Monday, April 24, 2017

ছোট গল্প / এপার ওপার / নারায়ণ রায়।




স্বাধীনদের  ছোট্ট শহরটার একপাশ দিয়ে কুল কুল করে বয়ে গেছে সুভদ্রা নদী। নদীর পাড় বরাবর নদীর সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে গেছে কালো পিচের রাস্তা। আর রাস্তার অপর দিকে ছোট্ট শহর অজন্তা নগর। স্বাধীনদের বাড়ি থেকে সামান্য দু-তিন কিলোমিটার গেলেই পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত। ছোট্ট স্বাধীন বাবার কাছে শুনেছে আগে নাকি একটাই দেশ ছিল, এমনকি ওর বাবা এই বড়িতে থেকেই সাইকেলে করে পাশের যে সাতক্ষীরা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেছে সেই সাতক্ষীরা এখন বিদেশ
তখন জমি-জমার মালিকানা ব্যাপারটা সে বুঝত না। স্বাধীনের ধারনা ছিল তাদের ছোট্ট শহরটার আসে পাশে যত খালি জায়গা জমি পড়ে আছে তার কোন মালিক নেই, যে কেউ ইচ্ছে করলেই ওখানে একটা ঘর করে নিয়ে থাকতে পারে এর একটা কারণও ছিল। সুভদ্রা নদী আর তার সংলগ্ন রাস্তার মাঝখান বরাবর একটা লম্বা চর ছিল। আর চরের জমিটাতে মাঝে মাঝেই কোন একটা পরিবার এসে একটা টালির চাল দেয়া ছিটেবেড়া ঘর তুলে নিয়ে থাকতে শুরু করত। স্বাধীনেরও খুব ইচ্ছে হত বড় হয়ে সেও ওই নদীর ধারে একটা বাড়ি করবে তাহলে ওর ঘুড়ি ওড়াতে খুব সুবিধা হবে। কারন স্বাধীনদের বাড়িটা ছিল রাস্তার অপর পাড়ে নদী থেকে একটু দূরে দখিন পাড়ায়। ওদের পাড়ায় সব বাড়িই ছিল পাকা দেয়ালের তবে বেশির ভাগই টিন কিম্বা এসবেসটসের চাল। পাড়ায় যারা বড়লোক বলে পরিচিত ছিল একমাত্র তাদের বাড়ির মাথায় ছিল পাকা ছাদ। তখন ঐসব পাকা ছাদ ওয়ালা বাড়িকে দালান বাড়ি বলা হত। আর একমাত্র নিতুদের বাড়িটাই ছিল পাকা দেয়ালের উপর খড়ের চাল। তবে ওদের বাড়িটা ছিল অনেকটা জায়গার উপর এবং বাড়িতে আম, জাম, কাঁঠাল নারকেল গাছ ছিল
স্বাধীন বাবার কাছে শুনেছে চরের উপর যারা বাড়ি করে তাদেরকে রিফিউজি বলে। ওরা নিজেদের দেশের দীর্ঘ দিনের বাড়ি ঘর ছেড়ে এপারে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। তবে একই এলাকায় বসবাস করলেও স্বাধীনরা যেহেতু গ্রামেরই পুরনো লোক দেশ ভাগ হওয়ার অনেক আগে থেকেই এখানে আছে তাই ওরা রিফিউজি নয়। আস্তে আস্তে ওদের মধ্যে অনেকে রাস্তার এপারে স্বাধীনদের পাড়ায় পাকা বাড়ি ঘর করে ওদের ঘনিষ্ট প্রতিবেশী হয়ে যেত। তখন ওদের সঙ্গে স্বাধীনদের কোন পার্থক্যই সে খুঁজে পেত না। তবু তার মাথায় এটা কিছুতেই ঢুকতো না ওদেরকে বাঙ্গাল আর স্বাধীনদেরকে ঘটি কেন বলা হয়। আর মোহনবাগান ক্লাব যত খারাপ খেলুকনা কেন স্বাধীনদের বাড়ির সবাই মোহনবাগানকেই সমর্থন করে আর একই রকম ভাবে ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাব অত্যন্ত জঘন্য খেললেও ওরা কেন ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাবকেই সমর্থন করে? এমনকি মুখের ভাষা বা পুজা-পার্বণ ইত্যাদী কোন ব্যাপারেই এই অদৃশ্য প্রাচীরের দুই দিকে থাকা দুটি পাড়ার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য ছিল না। স্বাধীনদের এলাকায় রিফিউজি হিসেবে যারা আসতেন তারা প্রায় সবাই খুলনা কিম্বা যশোরের লোক, তাই চব্বিশ পরগনার লোকেদের মতই তাদের মুখের ভাষাও একই। তবে পরে সে লক্ষ্য করেছে যে অনেক রিফিউজির মুখের ভাষা বুঝতে ওর বেশ অসুবিধা হয়, শুনেছে ওরা নাকি নোয়াখালি, সিলেট, কিম্বা চট্টগ্রামের লোক
এই কাহিনীর যখন শুরু তখন স্বাধীন দখিন পাড়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে ক্লাশ ফোরে পড়ে। স্কুলে তার অনেক বন্ধুর মধ্যে একজনের নাম ছিল হিমু। আর এই হিমু ছিল তার খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু। আসলে ওর নামটি ওর ভারী পছন্দ ছিল, হিমুর আসল নাম ছিল হিমালয় সেনগুপ্ত। স্বাধীন নামের কাউকে আজ এত বছর বয়স পর্যন্ত দ্বিতীয়টি পাইনি। হিমুর বাবাও একদিন ঐভাবে চরে একটা ঘরে তুলেছিলেন। আর তখনই সে হিমুকে দেখেছিল। ওদের দুজনেরই বয়স তখন নয় দশ বছর হবে। সেই থেকেই ওরা বন্ধু হয়ে গেল
স্বাধীন হিমুর কাছে শুনেছে ওর ঠাকুরদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে এম পাশ করে ওদেরই গ্রামের স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তাই ওদের বাড়িটা এলাকায় মাষ্টার মশাইএর বাড়ি বলে পরিচিত ছিল। হিমুর সেই ঠাকুরদা অবশ্য মারা গেছেন। পরবর্তী কালে হিমুর বাবা পরেশবাবুও কলকাতার জে বি রায় আয়ুর্বেদ হাসপাতাল থেকে ডাক্তারী পাশ করে গ্রামে প্রাক্টিস শুরু করেন। তবে দেশ ছেড়ে এপার বাংলায় এসে অনেক চেষ্টা করেও তেমন কিছু সুবিধা করতে পারছিলেন না। অবশেষে ছোট্ট শহরে গৃহশিক্ষকতা করে কোন রকমে সংসার চালাতেন। আর তারই মাঝে নতুন করে ডাক্তারী প্র্যাক্টিসের চেষ্টা শুরু করেন
হিমুদের এমনও কোন কোন দিন যেত যেদিন ঠিক মত দুবেলা খাবারও জুটতো না, কিন্তু হিমুর আত্মমর্যাদা ছিল এতোটাই প্রবল যে সে কোন দিন সেটা কাউকে জানতেও দিত না। তবে স্বাধীন সেটা ওর চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারতো, আর তখন সে ওকে কিছু একটা বলে যেমন--আজকে আমার বাড়িতে চল, আমি কয়েকটা নতুন ডাকটিকিট পেয়েছি তোকে দেখাব, এসব বলে ওদের বাড়িতে নিয়ে যেত। তখন স্বাধীনের মা সামান্য কয়েকটা চিড়ে বা মুড়ির নাড়ু ওকে এনে দিয়ে বলত, এই নে মুড়ির নাড়ু তৈরী করছি, তুই এলি ভালই হল গরম গরম কয়েকটা খেয়ে দেখ তো কেমন হয়েছে?
কথায় বলে "misfortune never comes alone" একদিকে হঠাৎ সব কিছু ছেড়ে একেবারে রিক্ত অবস্থায় নতুন পরিবেশে এসে হিমুর দাদা সাগর পড়াশোনায় তেমন সুবিধা করতে পারছিল না এদিকে আবার একটা দীর্ঘদিনের গোছানো সংসার ছেড়ে এসে নতুন পরিবেশে হিমুর ঠাকুমা রীতিমত মানসিক রোগী হয়ে গেল। মাঝে মাঝেই চিৎকার করে কেঁদে উঠত আর বলত- আমার সব গেল আমার সব গেল আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল। শুধু নিতুকে বড় ভালবাসতো। নিতুকে পাসে বসিয়ে বলত- জানিস আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে এমনই এক নদী বয়ে গেছে তার নাম বেতনা নদী। এলাকায় আমাদের পরিবারের কত নামডাক ছিল। হিমুর ঠাকুরদা সেইযুগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম বলে কথা! সবাই কত মান্যি গন্যি করত..., এই পর্যন্ত বলেই হঠাৎ কাঁদতে শুরু করে দিত, আমার সব গেল আমার সব গেল, আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল
এদিকে স্বাধীনের বড় দাদা স্বরাজ সদ্য কলেজ পাশ করে বাবার ব্যবসায়ে বসেছে। কিন্তু তার যেন বাবার ব্যবসায় মন নেই। বরং বেলা দশটা এগারটা পর্যন্ত রাস্তা-ঘাটে ঘুরে বেড়ানোটাই যেন তার কাজ। ইতিমধ্যে স্বাধীন একদিন দূর থেকে লক্ষ্য করল, হিমুর দিদি তিস্তা স্কুলে যাওয়ার পথে হেলা বটতলায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক কি যেন খুজে চলেছে। স্বাধীন দেখে অবাক হয়ে গেল হটাৎ গাছের আড়াল থেকে তার নিজের দাদা স্বরাজ বেরিয়ে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা ছোট্ট করে ভাঁজ করা কাগজ তিস্তার হাতে দিল, আর তিস্তা একটু মুচকি হেসে সেটা বই-এর ফাঁকে লুকিয়ে রাখল। সেই বয়সে স্বাধীন ব্যাপারটা তেমন কিছু না বুঝলেও এটুকু বুঝেছিল যে এটার মধ্যে এমন একটা গোপনীয়তা আছে যেটা প্রকাশ্যে পাঁচ কান করা উচিত হবে না
স্বাধীন যথারীতি নিজের বাড়িতে আর পাঁচটা কথার মত হিমুদের বড়ির এইসব কথাও গল্পের ছলে বাবা, মা এবং দাদার কাছে বলত। কিন্তু একটা জিনিস সে লক্ষ্য করত, ওর বাড়ির লোকেরা ব্যাপারটাকে তেমন পাত্তা দিত না। বাবা চুপ করে থাকলেও মা তো বলেই দিত, ওসব বাঙ্গালদের সঙ্গে বেশী মেলা মেশা করিস না। হিমু দুই একবার আমাদের বাড়িতে এল কিম্বা তুই ওকে দুই একটা বই দিয়ে সাহায্য করলি সেই পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু তার বেশী নয়। তবে নিতু অবাক হয়ে গেল,ওর দাদার ব্যবহার দেখে। দাদা রীতিমত ওকে শাসিয়ে বলল, তোর ওই বাঙ্গালদের বাড়িতে অত ঘন ঘন যাওয়ার কি দরকার?
এরই মধ্যে একদিন হিমুর বাবা পরেশবাবু স্বাধীনদের বাড়িতে এসে হাজির। তার বাবা হেমন্তবাবু কথা দিয়েছেন, ওদের বাইরের ঘরটা পরেশবাবুকে তার ডাক্তারীর চেম্বার করার জন্য ভাড়া দেয়া হবে। তবে ভাড়া এখন তেমন কিছু দিতে পারবেন না পরে প্রাক্টিশের পশার হলে আস্তে আস্তে বকেয়া সমেত ভাড়া শোধ করবেন। সেইমত দুই একটা চেয়ার টেবিল আর কিছু ওষুধ পত্র নিয়ে সেখানে বসতে শুরু করলেন। প্রথম প্রথম বিফল মনোরথ হলেও আস্তে আস্তে দু-চারটে রোগী হতে লাগলো
কিন্তু এই ঘর ভাড়া দেয়া নিয়ে বাড়িতে কম ঝামেলা হল না। স্বাধীনের মা কিছুতেই একজন বাঙ্গালকে ঘর ভাড়া দেবে না। কিন্তু হেমন্তবাবু এলাকায় একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি ভেবে দেখলেন বাইরের ঘরটা তো পড়েই আছে। তাতে যদি একটি পরিবারের কিছু উপকার হয় তো ক্ষতি কি?
এই ভাবে দু-তিন বছর কেটে গেল। স্বাধীনের হিমুদের বাড়ি যাওয়া এমনিতেই কমে গেছে। যদিও ওদের বন্ধুত্ব তেমনই অটুট আছে। এদিকে স্বাধীনের বাবার শরীরটা কদিন একদম ভাল যাচ্ছে না। শরীরটা আস্তে আস্তে এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে দোকানে বসা অসম্ভব। অথচ বড় ছেলের দোকানে বসার ব্যাপারে কোন মন নেই, ইদানিং স্বরাজের সঙ্গে তিস্তার মেলা মেশাটাও বেশ বেড়েছে। সেযুগে ছেলে মেয়েদের এমন অবাধ মেলা মেশার সুযোগ ছিল না। কিন্তু তারই মধ্যে দুজনকে একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যেতে লাগলো। যদিও তিস্তা স্কুল ফাইনাল পাশ করে একটা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকার চাকরী পেয়েছে। পরেশ বাবুরও এখন হাতযশের গুনে তার পশার বেশ কিছুটা জমে উঠেছে
হটাৎ দেখতে দেখতে তিন চার বছরের মধ্যে চাকাটা যেন কেমন তিনশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল। হিমুর বাবা এখন সংসারটাকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছেন। এখন মাসে 'দুয়েক টাকা আয় তার অবশ্যই হয়। মেয়ে তিস্তাও মাসে পঞ্চাশ টাকা মাইনে পায়। নিতুদের বাড়ির কাছেই এক হাজার টাকা দিয়ে দুকাঠা জায়গাও কিনেছেন। ভগবান নিশ্চই মুখ তুলে চাইবেন আর ইচ্ছে আছে আগামী দু-এক বছর খানেকের মধ্যে একটা ছোট পাকা বাড়িও করতে পারবেন
উল্টোদিকে স্বাধীনদের অবস্থা দিন দিন কেমন যেন অগোছালো হয়ে উঠছে। ইদানিং হেমন্তবাবু প্রায়শই শয্যাশায়ী থাকেন। স্বরাজ মাঝে মাঝে দোকানে যায় কিন্তু নিয়মিত ব্যবসার খোঁজখবর না রাখার ফলে কর্মচারীরা তাকে সহজেই ভুল বোঝাতে পারে এবং ঠকায়। কর্মচারীরা চুরি করার পর যা হোক দশ বিশ টাকা স্বরাজের হাতে দেয়, সে সেটাই বাড়িতে এনে বাবার হাতে দেয়। তবে এরই মধ্যে সম্প্রতি পরেশবাবুর চিকিৎসায় হেমন্তবাবু যেন একটু স্বস্তি পেতে সুরু করলেন
স্বাধীনের এখন সংসারের এসব ঝুট ঝামেলা বোঝার বয়স হয়েছে। তাই ওর বাবা যখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে হটাৎ বলে ওঠেন আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল, তখন তার হিমুর ঠাকুরমার সেই আক্ষেপের কথা মনে পড়ে। কি অসম্ভব মিল? অথচ ওরা তো রিফিউজি নয়?

একদিন সন্ধ্যা বেলায় স্বাধীন ফুটবল খেলে ফিরছে, সঙ্গে হিমুও রয়েছে, হঠাৎ ওদের বাড়ির সামনে কাছে আসতেই শুনতে পেল, বাড়িতে কোন প্রচন্ড গোলমাল হয়েছে। একটু কাছে আসতেই কথাগুলো স্পষ্ট 'ল। ওর মা চিৎকার করে বলছে, কতোবার বলেছিলাম বাঙ্গালদের ঘর ভাড়া দিও না, খাল কেটে কুমির এ্নো না। এখন হল তো? ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এই ছিল আমার ভাগ্যে?
ভয়ে ভয়ে স্বাধীন আর হিমু ঘরে ঢুকে দেখে অবাক হয়ে যায়। স্বাধীনের দাদা স্বরাজ আর হিমুর দিদি তিস্তা ঘরের এক কোনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্বরাজের পরনে অতি সাধারন একটি ধুতি আর পাঞ্জাবি এবং তিস্তার পরনে একটি টুক টুকে লাল শাড়ি, মাথায় এক মাথা সিদুঁর। পাশেই পরেশবাবু মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। বাইরের ঘর থেকে দুই একজন কৌতুহলী রোগীও দরজায় এসে ভীড় করেছে। ঘরে ঢুকে স্বাধীন আর হিমু ভয় পেয়ে গিয়ে বোকার মত ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে রইল আর তখনও ওর মা চিৎকার করেই যাচ্ছে
তখন হেমন্তবাবু কোনরকমে বালিশ থেকে মাথাটা একটু উঁচু করে বললেন, যাক, যা হয়ে গেছে সে তো আর ফেরানো যাবে না, ওরা পরস্পরকে ভালবেসে কালী মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে এসেছে এখন আমরা মেনে না নিলে সমাজে সবাই আমাদেরকেই ছিঃ ছিঃ করবে।
কিন্তু তাতে শৈলবালার চিৎকার যেন আরও বেড়ে গেল। খুব বড় বড় লেকচার তো দিচ্ছো তা একটা পরের বাড়ির মেয়েকে খাওয়াবে কি শুনি? এদিকে নিজেদেরই তো পেট চলে না
পরের বাড়ি কেন বলছো? তো আজ থেকে আমাদের বাড়ির মেয়ে। হেমন্তবাবুর মুখে একথা শুনে পরেশবাবুর সাহস ' একটু মুখ খোলার। তিনিও বললেন, দেখুন বেয়ান, সম্পর্ক যখন একটা হয়েই গেল তখন আর ওসব নিয়ে চিন্তা করার কি আছে। স্বরাজ এবার থেকে নিয়মিত দোকানে বসবে, তিস্তাও তো একটা চাকরী করে আর আমারও এখন মোটা মুটি ভালই চলছে এবং সেই সময় আপনারা এই ঘরটা না দিলে আমিও কোথায় ভেসে যেতাম বলুনতো? তাই আসুন না সবাই মিলে আমরা নতুন করে আমাদের এই সংসার দুটোকে আবার সাজিয়ে তুলি? যা মা গুরুজনদের প্রণাম কর
একথা শুনে স্বাধীন আর হিমু দুজনে এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল হিমুর মা আর ঠাকুরমাকে ডেকে আনতে


English Poem / HUMMING A SONG---PENNING A FEW LINES / by Durba Mitra




5.30 am
Mind woke up
Not yet my eyes
Humming a few
Gazals in my cerebrum.

Rolled onto my belly
Picked a pen
Opened the tab
A silly smile on lips
Written memories of you.

Got up and got ready
Got a daylong workshop
Thinking about
Meeting you in evening
Narrating my writing.

During the workshop
Phone kept on beeping
Your photo flashing
Cardiac arrest and car overturn
At 2.30 am.

Stopping my lecture
Came out of the hall
You had left us
At 6 am.
Post mortem is going on.

I drove down
Locked the car
Opened the gate
Bolero car was missing
I fled away.

5 months’ flashback
You had come to me
Rain drenched and hungry
I shooed you away.
My mood was to be alone.

You had gone away
Head down and eyes forlorn.
Called me later,
“You would never see me.”
I replied, “Would not require!”

You had kept your word
I could never disclose
That last chance to save you
You had stopped medication?
I will never know !

 

ধারাবাহিক গল্প / দিয়ার ডায়েরী থেকে / পারমিতা চ্যাটার্জী



দিয়াকি তার দিনগুলি সত্যি রান্নাঘরের তেলকালির মধ্যেই কাটিয়েছিলনা কাটায়নি। সব কঠিন কর্তব্য ,পরাধীনত্‌ অর্থনৈতিক পরাধীনতাসবার বাধা সত্যেও দিয়া স্বপ্ন দেখে যেত কবে সে পরাধীনতার বদ্ধ দরজা ভেঙে অন্ধকার কাটিয়ে আলোর মুখ দেখবেকবে সে স্বধীন হবে মানষিক ভাব এবং অর্থনৈতিক ভাবে। দিয়া জানত এরজন্যে তাকে আরো অপেক্ষা করতে হবে যতদিন না তার সন্তানরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে ততদিন তাকে এই পরাধীনতার গ্লানি সহ্য করতেই হবেতাই দিয়ার পূজনীয় শ্বশুরমশাই যখন গলা ফাটিয়ে চিতকার করে বলতেন আমার বাড়িতে থাকতে গেলে আমার মতেই চলতে হবেআমার অবুঝ দাদারা ,বাড়ীতে যত আত্মীয় স্বজন আসবে আমার গুরুদেব এবং তাঁর পরিবারআমার মেয়ে জামাই নাতিনাতনীদের জন্য যখন যা বলব তাই করতে হবেএরজন্য মাইগ্রেনে তোমার মাথা ছিঁড়ে যাকগাদা গাদা অষুধ খেয়ে আলসার হোক তাতে আমার কিছু এসে যাযনাএ হেন শ্বশুর মশাইকেও দিয়া প্রাণ দিয়ে সেবা করে গেছেমুখে মুখে ওষুধ পথ্যডাক্তার বদ্যি সবই সে করে গেছে মেনে নিয়েছিল তাঁর সব কথা মনে করত সত্যিতো তাঁর বাড়ীতে যখন থাকছি তখন তাঁর কথা মতই চলতে হবেদিয়া তাঁর স্বামীকে বহুবার বলেছিল আমরা কি আলাদা থাকতে পারিনা তুমি একটু চেষ্টা কর না,দূর থেকে আমরা সবার দেখাশোনা করব ,তাহলে এই বিশাল সংসার থেকে একটু মুক্তি পাই একটু নিজের মতন করে বাঁচতে পারিতাঁর স্বামী কখনও বলত আচ্ছা দেখব কখনো বলত তুমি বললেই তো আর  হবেনাআমি আমার বাবা জ্যাঠা সবাইকে ছেড়ে চলে যাবআমি স্ত্রৈণ্য নই।
দিয়ার মনে পড়ে দিয়ার বড় মেয়ে যখন ১ বছরের তখন বড় ননদের ছোট মেয়ের আন্নপ্রাসনসবাই মিলে বসে তত্ত্ব সাজানো হচ্ছেবিশেষ করে ছোট ননদ এইসব ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা নিতসে আর তার বাবা মিলে নিউমার্কেট থেকে গিয়ে বড় ননদের দুই মেয়ের জন্য অনেক ভালো ভালো জামা কিনে নিয়ে এল দুজনের কারও মনে হলনা বাড়ীতে আর একটা বাচ্ছা আছে তার জন্য একটা হলেও জামা কেনা উচিতএই ব্যাবহারে দিয়ার চোখে জল এসে গিয়েছিলঠাকুর বোধহয় দিয়ার অন্তরে সন্তান প্রতি এই বঞ্চনার দুঃখ দেখতে পেয়েছলেনতাই এর কিছুদিন পর যখন দিয়ার বাবা মা যখন আমেরিকা থেকে ফিরলেন মানে তার দিদির কাছ থেকে তখন দিদি বাবা মায়ের হাত দিয়ে প্রথম বোনঝির জন্য উজার করে জিনিষ পত্র পাঠিয়েছেযা দিয়ার বড়লোক্ শ্বশুর বাড়ীথেকে কোনদিন পায়নিদিয়ার মনটা সাময়িক ভাবে একটা জয়ের উল্লাসে ভরে উঠেছিলদিয়া কিন্তু সব জায়গা থেকে নিজের জয়টা নিজের পরিশ্রমে আদায় করে নিয়েছিলনিজের চলার পথটায় নিজেই পিচ ঢেলে মসৃণ করেছিল ,নিজে হাতেই আগাছা ছেটে বাদ দিয়ে সমান ঘাসের গালিচা পেতেছিলএকমাত্র ভগবান ছাড়া তার এই চলার পথে কেউ তাকে একইঞ্চি জমি ছেড়ে দেয়নিনিজের জমি নিজেই তৈরী করেছিল।

ক্রমশ

Sunday, April 23, 2017

ধারাবাহিক গল্প / ফিরে দেখা / সুব্রত ঘোষ



বাবুলের বাড়ি পৌঁছে শুনলাম খুব চিৎকার হচ্ছে, প্রথমে মনে হয়েছিলো বুঝি পানীয়ের ফলস্বরূপ। পরে ভেতরে গিয়ে বুঝলাম ব্যপারটা অন্য মাত্রায় পৌঁছে গেছে। বিজয়ের প্যান্টের পকেটের মানি ব্যাগ থেকে ১০০০ টাকা  হাওয়া হয়ে গেছে। খুব হই চই চলছে, আর খোঁজা খুঁজি। বিজয়কে জিজ্ঞাসা করলাম কি করে বুঝলি টাকা হাওয়া হয়ে গেছে। তখন আসিফ বলল, সব্বাই মিলে বিজয়কে খ্যাপানো চলছিলো ওর ব্যর্থ প্রেম নিয়ে, তখন আমি বললাম তোর বউয়ের ফটো আছে...দেখা আমাদের। বিজয় মানি ব্যাগ নিয়ে এলো বউয়ের ফটো দেখানোর জন্য। তখনই নজর করলো টাকা গায়েব। শ্বশুরবাড়ি আসবে বলে একটু বেশী টাকা এনেছিল তার মধ্যে দুটো ৫০০ টাকার নোট ছিল, সেই দুটোই হাওয়া হয়ে গেছে।সারা ঘর খোজার পরও পাওয়া গেলো না হদিশ, কোথায় বা কে নিলো মানি ব্যাগ থেকে ৫০০ টাকার নোট দুটোএকবার কাশিদাকে জিজ্ঞাসা করলো আসিফ, তারপর এই ঘর ওই ঘর ঘুরে ব্যলকনিতে গিয়ে হঠাৎ আসিফ বলল, আচ্ছা রজত তোর মনে পরে ক্লাবে তুই দুটো সিগারেট নিয়ে যেতিস একটা প্যাকেটে, প্রথমে একটা ধরিয়ে প্যাকেটটা ফেলে দিতিস, খালি বলে বোকা বানানর জন্য। যদিও আর একটা সিগারেট থাকতো ওই ফেলে দেওয়া প্যাকেটে। আজ তোর সেই বুদ্ধি দিয়ে মনে হয় চোর ধরা পরবে। উঁকি দিয়ে নিচের দিকে দেখাল দুটো প্যাকেট পরে আছে। একটা ক্লাসিক ফিল্টার অন্যটা ফ্লেকের। ক্লাসিক ফিল্টার তো তুই খাস রজত, বলল আসিফ। আর ফ্লেক খায় কবীর, আমাদের মধ্যে তো আর কেউ সিগারেট খায় নাআচ্ছা কবীর তুই প্যাকেট ছাড়াই সিগারেট এনেছিলি বুঝি, জিজ্ঞাসা করে আসিফ।খানিক টা আমতা আমতা করে কবীর। আসিফ বলে চল তো নিচে যাই, বলে আমার হাত ধরে নিচে নিয়ে গেলো। খালি প্যাকেট দুটো হাতে তুলল। একটা ক্লাসিকের যেটা আমি ফেলেছিলাম, অন্যটা ফ্লেকের। ওই ফ্লেকের প্যাকেটটা খুলতেই ওঁর মধ্যে থেকে বেড়িয়ে এলো ১০০০ টাকা, ৫০০ টাকার দুটো নোট। আসিফ বলল, রজত তোর সেই বুদ্ধি আজ কাজে এলো, এইবার চোর ধরা পরবে। বলেই আমাকে নিয়ে আবার দোতলায় উঠলো। আমি সবে মাত্র গিয়ে পৌঁছেছি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কি করবো, যাই হোক আসিফের সঙ্গে উঠলাম দোতলায় যেখানে বাকি সব্বাই বসে আড্ডা মারছিল। আসিফ ওই ঘরে পৌঁছেই সবার উদ্দেশ্যে বলল,  একটা সত্যি কথা জিজ্ঞাসা করবো।বন্ধু হিসেবে জিজ্ঞাসা করতেও খারাপ লাগছে কিন্তু সেটা না করলে বোঝা যাবে না কে নিয়েছে বিজয়ের মানি ব্যাগ। আমরা সব্বাই চোরের ভাগিদার হয়ে যাবো, তাই নয় কি...সব্বাই কে জিজ্ঞাসা করলো আসিফ। সবাই মৌন হয়ে সম্মতি জানালো। এরপর আসিফ আস্তে আস্তে কবীরের কাছে এগিয়ে গেলোকবীরকে বলল সত্যি কথা বল তো কবীর টাকা তুই নিয়েছিস কিনা। দ্যাখ সত্যি কথা বললে এই ব্যপারটা নিয়ে আর কোন এগোবো না, নইলে আমি তো জানিস পুলিশের লোক, থানা থেকে পুলিশ ডেকে আনলে ব্যপারটা চাউর হয়ে যাবে, সেটা মনে হয় তোর বা আমাদের কারো সম্মানের জন্যই ভালো হবে না, বেশ দৃপ্ত কণ্ঠ্যে বলল আসিফ। আমরা সব্বাই খুব অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে একবার আসিফের দিকে আর একবার কবীরের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে একসময় খুব জোরে কেঁদে উঠলো কবীর। হ্যা, আমিই নিয়েছি বিজয়ের মানি ব্যাগ থেকে ৫০০ টাকার নোট দুটো, বলে কবীর। আর আমরা বিস্ময়ে হতবাক, নিজেদের দিকে দেখা দেখি করছি। ছোটবেলার বন্ধু কবীর আজ প্রায় ৩০ বছর পর সবার সঙ্গে দেখা, হয়তো অনেক পরিবরতনের মধ্যে দিয়ে আমাদের প্রত্যেকের জীবনের পথ একটু একটু করে আলাদা হয়ে গেছে, তবে এমন চুরি করার কি দরকার ছিল বুঝতে পারছিলাম না। ঘরের মৌনতা ভাঙল কবীর নিজেই। তোরা সব্বাই আমার ছোটবেলার বন্ধু, আজ অনেকদিন তোদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না, তাই আমার জীবনের বেঁচে থাকার লড়াই তোরা জানতে পারিস নি।বীমা করে যেটুকু টাকা উপার্জন করি তাতে সংসার চলে নারে। ভীষণ কষ্টের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে আমার জীবনসুযোগ পেয়ে ওই টাকা আমি নিয়েছিলাম, জানি ওই টুকু টাকায় আমার কষ্টের সুরাহা হবে না, তবুও ক্ষণিকের লোভ আমাকে ওই কাজ করিয়েছে। তুই কি এমন করে তোর কষ্টের সুরাহা করতে পারবি...জিজ্ঞাসা করে আসিফ। বিশ্বাস করতে পারছি না তোর মতো ছেলে এমন কাজ করতে পারে। তুই তো আমাদের কাছে খুলে বলতে পারতিস তোর সমস্যা। আমরা চেষ্টা করতাম যতটুকু করতে পারি। সেটা না করে কেন এমন কাজ করলি যা আমাদের সেই সম্পর্কে একটা কালির দাগ লাগিয়ে দিলো। আর সৃষ্টি করলো এক অবিস্বাসের বাতাবরণ। মাথা নিচু করে আসিফের কথা গুলো শুনছিল কবীরআসিফ বলে চলেছে, সময়ের স্রোতে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু ন্যুনতম মূল্যবোধ গুলো হারিয়ে যাবে রে? আজ আমরা সব্বাই এক জায়গায় এসে জড়ো হয়েছি সেই মূল্যবোধ ও আবেগ সম্বল করে। সেই জায়গায় তোর এমন আচরণ আমাকে ভীষণ ভাবে ব্যথিত করেছে। একটা নদী যেমন তার উৎস মুখে খরস্রোতা, সময়ের সঙ্গে তার গতি পথ নানা ভাবে পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু তার নিজস্বতা কি করে হারাবে? মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো, একরাশ ব্যথা নিয়ে দুর্গাপুর ছাড়ছি, আর কোনদিন দেখা হবে কিনা জানি না তবে ছেলেবেলার ভালোলাগা মুহূর্তগুলো যখনই মনে পরবে তখনই আজকের ঘটনাটা মনে মনে ব্যথিত করবে। তোরা আমাকে ঘেন্না করছিস দেখে আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে রে, আমি নিজের দোষ স্বীকার করে নিলেও এই কালি আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লেগে রইলো, তোরা ভালো থাকিস, আর পারলে এই কুলাঙ্গার বন্ধুকে ভুলে জাস, বলে কাঁদতে কাঁদতে ঘরের বাইরে বেড়িয়ে গেলো কবীর। বেশ কিছুক্ষণ সব্বাই স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম, কিছু পরে আসিফ জিজ্ঞাসা করলো কিরে খাওয়া দাওয়া করবি তো, ফিরতে হবে অনেক পথ। এমন ঘটনার ফলে দুপুরের ভোজন খুব ফ্যকাসে হয়ে গেলো। তার মধ্যেই পলাদির রান্না করা চিকেন কষা একটু যেন তৃপ্তি দিলো। খাওয়া শেষে আমাদের ফেরার পালা। আমার গাড়িতে ফেরার পথে আসিফ ছাড়াও অহনা বর্ধমান পর্যন্ত যাবে। শুভেচ্ছা বিনিময় করে গাড়িতে উঠে বসলাম। আমার পাশে অহনা, পেছনে আসিফ। গাড়ি চলতে শুরু করলো, কিছুক্ষনের মধ্যেই আসিফ ঘুমিয়ে পড়লো। অহনা চুপচাপ বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে। আমি বললাম, কিরে কি ভেবে এসেছিলি, আর কি নিয়ে ফিরছিস?
অহনা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর বলল, আগে তোর মুখে শুনি,  তারপর আমি বলবো।এই যাত্রায় আমার আসা একদম তোর জন্য। যেদিন শুনলাম একটা মিলনউৎসব হবে আর তুই ও আসবি সেদিনই ঠিক করেছিলাম আমি আসছি, বললাম। শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের সন্ধিক্ষণে তোর চোখের আরশিতে আমার পৌরুষের ছবি দেখেছিলাম। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, তবুও যেদিন থেকে তোর আর আমার মাঝে অভিভাবকদের নজর দেওয়াল তৈরি করেছিলো, সেদিন থেকে আমি অনুভব করতে শিখেছিলাম তুই নারী আর আমি পুরুষ। দুজনের মাঝে একটা সামাজিক প্রাচীর তৈরি করে দেওয়া হোল অভিভাবকদের নজর দিয়ে। তারপর থেকে দুজনেই লুকিয়ে একে অপরকে দেখেছি, অনুভব করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সাহস করে কাছে আসতে পারি নি। সেই না পাওয়ার ব্যথা আজও আমার মনের ভেতর একটা অন্ধকার জায়গা। হয়তো সেই অন্ধকারকে আলোর দিশা দেখানোর জন্য আমার এখানে আসা। জানি আমরা দুজনেই দুটো পরিবারের দায়িত্ব সামলাচ্ছি, তবুও একটা আকর্ষণ আমাকে নিয়ে এলো এতদূরে। অন্তত যে কথা টা গোপন ছিল, যেই অঙ্গীকার অপূর্ণ ছিল সেই কথা বা অঙ্গীকার ভুল না ঠিক সেটাকে যাচাই করা ছিল আমার আসার উদ্দেশ্য। গড়গড় করে কথা গুলো বললাম অহনাকে। দেখলাম ওর চোখ দুটো লাল, মুখটা কেমন উদাস, রাস্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কিরে কি দেখছিস, আর কি বা ভাবছিস তুই? দ্যাখ, প্রতি টা মানুষের চরিত্রে  একটা practical and emotional  সত্ত্বা আছে। দুটো বিপরিতধর্মী ,একে অপরের সঙ্গে সব সময়েই বিবাদমান। আমাদের প্রত্যেকের এই দুই বিপরতধর্মী সত্ত্বাকে নিয়ে চলতে হয়। আমি বলি  সুজন মাঝি আর মন মাঝি। সুজন হোল যুক্তিবাদী সত্ত্বা, আর মন অনুভূতি প্রবণ। সামাজিক জীবনের কর্তব্য পালন, ন্যায় অন্যায় বিচার বোধ, সমস্যা তার সমাধান, বাস্তব জীবনের সব ধরনের সাফল্য বা ব্যর্থতার নায়ক হোল সুজন। জীবনের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার বহিঃপ্রকাশ, মান অভিমান রাগ অনুরাগ মনের জন্য। এই দুই সত্ত্বাকে যেই মানুষ সুন্দর ভাবে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারে সেই সুন্দর সফল পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপন করে, বললাম আমি। তুমি কি সুন্দর সফল পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপন করছ? জিজ্ঞাসা করলো অহনা। আংশিক সত্যি, বললাম। সামাজিক জীবনে আমি একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ, পারিবারিক জীবন আছে, তবে তার মধ্যে যেই বেসুরো আওয়াজ রয়েছে সেটা সমাজের কানে পৌছয় না। কারণ আমি আমার সামাজিক সম্মান কে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। এই ক্ষেত্রে সুজন মাঝির প্রাধান্য, মনের থেকে দিতেই হয়, নইলে ওই যে বললাম সামাজিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয়। যেটা পাই নি সেটার জন্য দুঃখ হয় কিন্তু দুঃখের বাড়াবাড়ি হওয়ার আগেই সুজন মনের ওপর নিয়ন্ত্রন নিয়ে ফেলে বুঝলি। যেমন আজ তোর সঙ্গে দেখা করার জন্য আমার আসা, মনের কথা শুনে কথা বলতে বলতে হথাৎ অহনা চিৎকার করে উঠলো…”আরে দাড়া দাড়া রজতদা, বর্ধমানের সীমানা ছেড়ে চলে যাচ্ছিস যে রজত একটু এগিয়ে  রাস্তার ধারে এসে গাড়ি থামালঅহনা নেমে যাবি? চল আমাদের সাথেহাসতে হাসতে বলল রজত
এদিকে হথাৎ ব্রেক করার ফলে আসিফ জেগে উঠেছে পেছনের সীটে সামনে চলে আয় রে আসিফ, বলল রজত অহনা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো আসিফ এসে বসলো রজতের পাশে অহনা ঘুরে এলো রজতের দিকে, রজতের হাত তা একবার স্পর্শ করল, বলল ভালো থাকিস রজতদা, আমি আসছি, আসছে বছর আবার দেখা হবে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যেই গাড়ি চালাতে শুরু করলো রজত লম্বা একটা হাই তুলে আসিফ জিজ্ঞাসা করলোকিরে ছোটবেলার প্রেম ঝালিয়ে নিলি বুঝি
তা অহনার নাম্বার তা নিয়েছিস তো, চিন্তার কি আছে, বি কানেক্টেড, ভাবিস না রে আবার প্রেম নতুন করে শুরু হবে……হাসতে হাসতে বলল আসিফ আসিফের কথায় রজতের হথাৎ খেয়াল হল কথায় কথায় বর্ধমান চলে এলো, অহনা নেমে পড়লো, ওঁর ফোন নাম্বার নেওয়া হল না না রে আসিফ, নাম্বার নিতে ভুলে গেছি, বলল রজত ধুর ধুর নাম্বার পাওয়া কি আর কঠিন কাজ বুঝি পলাদি বা যে কোন কারো কাছেই পেয়ে যাবি, আসিফ বললখানিক আনমনা হয়েই গাড়ি চালাতে চালাতে শাক্তিগড় এলো আসিফ বলল চল একটু চা খেয়ে নি, ঘুমটা কেটে যাবে চা খেয়ে গাড়ি চলল কলকাতার দিকে, দূর আকাশে নীলের গভীরতা, চারিদিকে সবুজের বন্যা তবু মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে আছে নাহ এতা কি ঠিক হল, মনে প্রশ্ন এলো, নিজের সংযমের জায়গাটা কি শিথিল হয়ে পড়ছে না আসিফের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলো রজত, অহনার রেশ কাতানর জন্য আসিফের সংসার, ছেলেদের ভবিষ্যতের চিন্তা, নানা কথা সুনতে সুনতে কলকাতা পউছে গেলো আসিফ কে নামিয়ে বাড়ি পৌঁছল গাড়ি পার্ক করে বাড়ি ধুকে ফ্রেশ হল রাধুদা এক কাপ চা দিল সেই চায়ের কাপ নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলো একটা বেতের চেয়ার এ বিকেলের শেষ আলোর আভা আকাশে, কয়েক টুকরো মেঘ সেই আভায় লুটোপুটি খাচ্ছে, কি সুন্দর লাগছে ওই সাদা মেঘের দলকে। মনে পরে ছোটবেলায় মেঘের উড়ে যাওয়া কতো গভীরভাবে লক্ষ্য করতাম, বিশ্ময় হতো, মনে হতো যাই উড়ে ওদের কাছে। কতো স্বপ্ন ছিল মেঘের স্পর্শ পাওয়ার।চেরাপুঞ্জি ভ্রমণের সময় সেই মেঘের স্পর্শ পাব বলে আলাদা উত্তেজনা ছিল মনে। কিন্তু মেঘের স্পর্শ যখন পেলাম কোন শিহরণ বা অনুভূতি আমাকে স্পর্শ করলো না। মেঘ নিয়ে স্বপ্ন আমার সেই শেষ। আজ আর মেঘ আমাকে বিশেষ কোন অনুভূতি দেয় না। হয়তো একইরকম ভাবেই অহনা দূরে আছে বলে আমার ভাললাগার স্বপ্নটা এখনো সুন্দরভাবে রয়ে গেছে মনে। কাছে এলে মেঘের মতোই শেষ হয়ে যেতো ভাললাগার অনুভূতি। থাক, অহনার নাম্বার আর নেবো না কারো থেকে। এই যে দূরে থেকে অহনার ঘ্রান পাচ্ছি, একটা ভালোলাগা ছড়িয়ে আছে মনে, এতেই বেঁচে থাক অহনাচা শেষ হতে হতে অন্ধকার নেমে এলো। ঘরে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো রজত, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই, রাধুদা রাতের খাবারের জন্য ডাকতেই ঘুম ভাঙ্গল। সকালের ফ্লাইট, চটপট ডিনার সেরে ঘুম। অহনার কথা থাক না শুধু মনের ভেতর, যেখানে কারো প্রবেশের অধিকার নেই, কোন আইন বা কোন সমাজের কানুন বিরক্ত করতে পারবে না, শুধু সেখানেই, নীরবে, নিভৃতে দূরে বহুদূরে শরীরের নাগালের বাইরে মেঘের মতোই
                                                            
                                                                 সমাপ্ত

কবিতা / নগ্ন দেহ / প্রজ্ঞা পারমিতা

নগ্ন দেহ
তাতেই লেপা থাকে সংসারের দারিদ্র;
রাশি রাশি অর্থ লাগি
রং আর হাসি ঠোঁটে গুঁজে ,
দিনের পর দিন শরীরের তল্লাশি করায় মাতাল নেশারুদের দিয়ে।
মল্লার হয়ে বর্ষে অশ্রু গোপনে অন্তঃকরণে।
ব্রহ্মান্ডের  এক কোণে
বাস করে  শুকনো নৈবদ্যির মতো ,
ধুলোবালিতে গড়াগড়ি যায় নারীত্ব।
অভিশাপের যন্ত্রণা অসহনীয়
অসহায়তা মোড়া শরীরের খাঁজে খাঁজে পড়ে নখের আঁচড়।
দানবের থেকে নিষ্কৃতি দেবে কে ?
ফেলে যাওয়া  মালা কুড়ানির মতো বুকে আগলে, সে  রয়ে যায়।
নির্ভরের ঠিকানাটা কোথায় উধাও
লেফাফা বন্দী ইচ্ছেগুলো গুমরে মরে হৃদয়ের কোণে।
নগ্ন দেহে দাঁড়ায় সম্মুখে
তুষ্ট করে পুরুষের লিপ্সা ;
অনেকগুলো পেটের ক্ষুধা নিবারণের কিছুটা দেবে লোকটা।
তেত্রিশ কোটি দেব দেবীর মুষ্টিমেয় ঝোলে দেয়ালে
দেয়াল থেকে তারা  হাসে সানন্দে। 
এক নারী,
দেহকে বিকোয় অনিচ্ছার আড়ালে।

Photography by Santanu Bose

UNDERWATER






সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া