কৌশলে কাটিয়ে নিয়ে চলে এল বাঁ দিকে। ভগবানকে
ধন্যবাদ দিল সবাই। ড্রাইভার বাদে। সে বোধহয় নিজেকেই ধন্যবাদ দিচ্ছিল মনে মনে।
তারিফ করছিল নিজের হাতের কৌশলের। তার ‘শেষ রাত্রের
ওস্তাদের মার’ দেখাবার জন্যে এতগুলো সওয়ারি পেয়ে গেছে এই আনন্দে একেবারে ডগমগ।
মোবাইলটা কিন্তু তখনও তেমনভাবেই কাঁধে ধরা আছে ড্রাইভারের। সেই অদ্ভুত
নায়কোচিত কায়দায়। যেমনভাবে নায়কের ঠোঁটের কোণে ধরা থাকে জ্বলন্ত সিগারেট। খলনায়ককে
বেধড়ক পেটানোর পরেও। নায়ক যেমন এরপর পলায়মান খলনায়কের দিকে উপেক্ষার দৃষ্টিতে তাকিয়ে
সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়ার রিং তৈরি করে তেমন সেই ড্রাইভারও পলায়মান দুর্ঘটনার
সম্ভাবনাকে উপেক্ষার নজরে তাকিয়ে একের পর এক সাজিয়ে যাচ্ছে তার মিষ্টি কথার মালা।
হয় তার মিষ্টি বৌ বা মিষ্টি প্রেমিকার সঙ্গে।
--আরে না না তুমিই এস আজ। ভাবছি ট্রিপ বন্ধ করে ইভিনিং শোতে যাব দুজনে?—দিদি? আরে ধুস। ও তো
একেবারে বুড়ি হয়ে গেছে। বলে খুব হেসে উঠল ছেলেটি, কথায় বলে না আধা
ঘরওয়ালি? আরে না না জোক করছি। আমি তিনটে টিকিটই কাটছি। তা তুমি—
শালি! মনে মনে দাঁত কামড়ে ধরেছেন সমরবাবু। আর সময় পেলি না জামাইবাবুর সঙ্গে
প্রেম করার? নাকি দিদি এখন ঘরে আর জাম্বু বাইরে তাই রসটা ভাল পাকবে বলে ধরে নিয়েছে?
আর একটা ফাঁড়া পার করে দিল ছেলেটি। একটা ভীতু ট্রাক তার অটোর তুড়ুক
গতিতে ঘাবড়ে কোনদিকে যাবে ভেবে পাচ্ছিল না। কিন্তু ছেলেটির হাতে ম্যাজিক আছে না? ম্যাজিসিয়ানরা
কেউ মরে না মারে? তাই ট্রাকের চাকা এক ইঞ্চি দূর দিয়ে যেতে বাধ্য। এক ইঞ্চি কী কম নাকি? এক ইঞ্চি একটা
পেরেক ফুটুক দেখি কারোর পায়ে? প্রতি ইঞ্চিতে বুঝিয়ে দেবে যন্ত্রণাটা।
সবাই মুগ্ধ। একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ। সমরবাবু যেন তুড়ুক নাচ নাচতে পারলে
বর্তে যান, তোমার এলেম আছে ভায়া। কি হাতের কাজ। বাম হাতের একটা আঙ্গুল তুলে সঙ্গে
সঙ্গে নাড়ল ড্রাইভার। বুঝিয়ে দিল এটা তার বাঁ হাতের খেল।
কয়েক গজ মাত্র এগিয়েছে অটোটা সামনের দিকে হুস হুস করে। হঠাৎ
পেছনে একটা বিশাল শব্দ। বিশাল চীৎকার আর কান্নাকাটি। উল্টোদিকের অটোটা ঠিক সামলাতে
পারে নি। একটা লরির সঙ্গে মুখদর্শন। সমরবাবুদের অটো তখন বেরিয়ে গেছে বিপদ সীমা
ছেড়ে। এলেমদার ড্রাইভার বলল, দিন দুপুরে অত বোতল টানলে হয়? অটো চালানো কি
হাতের মোয়া নাকি?
সেই সুঠাম সুন্দরীর মুখে পর্যন্ত যেন একটা গর্বের হাসি। কিন্তু পেছনের
সেই অল্পবয়সী মেয়েটির চোখে একটা বেয়াড়া
প্রশ্ন ঝুলছে মনে হল সমরবাবুর।
মাঝে মধ্যে অটোতে চাপতে হয় অবশ্য সমরবাবুকে। দিন সাতেক পরে আবার একবার
অটোতে উঠতে হল। এ অঞ্চলে অটো বিশেষ নেই। ভাবলেন তাঁর সেই এলেমদার ড্রাইভারটিকেই
হয়ত পাবেন। কিন্তু এদিক ওদিক খোঁজ করেও পেলেন না। অগত্যা চালককেই প্রশ্নটা করলেন।
-ও আপনি ভোদাইয়ের কথা বলছেন? সে তো এখন
হাসপাতালে।
দিন তিনেক আগে রাত বারোটায় বাড়ি ফেরার সময় একটা লরির সঙ্গে মুখোমুখি
ধাক্কা। খুব হাতের কৌশল দেখাতে ইচ্ছে করছিল তখন তার চোলাইয়ে গলা ভেজানো মনটা।
কিন্তু বাঁ হাতের খেল, ডান হাতের খেল কোনও কিছুই তাকে বাঁচাতে পারে নি। এখন হাসপাতালের বেডে
ডাক্তারদের হাতের খেলে যদি বেঁচে ফেরে তবে রক্ষে।
--সিভিয়ার অ্যাক্সিডেন্ট দাদা, এই ড্রাইভার বলল, ইনজুরি যা হয়েছে
তাতে বাঁচাটা একটা লাখ টাকার প্রশ্ন।
রাস্তার ধারে কৌতূহলী চোখ চলে গেল সবার। একটা ভাঙ্গাচোরা অটো কাত হয়ে
পড়ে আছে। দুমড়ে মুচড়ে একেবারে যা তা। ড্রাইভার বেঁচে ফিরলেও এটার তো পোষ্ট মর্টেম
হবেই। দুর্ঘটনার কারণ জানতে হবে তো?
ছোট গল্প / এপার ওপার / নারায়ণ রায়।
স্বাধীনদের ছোট্ট শহরটার একপাশ দিয়ে কুল কুল করে বয়ে গেছে সুভদ্রা নদী। নদীর পাড় বরাবর নদীর সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে গেছে কালো পিচের রাস্তা। আর রাস্তার অপর দিকে ছোট্ট শহর অজন্তা নগর। স্বাধীনদের বাড়ি থেকে সামান্য দু-তিন কিলোমিটার গেলেই পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত। ছোট্ট স্বাধীন বাবার কাছে শুনেছে আগে নাকি একটাই দেশ ছিল, এমনকি ওর
বাবা এই বড়িতে থেকেই সাইকেলে করে পাশের যে সাতক্ষীরা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেছে সেই সাতক্ষীরা এখন বিদেশ।
তখন জমি-জমার মালিকানা ব্যাপারটা সে বুঝত না। স্বাধীনের ধারনা ছিল তাদের ছোট্ট শহরটার আসে পাশে যত খালি জায়গা জমি পড়ে আছে তার কোন মালিক নেই, যে কেউ ইচ্ছে করলেই ওখানে একটা ঘর করে নিয়ে থাকতে পারে ।
এর একটা কারণও ছিল। সুভদ্রা নদী আর
তার সংলগ্ন রাস্তার মাঝখান বরাবর একটা লম্বা চর ছিল। আর
ঐ চরের জমিটাতে মাঝে মাঝেই কোন একটা পরিবার এসে একটা টালির চাল দেয়া ছিটেবেড়া ঘর তুলে নিয়ে থাকতে শুরু করত। স্বাধীনেরও খুব ইচ্ছে হত বড়
হয়ে সেও ওই নদীর ধারে একটা বাড়ি করবে তাহলে ওর
ঘুড়ি ওড়াতে খুব সুবিধা হবে। কারন স্বাধীনদের বাড়িটা ছিল রাস্তার অপর পাড়ে নদী থেকে একটু দূরে দখিন পাড়ায়। ওদের পাড়ায় সব বাড়িই ছিল পাকা দেয়ালের তবে বেশির ভাগই টিন কিম্বা এসবেসটসের চাল। পাড়ায় যারা বড়লোক বলে পরিচিত ছিল একমাত্র তাদের বাড়ির মাথায় ছিল পাকা ছাদ। তখন ঐসব পাকা ছাদ ওয়ালা বাড়িকে দালান বাড়ি বলা হত। আর একমাত্র নিতুদের বাড়িটাই ছিল পাকা দেয়ালের উপর খড়ের চাল। তবে ওদের বাড়িটা ছিল অনেকটা জায়গার উপর এবং বাড়িতে আম, জাম, কাঁঠাল ও
নারকেল গাছ ছিল।
স্বাধীন বাবার কাছে শুনেছে ঐ চরের উপর যারা বাড়ি করে তাদেরকে রিফিউজি বলে। ওরা নিজেদের দেশের দীর্ঘ দিনের বাড়ি ঘর ছেড়ে এপারে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। তবে একই এলাকায় বসবাস করলেও স্বাধীনরা যেহেতু ঐ গ্রামেরই পুরনো লোক দেশ ভাগ হওয়ার অনেক আগে থেকেই এখানে আছে তাই ওরা রিফিউজি নয়। আস্তে আস্তে ওদের মধ্যে অনেকে রাস্তার এপারে স্বাধীনদের পাড়ায় পাকা বাড়ি ঘর করে ওদের ঘনিষ্ট প্রতিবেশী হয়ে যেত। তখন ওদের সঙ্গে স্বাধীনদের কোন পার্থক্যই সে খুঁজে পেত না। তবু তার মাথায় এটা কিছুতেই ঢুকতো না
ওদেরকে বাঙ্গাল আর স্বাধীনদেরকে ঘটি কেন বলা হয়। আর মোহনবাগান ক্লাব যত খারাপ খেলুকনা কেন স্বাধীনদের বাড়ির সবাই মোহনবাগানকেই সমর্থন করে আর
একই রকম ভাবে ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাব অত্যন্ত জঘন্য খেললেও ওরা কেন ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাবকেই সমর্থন করে? এমনকি মুখের ভাষা বা
পুজা-পার্বণ ইত্যাদী কোন ব্যাপারেই এই অদৃশ্য প্রাচীরের দুই দিকে থাকা দুটি পাড়ার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য ছিল না। স্বাধীনদের এলাকায় রিফিউজি হিসেবে যারা আসতেন তারা প্রায় সবাই খুলনা কিম্বা যশোরের লোক, তাই চব্বিশ পরগনার লোকেদের মতই তাদের মুখের ভাষাও একই। তবে পরে সে
লক্ষ্য করেছে যে অনেক রিফিউজির মুখের ভাষা বুঝতে ওর বেশ অসুবিধা হয়, শুনেছে ওরা নাকি নোয়াখালি, সিলেট, কিম্বা চট্টগ্রামের লোক।
এই কাহিনীর যখন শুরু তখন স্বাধীন দখিন পাড়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে ক্লাশ ফোরে পড়ে। স্কুলে তার অনেক বন্ধুর মধ্যে একজনের নাম ছিল হিমু। আর
এই হিমু ছিল তার খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু। আসলে ওর ঐ
নামটি ওর ভারী পছন্দ ছিল, হিমুর আসল নাম ছিল হিমালয় সেনগুপ্ত। স্বাধীন ঐ নামের কাউকে আজ এত
বছর বয়স পর্যন্ত দ্বিতীয়টি পাইনি। হিমুর বাবাও একদিন ঐভাবে ঐ
চরে একটা ঘরে তুলেছিলেন। আর তখনই সে
হিমুকে দেখেছিল। ওদের দুজনেরই বয়স তখন নয়
দশ বছর হবে। সেই থেকেই ওরা বন্ধু হয়ে গেল।
স্বাধীন হিমুর কাছে শুনেছে ওর ঠাকুরদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে এম এ
পাশ করে ওদেরই গ্রামের স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তাই ওদের বাড়িটা এলাকায় মাষ্টার মশাইএর বাড়ি বলে পরিচিত ছিল। হিমুর সেই ঠাকুরদা অবশ্য মারা গেছেন। পরবর্তী কালে হিমুর বাবা পরেশবাবুও কলকাতার জে বি
রায় আয়ুর্বেদ হাসপাতাল থেকে ডাক্তারী পাশ করে গ্রামে প্রাক্টিস শুরু করেন। তবে দেশ ছেড়ে এপার বাংলায় এসে অনেক চেষ্টা করেও তেমন কিছু সুবিধা করতে পারছিলেন না। অবশেষে ঐ
ছোট্ট শহরে গৃহশিক্ষকতা করে কোন রকমে সংসার চালাতেন। আর তারই মাঝে নতুন করে ডাক্তারী প্র্যাক্টিসের চেষ্টা শুরু করেন।
হিমুদের এমনও কোন কোন দিন যেত যেদিন ঠিক মত
দুবেলা খাবারও জুটতো না, কিন্তু হিমুর আত্মমর্যাদা ছিল এতোটাই প্রবল যে
সে কোন দিন সেটা কাউকে জানতেও দিত না। তবে স্বাধীন সেটা ওর চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারতো, আর তখন সে
ওকে কিছু একটা বলে যেমন--আজকে আমার বাড়িতে চল, আমি কয়েকটা নতুন ডাকটিকিট পেয়েছি তোকে দেখাব, এসব বলে ওদের বাড়িতে নিয়ে যেত। তখন স্বাধীনের মা
সামান্য কয়েকটা চিড়ে বা
মুড়ির নাড়ু ওকে এনে দিয়ে বলত, এই নে
মুড়ির নাড়ু তৈরী করছি, তুই এলি ভালই হল
গরম গরম কয়েকটা খেয়ে দেখ তো কেমন হয়েছে?
কথায় বলে "misfortune never
comes alone"। একদিকে হঠাৎ সব কিছু ছেড়ে একেবারে রিক্ত অবস্থায় নতুন পরিবেশে এসে হিমুর দাদা সাগর পড়াশোনায় তেমন সুবিধা করতে পারছিল না
এদিকে আবার একটা দীর্ঘদিনের গোছানো সংসার ছেড়ে এসে নতুন পরিবেশে হিমুর ঠাকুমা রীতিমত মানসিক রোগী হয়ে গেল। মাঝে মাঝেই চিৎকার করে কেঁদে উঠত আর বলত- আমার সব গেল আমার সব গেল আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল। শুধু নিতুকে বড় ভালবাসতো। নিতুকে পাসে বসিয়ে বলত- জানিস আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে এমনই এক
নদী বয়ে গেছে তার নাম বেতনা নদী। এলাকায় আমাদের পরিবারের কত নামডাক ছিল। হিমুর ঠাকুরদা সেইযুগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম
এ বলে কথা! সবাই কত
মান্যি গন্যি করত...।, এই
পর্যন্ত বলেই হঠাৎ কাঁদতে শুরু করে দিত, আমার সব গেল আমার সব গেল, আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল।
এদিকে স্বাধীনের বড়
দাদা স্বরাজ সদ্য কলেজ পাশ করে বাবার ব্যবসায়ে বসেছে। কিন্তু তার যেন বাবার ব্যবসায় মন নেই। বরং বেলা দশটা এগারটা পর্যন্ত রাস্তা-ঘাটে ঘুরে বেড়ানোটাই যেন তার কাজ। ইতিমধ্যে স্বাধীন একদিন দূর থেকে লক্ষ্য করল, হিমুর দিদি তিস্তা স্কুলে যাওয়ার পথে হেলা বটতলায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক কি যেন খুজে চলেছে। স্বাধীন দেখে অবাক হয়ে গেল হটাৎ গাছের আড়াল থেকে তার নিজের দাদা স্বরাজ বেরিয়ে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা ছোট্ট করে ভাঁজ করা কাগজ তিস্তার হাতে দিল, আর তিস্তা একটু মুচকি হেসে সেটা বই-এর ফাঁকে লুকিয়ে রাখল। সেই বয়সে স্বাধীন ব্যাপারটা তেমন কিছু না
বুঝলেও এটুকু বুঝেছিল যে
এটার মধ্যে এমন একটা গোপনীয়তা আছে যেটা প্রকাশ্যে পাঁচ কান করা উচিত হবে না।
স্বাধীন যথারীতি নিজের বাড়িতে আর পাঁচটা কথার মত হিমুদের বড়ির এইসব কথাও গল্পের ছলে বাবা, মা
এবং দাদার কাছে বলত। কিন্তু একটা জিনিস সে লক্ষ্য করত, ওর
বাড়ির লোকেরা ব্যাপারটাকে তেমন পাত্তা দিত না। বাবা চুপ করে থাকলেও মা তো
বলেই দিত, ওসব বাঙ্গালদের সঙ্গে বেশী মেলা মেশা করিস না। হিমু দুই একবার আমাদের বাড়িতে এল কিম্বা তুই ওকে দুই একটা বই দিয়ে সাহায্য করলি সেই পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু তার বেশী নয়। তবে নিতু অবাক হয়ে গেল,ওর
দাদার ব্যবহার দেখে। দাদা রীতিমত ওকে শাসিয়ে বলল, তোর ওই বাঙ্গালদের বাড়িতে অত ঘন
ঘন যাওয়ার কি দরকার?
এরই মধ্যে একদিন হিমুর বাবা পরেশবাবু স্বাধীনদের বাড়িতে এসে হাজির। তার বাবা হেমন্তবাবু কথা দিয়েছেন,
ওদের বাইরের ঘরটা পরেশবাবুকে তার ডাক্তারীর চেম্বার করার জন্য ভাড়া দেয়া হবে। তবে ভাড়া এখন তেমন কিছু দিতে পারবেন না পরে প্রাক্টিশের পশার হলে আস্তে আস্তে বকেয়া সমেত ভাড়া শোধ করবেন। সেইমত দুই একটা চেয়ার টেবিল আর
কিছু ওষুধ পত্র নিয়ে সেখানে বসতে শুরু করলেন। প্রথম প্রথম বিফল মনোরথ হলেও আস্তে আস্তে দু-চারটে রোগী হতে লাগলো।
কিন্তু এই ঘর
ভাড়া দেয়া নিয়ে বাড়িতে কম ঝামেলা হল
না। স্বাধীনের মা কিছুতেই একজন বাঙ্গালকে ঘর
ভাড়া দেবে না। কিন্তু হেমন্তবাবু এলাকায় একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি ভেবে দেখলেন বাইরের ঘরটা তো পড়েই আছে। তাতে যদি একটি পরিবারের কিছু উপকার হয় তো ক্ষতি কি?
এই ভাবে দু-তিন বছর কেটে গেল। স্বাধীনের হিমুদের বাড়ি যাওয়া এমনিতেই কমে গেছে। যদিও ওদের বন্ধুত্ব তেমনই অটুট আছে। এদিকে স্বাধীনের বাবার শরীরটা কদিন একদম ভাল যাচ্ছে না। শরীরটা আস্তে আস্তে এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে
দোকানে বসা অসম্ভব। অথচ বড় ছেলের দোকানে বসার ব্যাপারে কোন মন নেই, ইদানিং স্বরাজের সঙ্গে তিস্তার মেলা মেশাটাও বেশ বেড়েছে। সেযুগে ছেলে মেয়েদের এমন অবাধ মেলা মেশার সুযোগ ছিল না। কিন্তু তারই মধ্যে দুজনকে একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যেতে লাগলো। যদিও তিস্তা স্কুল ফাইনাল পাশ করে একটা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকার চাকরী পেয়েছে। পরেশ বাবুরও এখন হাতযশের গুনে তার পশার বেশ কিছুটা জমে উঠেছে।
হটাৎ দেখতে দেখতে তিন চার বছরের মধ্যে চাকাটা যেন কেমন তিনশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল। হিমুর বাবা এখন সংসারটাকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছেন। এখন মাসে শ'দুয়েক টাকা আয়
তার অবশ্যই হয়। মেয়ে তিস্তাও মাসে পঞ্চাশ টাকা মাইনে পায়। নিতুদের বাড়ির কাছেই এক হাজার টাকা দিয়ে দুকাঠা জায়গাও কিনেছেন। ভগবান নিশ্চই মুখ তুলে চাইবেন আর ইচ্ছে আছে আগামী দু-এক বছর খানেকের মধ্যে একটা ছোট পাকা বাড়িও করতে পারবেন।
উল্টোদিকে স্বাধীনদের অবস্থা দিন দিন কেমন যেন অগোছালো হয়ে উঠছে। ইদানিং হেমন্তবাবু প্রায়শই শয্যাশায়ী থাকেন। স্বরাজ মাঝে মাঝে দোকানে যায় কিন্তু নিয়মিত ব্যবসার খোঁজখবর না রাখার ফলে কর্মচারীরা তাকে সহজেই ভুল বোঝাতে পারে এবং ঠকায়। কর্মচারীরা চুরি করার পর
যা হোক দশ বিশ টাকা স্বরাজের হাতে দেয়, সে সেটাই বাড়িতে এনে বাবার হাতে দেয়। তবে এরই মধ্যে সম্প্রতি পরেশবাবুর চিকিৎসায় হেমন্তবাবু যেন একটু স্বস্তি পেতে সুরু করলেন।
স্বাধীনের এখন সংসারের এসব ঝুট ঝামেলা বোঝার বয়স হয়েছে। তাই ওর বাবা যখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে হটাৎ বলে ওঠেন আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল, তখন তার হিমুর ঠাকুরমার সেই আক্ষেপের কথা মনে পড়ে। কি
অসম্ভব মিল? অথচ ওরা তো
রিফিউজি নয়?
একদিন সন্ধ্যা বেলায় স্বাধীন ফুটবল খেলে ফিরছে, সঙ্গে হিমুও রয়েছে, হঠাৎ ওদের বাড়ির সামনে কাছে আসতেই শুনতে পেল, বাড়িতে কোন প্রচন্ড গোলমাল হয়েছে। একটু কাছে আসতেই কথাগুলো স্পষ্ট হ'ল। ওর মা চিৎকার করে বলছে, কতোবার বলেছিলাম বাঙ্গালদের ঘর ভাড়া দিও না, খাল কেটে কুমির এ্নো না। এখন হল তো? ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এই ছিল আমার ভাগ্যে?
ভয়ে ভয়ে স্বাধীন আর হিমু ঘরে ঢুকে দেখে অবাক হয়ে যায়। স্বাধীনের দাদা স্বরাজ আর
হিমুর দিদি তিস্তা ঘরের এক কোনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্বরাজের পরনে অতি সাধারন একটি ধুতি আর পাঞ্জাবি এবং তিস্তার পরনে একটি টুক টুকে লাল শাড়ি, মাথায় এক
মাথা সিদুঁর। পাশেই পরেশবাবু মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। বাইরের ঘর থেকে দুই একজন কৌতুহলী রোগীও দরজায় এসে ভীড় করেছে। ঘরে ঢুকে স্বাধীন আর হিমু ভয় পেয়ে গিয়ে বোকার মত ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে রইল আর তখনও ওর মা চিৎকার করেই যাচ্ছে।
তখন হেমন্তবাবু কোনরকমে বালিশ থেকে মাথাটা একটু উঁচু করে বললেন, যাক, যা হয়ে গেছে সে তো আর
ফেরানো যাবে না, ওরা পরস্পরকে ভালবেসে কালী মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে এসেছে এখন আমরা মেনে না নিলে সমাজে সবাই আমাদেরকেই ছিঃ ছিঃ করবে।
কিন্তু তাতে শৈলবালার চিৎকার যেন আরও বেড়ে গেল। খুব বড় বড় লেকচার তো দিচ্ছো তা একটা পরের বাড়ির মেয়েকে খাওয়াবে কি শুনি? এদিকে নিজেদেরই তো পেট চলে না।
কিন্তু তাতে শৈলবালার চিৎকার যেন আরও বেড়ে গেল। খুব বড় বড় লেকচার তো দিচ্ছো তা একটা পরের বাড়ির মেয়েকে খাওয়াবে কি শুনি? এদিকে নিজেদেরই তো পেট চলে না।
পরের বাড়ি কেন বলছো? ও তো আজ
থেকে আমাদের বাড়ির মেয়ে। হেমন্তবাবুর মুখে একথা শুনে পরেশবাবুর সাহস হ'ল একটু মুখ খোলার। তিনিও বললেন,
দেখুন বেয়ান, সম্পর্ক যখন একটা হয়েই গেল তখন আর ওসব নিয়ে চিন্তা করার কি
আছে। স্বরাজ এবার থেকে নিয়মিত দোকানে বসবে, তিস্তাও তো একটা চাকরী করে আর আমারও ত এখন মোটা মুটি ভালই চলছে এবং সেই সময় আপনারা এই ঘরটা না দিলে আমিও কোথায় ভেসে যেতাম বলুনতো? তাই আসুন না
সবাই মিলে আমরা নতুন করে আমাদের এই
সংসার দুটোকে আবার সাজিয়ে তুলি? যা মা গুরুজনদের প্রণাম কর।
একথা শুনে স্বাধীন আর হিমু দুজনে এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল হিমুর মা
আর ঠাকুরমাকে ডেকে আনতে।
Subscribe to:
Posts (Atom)
সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া
সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া
-
ধর্ম আমায় ধারণ করেছে আগুন করেছি বর্ম ... দেখতে পাচ্ছ এই দাবানলে জ্বলছে অস্থি , চর্ম ? দেখতে পাচ্ছ উড়ছে ফিনিক্স , চাঁ...
-
শত চেষ্টা করে যখন একটা কাঠও জোগাড় করা গেল না , তখন নদীর চরে গর্ত খুঁড়ে অভাগীকে শোয়ানো হল । যে খড়ের আঁটি জ্বেলে কাঙালি মায়ের মুখে আগুন...
-
দেখে সন্দেহ হবার মতই চেহারাখানা। মাথার উস্কোখুস্কো চুলগুলো বেয়াড়া ভাবে মুখের এদিকে ওদিকে পড়েছে। চোখগুলো বেশ ফোলা ফোলা আর লাল। জবা...
-
শুকনো বকুল চললি কোথায় ? গ্রহণলাগা দুপুরবেলা লাল মাটি পথ একলা চলা - রুদ্রপলাশ মোড়ের মাথায় ? কি বললি ? আজ বিকেলে মোরগ লড়াই ...
-
বিষাদের মেঘ ছেয়েছে আকাশে বৃষ্টি বুঝি আসন্ন— বাতাসের চোখ ছল ছল ভাসে প্রতীক্ষা কার জন্য? ওগো মেয়ে তুমি কার কথা ভাবো, সে কি ...
-
যান্ত্রিক তপোবনে প্রতিটি নাগরিক জানে সভ্য পৃথিবী আসলে ডিজিটাল অরণ্য একটা প্রচন্ড উত্তপ্ত ইস্পাতের রড ভাঙ্গছে ক্রমাগত টুকরো টুকরো হ...
-
নগ্ন দেহ তাতেই লেপা থাকে সংসারের দারিদ্র; রাশি রাশি অর্থ লাগি রং আর হাসি ঠোঁটে গুঁজে , দিনের পর দিন শরীরের তল্লাশি করায় মাতাল নেশ...
-
: Ikigai The Japanese Secret to a Long and Happy Life Might Just Help You Live a More Fulfilling Life In Japan, millions of peop...
-
আশি বছরে হাঁটতে ভাল পারত সদাশিব। এমন কি বাইরেও যেতে পারত। এখন এই পঁচাশি বছরের দোরগোড়ায় এসে বিছানা তার প্রায় সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়েছে। ...



