Saturday, November 25, 2017

কবিতা / ফেরিওয়ালা / দেবাশীষ সেন



চলো যাই সমুদ্র স্নানে -
নোনা জলে, নোনতা দুঃখ ধোবো
তারপর ভেজা বালুচরে
সুখ খুঁজে খুঁজে ঝিনুক কুড়োবো।

তুমি বুঝি পাহাড় ভালোবাসো!
রডডেনড্রেনের গুচ্ছ ছোঁবে?
উচ্ছ্বল কোন ঝর্ণার পাশে  
প্রজাপতি খুঁজে বেড়াবে।

চলো যাই মরুভূমির প্রান্তরে
ধূধূ বালিয়াড়ি পেরিয়ে মরুদ্যানে
একফালি সবুজ জীবন
মুঠো ভরে মরীচিকা লুটি দুজনে।

তুমি জঙ্গলে যেতে চাও?
রাতে বনবাংলোর কাঠের বারান্দায় আরামকেদারায় বসে,
ধূমায়িত কফি হাতে দুজনে -
জোনাকির আলোয় দেখবো আকাশ থেকে তারা পড়ছে খসে।

কত স্বপ্ন এমনি আঁকা আনমনে
জ্যোৎস্না ঢলানো চাঁদনি রাতে,
মেঠো আলপথ ধরে হাঁটছি দুজনে
দিকশুন্যপুরের দিকে, হাত রেখে হাতে।





বেয়াক্কেলে অন্যমনস্কতা / অর্পিতা ভট্টাচার্য



আমরা অনেকেই হয়তো অন্যমনস্ক হয়ে অনেক ভুল করে ফেলি। আমরা যখন একটা কাজ করতে করতে অন্য কথা ভাবি , তখন আমরা অনেক সময়, এমন অনেক কাজ করে ফেলি, যেটা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। সেটা কখনো বা মজার কখনো বা লজ্জার। আমি যখন রাস্তায় কোনো কাজে থাকি , এতোটাই অন্যমনস্ক থাকি যে , অনেক সময় অনেক চেনা মানুষ কে দেখেও হয়তো খেয়ালই করিনা। এর জন্য অনেকে আমায় অহংকারী, অভদ্র ভাবতেই পারে । এটা তাদের দোষ নয় , দোষ টা আমার। কখনও বা সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ কে কারো সাথে গুলিয়ে অকারণ আন্তরিক ভাবে কথা বলতে শুরু করি। সেই মানুষটির অবস্থা ভাবো তো কেমন হয়। এসব অদ্ভুত ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এ হেন আমি একদিন এমন এক কান্ড ঘটিয়েছিলাম যেটা কেউ করতে পারবে না , এটা আমি নিশ্চিত। প্রায়ই অদ্ভুত ঘটনা ঘটাই , তাবলে এতোটা ? এতদিন পরে আজও মনে পরলে যেমন হাসি পায়, তেমন লজ্জা করে। একদিন সারাদিনের কাজকর্ম সেরে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরছিলাম বাসে করে, খুব ঘুম পাচ্ছিল, ভীষন ক্ষিদেও পেয়েছিল। বাস টার্মিনাল থেকে উঠেছিলাম বলে ফাঁকা বাসে পছন্দ মতো জানলার পাশের সিটে বসে , একটু পরে ঘুমিয়ে পড়লাম। এর মধ্যে বাসে বেশ ভিড় হয়ে গেছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি , আমার পাশে বসে একজন বাদাম খাচ্ছে। আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিলাম, আমার পাশের মানুষটি অনেকক্ষণ ধরে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে ফুঁ দিয়ে পরিস্কার করে মুখে যেই দিতে যাবেন, আমি হঠাৎ হাত বাড়িয়ে তার হাত থেকে বাদাম তুলে নিলাম। তিনি এতোটাই অবাক হয়েছিলেন যে মুখ হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। এক মূহুর্তে আমি অনুভব করি কি করেছি । লজ্জায় আমার তখন মরে যাওয়ার মতো অবস্থা। তাড়াতাড়ি বাদামগুলো ফিরিয়ে দিতে যাই। উনি বলে ওঠেন অদ্ভুত ভাবে " না না ঠিক আছে , খান খান " । আর আমি কি করব বুঝতে না পেরে তাড়াতাড়ি বাদামগুলো ভদ্রলোকের হাতে দিয়ে উঠে পরি , আমার স্টপেজের অনেক আগে বাস থেকে নেমে পরি। ভাবতে থাকি সম্পূর্ণ পারিপার্শ্বিক অবস্থা ভুলে এ আমি কি করলাম।মুখ লাল হয়ে গেছে তখন লজ্জায়।আজও ঘটনাটা মনে পরলে যেমন হাসি পায়, তেমনি লজ্জা করে। আর সেই মানুষটিও নিশ্চিত এই ঘটনাটা ভুলতে পারেননি। কারণ এমন অদ্ভুত অন্যমনস্ক মানুষ বোধহয় সে জীবনে কখনো দেখেনি । 

বংশীলাল / নারায়ণ রায়।




সে অনেকদিন আগের কথা। ষাটের দশকের মাঝামাঝি কোন এক বছরে দুর্গাপুজোর শেষ,
আবার কালী পুজো শুরু হতে এখনো কয়েকদিন বাকী। সেই সময়ে একদিন আমি আর আমার
স্কুলের সহপাঠী বন্ধু বাপ্পা, ছুটির এই কটা দিন কি কি দুষ্টমি করে কাটানো
যায়, তাই ভাবছি। এমন সময়ে বাপ্পা বললে, "চল যাই, তুই আর আমি দুজনে আমার
মামার বাড়ি গিরিডিতে ঘুরে আসি ক'দিন।" আমিতো অবাক! বললাম, " বাহ! গিরিডি
যেতে পারলে তো ভীষণ মজা হবে, কিন্তু তা কি করে সম্ভব ? অত দূরে তোর
সঙ্গে আমার বাবা মা আমাকে ছাড়বে কেন? আর তোর বাড়ি থেকে কি তোকে একা
ছাড়বে?" বাপ্পা বললো, সে নাকি গত দু-তিন বছর ধরে একাই গিরিডি যায়। আমি যে
সময়ের কথা বলছি তখন একজন সতেরো কিম্বা আঠারো বছরের ছেলের এখনকার ছেলেদের
মত এতটা স্বাধীনতা ছিল না।


যাই হোক বাপ্পার বাবা বাণেশ্বর কাকু আমার বাবার বিশেষ বন্ধু ছিলেন, তাই
তাঁর পক্ষে আমার বাবাকে রাজী করাতে বিশেষ দেরী হল না। অবশ্য বাপ্পার
মামার বাড়িতে এখন আর তেমন কেউ থাকে না। ওর বড় মামা তার দাদুর অর্থাৎ
বাপ্পার প্রমাতামহ'র তৈরী ওদের তিন পুরুষের ওই গিরিডির বাড়িটা দেখাশোনা
করতেন। সেই মামা মারা গেছেন কয়েক বছর আগে, মামাতো দাদারা সবাই জীবিকার
সন্ধানে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বাপ্পার বড় মামীমা এখনও সেই বাড়ি ঘর
সম্পত্তি সব আগলে রেখেছেন। আমি কখনও কলকাতার বাইরে অতদুরে কোনদিন যাইনি।
আর বাবা-মাকে ছেড়ে একা যাওয়া্র তো কোন প্রশ্নই ওঠে না।


সেই যুগে মোবাইল ফোন দুরের কথা, আমরা যে এলাকায় থাকতাম সেই পাড়ায় ল্যান্ড
লাইন ফোনও আমাদের গোটা পাড়াতে একজনেরও ছিল না। বাপ্পা বলল, "মামীমাকে
চিঠি দিয়ে, তার উত্তর পেতে পেতেই দশ বারোদিন কেটে যাবে, তার চেয়ে চল হটাৎ
গিয়ে মামীমাকে সারপ্রাইজ দেবো।" যথারীতি অক্টোবর মাসের শেষ দিকে এক
রবিবার দুপুর নাগাদ হাওড়া স্টেশনের আট নং প্লাটফর্ম থেকে ছাড়লো আমাদের
ট্রেন। কয়লায় চলা বিশাল কানাডিয়ান স্টিম ইঞ্জিনের এক্সপ্রেস ট্রেন। সেই
সময়ে ট্রেনের তিনটে ক্লাশ ছিল। ফার্স্ট, সেকেন্ড আর থার্ড ক্লাশ। আমরা
অবশ্যই থার্ড ক্লাশের যাত্রী ছিলাম। নামেই এক্সপ্রেস ট্রেন, বসার জন্য
খুবই সাধারণ মানের কাঠের আসন। তবে ট্রেনে তেমন ভিড় না থাকায় আমরা দুজন
জানালার ধারে দুটো মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম। ট্রেনে জানালার ধারে বসার
জায়গা পাওয়ার আনন্দই আলাদা। আবার জানালার ধারে বসার বিড়ম্বনাও ছিল
যথেষ্ট, প্রতি মুহুর্তে কয়লার গুঁড়ো উড়ে এসে চোখে পড়ার ভয়। তবুও সেই বয়সে
জীবনে প্রথম কারও শাসন ছাড়া একা বন্ধুর সঙ্গে দূর ভ্রমণ। তাই এক অব্যক্ত
আনন্দে কয়লার গূড়োর মত তুচ্ছ জিনিসকে উপেক্ষা করে দুজনে গল্প করতে করতে
যাত্রা শুরু করলাম। তবে সঠিক সময়ে ছাড়লেও প্রথম থেকেই ট্রেনটি মাঝে মাঝেই
কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ছিল।


অবশ্য সে কারনে আমার বিদেশ ভ্রমণের আনন্দের কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। বরং আমি এই
মন্থর যাত্রাটাকে বেশ উপভোগই করছিলাম। এই ভাবে ট্রেনটি থামতে থামতে
ব্যান্ডেল, বর্ধমান, দুর্গাপুর পার হয়ে আসানসোল পৌঁছুতেই বেলা পাঁচটা,
মানে বেশ সন্ধ্যে হয়ে গেল। আমার তো ভারি মজা। বাড়ি থেকে বেরনোর সময়ে বাবা
আমাকে কুড়িটা টাকা দিয়েছিল, আর মা আমাদের দুজনের মত লুচি হালুয়া আর
নারকোলের নাড়ু বেঁধে দিয়েছিল সঙ্গে। আমি আর বাপ্পা সেগুলির সদব্যবহার
করতে শুরু করলাম। তবে আসানসোলের পরে গাড়ি আর যেন এগোতেই চায় না। একটা
ছোট্ট অজানা স্টেশনে ট্রেনটা সেই যে দাঁড়ালো আর নড়াচড়ার যেন কোন লক্ষণই
নেই। স্টেশনটিতে কোন উঁচু প্লাটফর্ম নেই। প্রত্যেকটা কামরার নীচে কাঠের
সিঁড়ি দিয়ে মানুষ জন উঠছে, নামছে।


এইসব স্টীম ইঞ্জিনের গাড়ি এক জায়গায় বেশিক্ষন দাঁড়ালে আস্তে আস্তে বগির
ডাইনামোর চার্জ যত কমতে থাকে গাড়ির আলোর তেজও ততই কমতে থাকে। একটা নির্জন
স্টেশনে আধো-অন্ধকারে এই ভাবে বেশ কিছুক্ষন থাকার পর আমার কেমন যেন ভয় ভয়
করতে লাগল। এইসব ছোট খাটো স্টেশনে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। প্লাটফর্মে মাত্র
সাত-আট ফুট উঁচু কয়েকটা লোহার খুঁটির উপর কাঁচের বাক্স মত করা আর তার ভিতরে
কেরসিনের আলোয় চারিদিকে আবছা, যেটুকু যা দেখা যায়। বেলা পাঁচটা নাগাদ
যেখানে ট্রেনটার মধুপুরে পৌছোনর কথা সেখানে বেলা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এই
ছোট্ট স্টেশনে দাঁড়িয়েই আছে।


এমন সময়ে লক্ষ্য করলাম আমাদের কামরা থেকে একজন বেশ লম্বা চওড়া ব্যক্তি
প্লাটফর্মে নেমে একটি আলোর নীচে দাঁড়ালো। বাপ্পা লোকটিকে দেখেই এক গাল
হেসে "আরে ও বংশীদা, বংশীদা ......" বলে চিৎকার করতে লাগলো। লোকটা যেন
সেকথা শুনতেই পেল না। এক বারের জন্যও আমাদের দিকে না তাকিয়ে জয় সিয়ারাম
জয় সিয়ারাম বলতে বলতে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের বাইরে কোথায় যেন
অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। লোকটার পরনে খাটো ধুতির উপরে অদ্ভুত একটা ঢল্লা মত
জামা। আর মাথায় পশ্চিমের লোকেদের মত কান ঢাকা পাগড়ি থাকার জন্য লোকটার
মুখটা ভাল করে দেখতেই পেলাম না।


বাপ্পা তাড়াতাড়ি ট্রেন থেকে নেমে লোকটার দিকে দৌড়তে যাবে এমন সময় এতক্ষন
ধরে অচল পাহাড় হয়ে স্থবির থাকা আমাদের ট্রেনটি একটি লম্বা টানা হুইসেল
দিয়ে নড়ে উঠল। ট্রেন চলতে শুরু করতেই আমি বাপ্পার হাত ধরে টেনে কামরার
ভিতরে ঢুকিয়ে নিলাম। আমাদের আসনে বসেই আমি বাপ্পাকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুই
চিনিস ওকে...?" উত্তরে বাপ্পা বলল,"আরে, ও তো বংশীলাল।" তবে একটা বিষয়ে
দুজনে খুবই অবাক হলাম সেটা হচ্ছে লোকটি এতক্ষন আমাদের কামরাতেই ছিল।
কামরাতে তেমন কিছু ভিড়ও নেই অথচ ও আমাদের কারও নজরে পড়ল না কেন? আমি
জিজ্ঞেস করি, "বংশীলাল আবার কে?" বাপ্পা খুব ছোট্ট বয়সে ওর দাদুর কাছে
শুনেছে, দাদুর বাবা অর্থাৎ বাপ্পার প্রমাতামহ নিবারণচন্দ্র সরকার ছিলেন
বিশেষ ধার্মিক লোক। ভারতের এমন কোন তীর্থস্থান নেই যেখানে নিবারণচন্দ্র
যাননি। আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই নিবারণবাবুই একবার কুম্ভমেলায়
পিতা মাতা বিচ্ছিন্ন এই বংশীলালকে কুড়িয়ে পান। তখন তার বয়স মাত্র আট-দশ
বছর। তারপর তাকে এই গিরিডিতে নিয়ে এসে নিজ-সন্তান তুল্য মানুষ করেন। পরে
বংশীলালের বিবাহ দিয়ে নিজের বাড়ির কাছাকাছি কিছুটা জমির উপর একটা ছোট্ট
ঘর করে দেন এবং বংশীলালও গিরিডিতে বাপ্পার মামার বাড়ির পরিবারের তিন
পুরুষ ধরে দেখভাল করতে করতে কখন যেন তাদের সংসারেরই একজন হয়ে ওঠে।


হাওড়া থেকে ট্রেনটি ছাড়ার পর থেকেই অনেক ভুগিয়ে অবশেষে আমাদের এক্সপ্রেস
ট্রেন এতক্ষনে এক্সপ্রেসের মতই দৌড়তে আরম্ভ করল এবং নির্ধারিত সময়ের
প্রায় দুঘন্টা পরে সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ মধুপুরে পৌঁছালো। ট্রেন থেকে নেমে
বেশ শীত শীত করতে লাগল। কলকাতায় এখন বেশ গরম কিন্তু বিহারের (এখন
ঝাড়খন্ড) এইসব জায়গায় এই অক্টোবরের শেষে আবহাওয়া বড়ই মনোরম। মধুপুর
স্টেশনে বিদ্যুৎ আছে তবে অতি সাধারণ কয়েকটা বাল্ব প্লাটফর্মে টিম টিম করে
জ্বলছে। মধুপুরে ট্রেন পালটে গিরিডির ট্রেনে উঠতে হবে। পাশের প্লাটফর্মে
দাঁড়িয়ে আছে গিরিডির ট্রেন। আমরা যেই সেই ট্রেনে উঠতে যাবো, বাপ্পা হঠাৎ
থমকে গিয়ে, "আরে ও বংশীদা ... বংশীদা......" বলে চিৎকার করতে লাগলো। অমনি
ঘাড় ঘুরিয়ে আমি দেখি আগের স্টেশনে দেখা সেই লোকটা...। পরনে খাটো ধুতির
উপর অদ্ভুত একটা ঢল্লা মত জামা। আর মাথায় পশ্চিমের লোকেদের মত কান ঢাকা
দেওয়া পাগড়ি। চক্ষের নিমেষে লোকটা দ্রুত জয় সিয়ারাম জয় সিয়ারাম বলতে বলতে
কোথায় যেন এক আধো অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
গিরিডির ট্রেনটি আমাদের এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল তাই
ট্রেনে ওঠার এক দুই মিনিটের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিল।


তবে পর পর দুবার ঐ লোকটিকে অমন অলৌকিক ভাবে দেখে বাপ্পা যেন কেমন ভীত ও
বিমর্ষ হয়ে গেল। আমাকে বলল, "জানিস, আমি নিশ্চিত জানি ও বংশীলাল। সেই
চেহারা, সেই পোষাক আর ঠিক তেমনই কথায় কথায় জয় সিয়ারাম বলা। অথচ ও আমাকে
চিনতে পারছে কেন, সেটাই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। বংশীদা আমাকে অসম্ভব
ভালবাসে। আমি গিরিডি আসবো শুনলেই ও আমাকে নিতে মধুপুর পর্যন্ত চলে আসে।
আসার আগে, আমি গিয়ে খাব বলে দাদুর বাগানের গিরিডির বিখ্যাত সেরা পেয়ারা
আর আতাগুলো আমার জন্য পেড়ে রেখে দেয়। পুকুরের মাছ ধরে রান্না করে রেখে
দেয়। আর গিরিডির সবচেয়ে সেরা দোকানের প্যাঁড়া একদম অর্ডার দিয়ে তৈরী করে
রাখে। কিন্তু এবার তো আমি মামিমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে কোন খবর না দিয়েই
যাচ্ছি, তাহলে বংশীদা জানবে কি করে যে আমরা গিরিডি যাচ্ছি। তাছাড়া বংশীদা
আমাকে চিনতে পারছে না কেন?"


মধুপুর থেকে গিরিডি মাত্র ঘন্টাখানেকের রাস্তা। আমাদের গল্প শেষ হওয়ার
আগেই দেখলাম ট্রেন গিরিডি স্টেশনে ঢুকছে। এই ট্রেন আর যাবে না, আবার
মধুপুর ফিরে যাবে, তাই সব যাত্রী এখানেই নেমে যাওয়ার ফলে ট্রেন খালি হয়ে
গেল। সবাই প্রায় স্থানীয় লোক। খুব বেশী হলে পঞ্চাশ-ষাট জন যাত্রী হবে,
তারা ট্রেন থেকে নেমেই হাঁটা শুরু করলো। এইসব এলাকায় রাত্রি আটটা মানে
অনেক রাত।


মিনিট দশেকের মধ্যে গোটা স্টেশন চত্তর ফাঁকা হয়ে গেল। স্টেশন থেকে বেরিয়ে
আমরাই শুধু দাঁড়িয়ে আছি একট রিক্সা বা টম টমের জন্য। হটাৎ একটু দূরে নজর
পড়তেই আমরা দুজনে আবার চমকে উঠলাম। একটা ইলেক্ট্রিক পোষ্টের নীচে আবছা
আলোয় একজন মাত্র রিক্সাওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে, আর সেই অদ্ভুত পোশাক পরা লোকটা
তাকে কি যেন বলে চলেছে। বাপ্পা আবার বংশীদা বংশীদা বলে চিৎকার করে ডাকতেই
লোকটি জয় সিয়ারাম জয় সিয়ারাম বলে অদৃশ্য হয়ে গেল। এবার সত্যি সত্যিই আমরা
দুজনে খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর চলবে না
তাই ঐ রিক্সাওয়ালা টাকে ডাকতে যাবো, এমন সময় আমাদেরকে আরও আশ্চর্য করে
দিয়ে আমরা না ডাকতেই রিক্সাওয়ালাটি নিজেই আমাদের কাছে এসে, "উঠিয়ে
বাবুজি, আপলোক তো কাছারীপাড়া সরকার ভিলা যানেওয়ালা হায় না?" বলে দাঁড়িয়ে
গেল।
নিতান্তই ভয়ে ভয়ে দুজনে উঠলাম রিক্সাটায়, তবে রিক্সাওয়ালাটা ভারী মজার
লোক ছিল, তাই মুহুর্তের মধ্যেই আমাদের ভয় কিছুটা হলেও উধাও। প্যাডেলের
তালে তালে ... জী আপনা দিল, তু আওয়ারা... গাইতে গাইতে মাত্র আট-দশ
মিনিটের মধ্যে বাপ্পার মামার বাড়ির সামনে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু
রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া মেটাতে গিয়ে আমরা আবার অবাক। রিক্সাওয়ালা "আপকা ভাড়া
বনশীলালজী মিটা দিয়া" বলে রিক্সা ঘুরিয়ে নিয়ে জি আপনা দিল... গাইতে গাইতে
অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।


আবছা অন্ধকারে রিক্সা থেকে নেমে মামাবাড়ির সদর দরজা পর্জন্ত যেতে যেতে
বাপ্পা বলল, "দেখলি তো? আমি বললাম না ও বংশীদা না হয়ে যায় না! আসলে ও আজ
কোন কাজে নিশ্চই আসানসোল গেছিল আর সেখানে আমাদের দেখতে পেয়ে ও আমাদেরকে
সারপ্রাইজ দেবে বলে এতক্ষন আমাদের সঙ্গে নাটক করছিল।" বাপ্পার মুখে একথা
শুনে আমি বললাম, "তার মানে তুই বলতে চাইছিস আগে থেকে খবর না দিয়ে এসে
মামীমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে আসতে গিয়ে উল্টে আমরাই সার প্রাইজড হয়ে
গেলাম? হা হা হা।"



যাইহোক এতক্ষনের একটা ভয়ের বাতাবরণ থেকে মুক্তি পেয়ে বাপ্পার মামার বাড়ির
কড়া নাড়া দিতেই মামীমা নিজেই দরজা খুলে আমাদের দুই মুর্তিমানকে দেখে
একেবারে আক্ষরিক অর্থেই অবাক। যাই হোক আমরা বাড়ি থেকে পালিয়ে আসিনি,
নিতান্তই মামীমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য যে এই ভাবে না জানিয়ে আসা সেটা
নিশ্চিন্ত হয়ে আমাদের প্রতি তার প্রাথমিক অভ্যর্থনা শেষ হতেই বললেন,
"তাহলে বংশীর কথাই ঠিক হল।" এ কথা শুনে আমরা দুজনে অবাক হয়ে শুধাই,
"বংশীদা তোমাকে কি বলেছে মামীমা?"



উত্তরে মামীমা বললেন, "আরে ওই পাগলটা নাকি স্বপ্ন দেখেছে যে আজ ওর বাপ্পা
দাদাবাবু আসবেই, আর সেই জন্যই সকালে থেকে এক মুহুর্তের জন্য নিজের বাড়িতে
পর্যন্ত যায়নি। সারাদিন ধরে গাছের পাকা আতা, পেয়ারা পেড়ে রেখেছে। এই তো
বিকেলে পুকুরে মাছ ধরল। আর তোরা ঢুকছিস দেখেই রান্না ঘরে গিয়ে তোদের জন্য
টিফিন করতে গেল। আমি আর কিছু বললাম না, আসলে এই বাড়িতে আমার চেয়ে তো ওরই
অধিকার বেশি।" এ কথা বলে মামীমা জোরে জোরে হেসে উঠলেন। আমি আর বাপ্পা
সমস্বরে মামিমাকে জিজ্ঞেস করলাম, "বংশীদা কি আজ একবারের জন্যও বাড়ির
বাইরে যায়নি?"



"না না ও তো সারাদিন আমার চোখের সামনেই রয়েছে," বলে উঠলেন মামীমা।
আর তখনই, বংশীদা দুই হাতে দুই প্লেট মিষ্টি হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলো আর
আমাদের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল, " খা লিজিয়ে বাপ্পা ভাইয়া, আপ ভি খা
লিজিয়ে।" তারপর মামীমার দিকে তাকিয়ে বলল, " হাম বোলা থা না মাইজি, আজ
বাপ্পা ভাইয়া জরুর আয়েগা। আধি রাত কি স্বপ্না কভি ঝুটা নাহি হোতা, হা হা
হা।"

Friday, November 24, 2017

কবিতা / ছায়ার সাথে ছুটছি / পিনাকী দত্ত গুপ্ত



ভাবলে দেখো, অনেক কথাই পড়ছে মনে -
টিনের চালে বাদ্যি বাজায় টাপুর টুপুর,
ছলাৎ ছলাৎ চপ্পলে এক হাঁটু জলে
নাক উঁচিয়ে উচ্চস্বরে ডাকছে কুকুর।

ঠিক তখনি ঢং ঢং ঢং ঘন্টা বাজে,
আর্মেনিয়াম চার্চে ঘড়ি ঠিক বারোটা,
বৌটা বাজায় খামখেয়ালি হার্মোনিয়াম,
যাত্রা দলের সঙ কেড়েছে রাত্রি গোটা!

ঠিক তখনই, নাড়ছি কড়া ক্লান্ত শরীর;
আলতো ক'রে ছিটকিনিটা খুলছো তুমি!
দেখছি তেলের  লম্ফ  জ্বলে গেরস্থলির,
দেখছি ভাঙা সান-বাধানো জন্মভূমি।

দেখছি ভাঙা ইঁটের পাঁজর পড়ছে খসে,
টাটকা দোষে দোসর দেওয়াল খামখেয়ালি;
গরাদ ভাঙা জানলা দিয়ে মুখচোরা চাঁদ,
কপাল পোড়া চোখের কোনে জমছে কালি।

এখন আমার অল্টো ছোটে বাতাস কেটে,
বুকের আঁচল প্রায় খসে যায় শ্যাম-দুলালী,
খানসামা'রা হালকা আলোয় বোতাম এঁটে
সুরায় ঢালে নীল-ছবি আর চোখের বালি।

এমনি করেই স্বপ্নগুলোর মৃত্যু হলে -
ডাইনি নাচে আস্তাবলের অন্ধকারে।
এমনি করেই লাগলে গ্রহন মেঘের কোলে,
শয়তানেরা কান পাতে এই রুদ্ধদ্বারে।

কেউ জানেনা, মুখটা আমার বদলে গেছে,
কেউ মানেনা, ঘুন ধরেছে আমার মনে;
কেউ বোঝেনা পিশাচ আমায় ভর করেছে,
কেউ দেখেনা, জিভটা আমার অলুক্ষুনে।

ভাবলে দেখো, রামতিওয়ারি ডিপ্রেশনে,
খাবলে মেখো, চাঁদের আলো কি মৌসুমি;
মধ্যরাতের পিটুইটারি সিক্রেশনে
শুনতে কি পাও - কাঁদছে তোমার জন্মভূমি?



কবিতা / স্মৃতির জলসাঘর / গৌতম সেন



একটা মিশ্ররাগের সকাল
কম্পিউটারে বাজছে গান -
বাছা বাছা, নিজের অতি পছন্দের।

চেতনার বৈঠকখানা ঘরে
বসেছে স্মৃতির স্মরণ সভা।
তোমার আমার একসাথে চলা
সোনালী সে  আভা হলই বা ক্ষয়াটে মলিন।
মগজের মঞ্চে গানের অনুরণন
    জীবন কত্থকের বাজে ব্যস্ত ঘুঙুর।

মেতে উঠি শীতঘুম ভেঙ্গে
তন্দ্রাতুর অতীত জেগে ওঠে।
সুর বাজে কানে চিরচেনা গানে
ভালবাসার চৈতি, ঝুলা, ঠুংরি, দাদরা
         পরিচিত পুরোনো সে ঠিকানা।


অনু গল্প / ছোঁয়াচ / সুজয় চক্রবর্তী



সরমার আর্থারাইটিসের ব্যামো। চল্লিশ বছর ধরে। ইদানীং সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারেন না। ব্যথায় ছটফট করেন দিনরাত। হাত ধরে ধরে সিঁড়ি টপকান। নামেনও একইভাবে।
ডাক্তার রেস্ট নিতে বলেছেন কিছুদিন। কোনও রকমে রান্নাটা সরমা করলেও বাসন মেজে দেন দিলীপবাবু ! যদিও তিনিও বার্ধক্যজনিত অসুখে জর্জরিত।
একমাত্র ছেলে অপু ব্যাঙ্গালোরে। একটা তথ্য প্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করে। বাড়িতে সরমা আর দিলীপবাবু। বিয়ে দেওয়ার বয়স হলেও ছেলে এখনই বিয়েতে রাজি নয়। সে আরেকটু গুছিয়ে নিতে চায়।
সব সময়ের জন্য একটা কাজের লোকের বড় দরকার সরমাদের। কিন্তু এ পোড়া তল্লাটে কাজের লোকের দেখা পাওয়া মানে ভগবানের দেখা পাওয়া। খোঁজ করেও যখন পেলেন না, সেদিন বিকেলবেলায় হালদার পাড়ার তহমিনার মা এসে হাজির। সে কাজ করতে চায়। দেরি না করে সরমা, দিলীপবাবুও রাজি হয়ে গেলেন।
কাল বিকেলে পাশের বাড়ির গোবিন্দর মা এসেছিল সরমাদের বাড়িতে। একথা সেকথায় সে বললো, দিদি, শেষ পর্যন্ত মুসলমান ঢোকালেন বাড়িতে ! ওর হাতের ছোঁয়া...
কথা আর বাড়তে দিলেন না সরমা, শোনো, মুসলমান না, বলো একটা মানুষ ঢুকিয়েছি বাড়িতে। ঐ যে বাজারে ফুল বিক্রি করে, সেও মুসলমান, যে মাছ বিক্রি করে সেও মুসলমান, কই তাদের হাতের ছোঁয়া লাগে না ! নাকি মাছওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করো তুমি হিন্দু না মুসলমান ! যেদিন এই ধারণা থেকে বেরোতে পারবে, সেদিন আমার বাড়িতে এসো, বুঝলে?
বললেন বটে, তবে সরমা এটা বুঝলেন যে চারিদিকে শুধু হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, খোঁজে সবাই ; কেউ মানুষ খোঁজে না


অনুগল্প / খবর উদ্ঘাটন / উৎসব দত্ত




 খবরের কাগজ দেখতে দেখতে তৃতীয় পাতায় নজর যেতেই নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছেনা মলয়বাবুর। অধৈর্যের মতো ছেলেকে ডাকতে লাগলেন ।

 প্লট- ছেলে আসতেই ছেলের মুখের দিকের চেয়ে করুণ ভাবে তাকিয়ে রইলেন। কি বলবেন বুঝতে না পেরে তাকিয়েই রইলেন ফ্যালফ্যাল করে। খবরের কাগজটা ছেলের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে আঙুল দেখিয়ে বললেন আজকের তৃতীয় পাতার খবর।

 ক্লাইম্যাক্স -' পাত্র পক্ষ বিয়েতে টাকা ও গাড়ি চাওয়ায় তিন বছরের সম্পর্ক ভেঙে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার করল এক তরুণী। স্থানীয় সুত্রে খবর গত তিন বছর ধরে এলাকারই এক তরুনের সাথে বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে বাঁধা ছিল দুজনের সম্পর্ক। পুলিশ জানিয়েছে ওই তরুণের খোঁজ চলছে। '

পতন- মিনিট খানেকের নীরবতা। দোষারোপ। পাল্টা দোষারোপ। পুলিশের আগমন। গ্রেফতার।
 শেষ অঙ্ক- ছেলেরা বিয়ে করে। মেয়েদের বিয়ে হয়।



কবিতা / দিকশুন্যপুরের ঝুপড়ি / প্রজ্ঞা পারমিতা ভাওয়াল





হাইবারনেশানে যাই যখন তখন
তার অবগাহনে ডুবে যেতে।
ফিরে যাই সেই মাতোয়ারা দিনগুলোতে
জীবনের জরদ্গভ প্রাচীর ডিঙিয়ে
অদ্ভুত এক লুকোচুরি অহর্নিশ;
দিকশুন্যপুরের সেই ঝুপড়িতে
কল্প আলিঙ্গনে আদরের বানভাসিতে দাঁড় বাই।

"ভালোবাসি" বলিনি কখনো কাউকেই
এ জীবনে হয়তো আর বলবোও না কাউকে।
মোহো মায়া থেকে যোজন ক্রোশ দূরে দাঁড়িয়েও সোহাগের চুম্বন লেপা যায়।

ঠোঁটকাটা, বেশরম ,অহংকারীর তকমা লাগে অজান্তেই
প্রেম পীড়িত সোহাগের দুর্যোগ দেখতে দেখতে ক্লান্ত মন।
প্রেমের মর্ম বোঝে কয়জনা?
অভিসার আর অভিনয়ের মধ্যে পেন্ডুলামের চলন
নিমেষকালের মধ্যে আপোষ হীন ভালোবাসার আকালে
টুকরো হয় হৃদয়
ছিন্ন ভিন্ন হয় সমাজ। ভাসাতেই আনন্দ , ভাসাতেই হিল্লোল , ভাসাতেই আছে প্রাণের দোল।


Drawing by Rishijit

দীপাবলি

Tuesday, October 24, 2017

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া


সম্পাদকীয় / গৌতম সেন


প্রথমেই চিলেকোঠা ওয়েবজিনের তরফে চিলেকোঠার সকল সদস্য-সদস্যাদের, এই ব্লগের সমস্ত পাঠক-পাঠিকাদের এবং অন্যান্য শুভানুধ্যায়ী ব্যক্তিদের জানাই শুভ বিজয়া ও শুভ দীপাবলির আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। ইত্যবসরে শারদীয়া উৎসব দুর্গাপুজো শেষ ও অতি সম্প্রতি হয়ে গেল দীপাবলী তথা কালীপুজো উৎসব। আনন্দ  ও আলো ঝলমলে দিনগুলো আশা করব সবাই খুশি মনে অতিবাহিত করেছেন।
সদ্য সদ্য হেমন্ত ঋতু প্রকৃতির বুকে তার পরশ রেখেছে। মাঠের ধান পাকার সময় আগতপ্রায়। কিন্তু প্রকৃতির খামখেয়ালীপনা যেন কিছুতেই কাটতে চাইছে না। পুনঃ পুনঃ আকাশে বাদল মেঘের আনাগোনা – অকাল বর্ষণের আবির্ভাব আমাদেরকে একরকম ভাবিয়ে তুলছে বারবার। বৃষ্টি শেষে পাকা ফসল তোলা রোদের এখন অপেক্ষা।  সর্বান্তকরণে বরষা বিদায়ের তাই প্রার্থনা জানাই।
এবার তো মনে হিমেল হাওয়ার টান লাগার সময় এসে গেল। ঘরে ঘরে ছাদের ওপর খোলা জায়গায় আকাশ প্রদীপ জ্বালার ক্ষণ। কবির সেই বিখ্যাত গান মনে আসে – “হিমের রাতের ওই গগনের দীপগুলিরে /হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে...” – আকাশের তারারা হালকা কুয়াশার অবগুণ্ঠনের আড়ালে নেবে আশ্রয় আর সামান্য কিছু কালের অবসানে।
চিলেকোঠা ওয়েবজিন কৃতজ্ঞতা জানায় অকুণ্ঠ চিত্তে সকল লেখক, কবিবন্ধুদের যারা তাদের লেখনীর অবদানে শুধু যে ধন্য করেছেন এই সাহিত্যপ্রয়াস কে নির্বিঘ্ন যাত্রা অক্ষুণ্ণ রাখতে তাই নয়, পাশে থেকেছেন এই ওয়েবজিনের জন্মলগ্ন থেকে এর সাফল্যের অংশীদার হয়ে। পাঠক-পাঠিকা, সদস্য-সদস্যাদের অবদান ও নিরবিচ্ছিন্ন সমর্থন এ পত্রিকার আর এক শ্রেষ্ঠ সম্পদ, এগিয়ে চলার মূলধন।
অবশেষে সকলে সুস্থ থাকুন, আনন্দে থাকুন এই শুভকামনা জানাই।






ধারাবাহিক / স্বপ্নস্বরূপ - ১১ ন ন্দি নী সে ন গু প্ত


এবছর বঙ্গদেশে বর্ষা বিলম্বিত। শরত সদ্য প্রবেশ করেছে প্রকৃতিতে। কিন্তু হিসেবমত আশ্বিন ফুরিয়ে গিয়েছে ক্যালেন্ডারে। তাহলে কি হেমন্তকে আর দেখা যাবে না? লুকিয়ে থাকা এই হেমন্ত ঋতুর রূপের কথা ত প্রথম পেয়েছিলাম তাঁরই গানে, যখন শুনেছিলাম ‘হায় হেমন্তলক্ষ্মী, তোমার নয়ন কেন ঢাকা’। নিজেকে গোপন করে অন্তরালে থাকার যে মধুর ভাব এই ঋতুর, রবীন্দ্রনাথের প্রকাশভঙ্গীকে আশ্রয় করে তা অনুরণিত হয়েছে বাঙালির মনে। প্রশ্ন উঠেছে চরাচরে শুকিয়ে যাওয়া কাশবনে, ‘আপনাকে এই কেমন তোমার গোপন করে রাখা?’
তবে একই সঙ্গে একটা জিনিস লক্ষ্য করে অবাক লেগেছিল, হেমন্ত ঋতুকে কবি প্রায়ই বলেছেন ‘হেমন্তলক্ষ্মী’। এই ‘লক্ষ্মী’ অভিধাটি এই হেমন্ত ঋতুর সাথে কেন জড়িয়ে গিয়েছিল, সেটা কিশোরীবেলায় বুঝে উঠতে পারিনি। বয়স বাড়লেও বিস্ময় কমে নি। যখন জেনেছিলাম যে কবি পৌত্তলিক হিন্দুধর্মের কেউ নন, অথচ ধনসম্পদের অধিষ্ঠাত্রী এই দেবীরূপের উপমাটি যত্ন সহকারে ব্যবহার করেছেন এক ঋতুর রূপবর্ণনায়, তখন বিস্ময় আরও বেড়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির ফসলসমৃদ্ধ রূপ আর কীভাবে বলা যায়? সোনারূপা বা রত্নরাজি নয়, যে জিনিস মানুষের ক্ষুন্নিবৃত্তি করে সে খাদ্যশস্যই যে প্রকৃত সম্পদ। লক্ষ্মীর বাস যে সেখানেই। তাই কবি বারে বারেই তার কাব্যে আবাহন করেন ‘হেমন্তলক্ষ্মী’ কে। প্রণাম জানিয়ে এই ঋতুকে সম্বোধন করেছেন ‘ক্ষুধার্তজনশরণ্য’ রূপে। এমনকি শুধু লক্ষ্মী নয়, আরেকধাপ এগিয়ে তাকে বলেছেন ‘অন্নপূর্ণা’।
‘নটরাজ’ গীতিনাট্যে এই ঋতুকে কবি বলছেন,
‘... “কোথায় গো, অন্নপূর্ণা, ক্ষুধার্তেরে অন্ন দিবে না কি?
শান্ত করো প্রাণের ক্রন্দন, চাও প্রসন্ন নয়ানে
ধরার ভাণ্ডার পানে।” শুনিয়া লুকায়ে হাস্যখানি,
লুকায়ে দক্ষিণ হস্ত দক্ষিণা দিয়েছ তুমি আনি,
ভূমিগর্ভে আপনার দাক্ষিণ্য ঢাকিলে সাবধানে। ...’
হ্যাঁ, এখানেও আছে সেই লুকিয়ে দাক্ষিণ্য দেখাবার কথা। এই বিনীত রূপ, যেখানে ডানহাত সাহায্য করলে, বামহাত জানতে পারেনা, চিরন্তন এই ভারতীয় মূল্যবোধের প্রকাশও দেখতে পাই এই লেখায়। আজ  বিজ্ঞাপনসর্বস্ব সমাজে দাঁড়িয়ে নিজেকে অপ্রকাশে রেখে অন্যকে দাক্ষিণ্য দেখাবার এই চিন্তা হয়ত মুর্খামি ছাড়া কিছু নয়। তবুও এই লেখা মনে করিয়ে দেয় যে এই বোধের মধ্যেও রয়েছে এক আত্মতৃপ্তি, আছে এক অদ্ভুত গর্ব।
হেমন্তের রূপের বর্ণনায় কবির লেখায় অবধারিতভাবেই আসে দীপাবলির প্রসঙ্গ। শিশুবেলায় এই গান গায়নি এমন বাঙালি কম আছে। ‘যাক অবসাদ, বিষাদ কালো, দীপালিকায় জ্বালাও আলো!’ এই ত সবে কিছুদিন হল আমরা পেরিয়ে এলাম দীপাবলির রাত। অদ্ভুত এক দ্যোতনার সৃষ্টি হয় এই গানের মধ্যে বর্ণিত দৃশ্যে। চোখ বুজলে যেন দেখতে পাই আকাশের নক্ষত্রের প্রদীপের কম্পমান শিখাগুলিকে আঁচলের ছায়া দিয়ে আড়াল করছে ‘হেমন্তিকা’ রূপিণী ঋতু।
দীপাবলির প্রসঙ্গ উঠলে কালীপূজার প্রসঙ্গ আসেই। এই প্রসঙ্গে বলিদানের ব্যাপারে কবিমনের বিরূপতা শুধু ‘বিসর্জন’ নাটকে নয়, বিভিন্ন লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। শুধু তাই নয় ‘কালী’ প্রসঙ্গে বাঙালিজাতির ভক্তির তমোগুণ তার মনকে সেভাবে আকৃষ্ট করেনি, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় বারে বারে। যখন তিনি  ‘জাভাযাত্রীর পত্র’ এ উল্লেখ করেন সে দেশের হিন্দুধর্মের আচার আচরণের কথা, তখন কতকটা যেন আশ্বস্তবোধ করেছেন তিনি সেখানে ‘করালবদনা উলঙ্গিনী কালী’র অনুপস্থিতিতে। আশ্বস্তবোধ করেছেন সেখানে পূজায় বলিদানের প্রচলন না থাকায়। তিনি যেন সযত্নে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন এই দেবীমূর্তি। তার কাছে এই মূর্তি ‘কাল’ বা সময়ের প্রতীক নয়, নয় ঘরের আহ্লাদী মেয়ে ‘শ্যামা আনন্দময়ী’, বরং তিনি যেন শিউরে ওঠেন বারে বারে এই ‘রক্ততৃষাতুরা’ দেবীমূর্তির উপস্থিতিতে। এত ভীতি এবং বিরূপতা থাকলেও ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’য়  রচনা করেছেন মায়ের জয়গান ‘কালী, কালী বলো রে’ এক অদ্ভুত দক্ষতায়। কবির নতুন এক্সপেরিমেন্‌ট বলা চলে এই গানটিকে, যেখানে পাশ্চাত্য সুরের সাথে শেষ লাইনে এসে মেলবন্ধন ঘটছে আমাদের দেশজ সুরের। আরও বিস্ময় জাগে, যখন জানতে পারি যে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি লিখেছিলেন এই গান। হয়ত বা তারুণ্যের উচ্ছ্বাস তাকে প্রেরণা দিয়েছিল এই নিয়ম-ভাঙ্গা গানখানি লিখতে। তিনি গেয়ে উঠেছিলেন শ্যামা মায়ের জয়গান। ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ নাটককে কবি নিজেই বলেছেন ‘দস্তুরভাঙ্গা গীতিবিপ্লবের প্রলয়ানন্দে রচিত’। তিনি নিজেই নিশ্চিত ছিলেন যে অনেক গানে তিনি অদ্ভুত দুঃসাহসিক হয়েছেন। আশঙ্কা ছিল যে প্রবল সমালোচনার ঝড় উঠবে। কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি, বরং অনেক গবেষণার উপকরণ হিসেবে কালজয়ী হয়ে উঠেছে তার লেখনীর আখরগুলি।                    
                   


কবিতা / অভিরূপের প্রেম.../ অনুপম দাশশর্মা


অন্তরজুড়ে বাসনার জড়াজড়ি। পৃথিবীর  যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ চেপে ধরে মখমল
কথামালায় হৃদয়ের দিগন্ত তুলে ধরছো অভিরূপ।

অথচ এক একটা সময় যেন নেহাত মৃতদিন
আলো নিভে যাওয়া মেঘলা বিকেল।
জীবনের গতিতে চাই আলোর উড়াল
ভেঙ্গে দিতে হয় নৈঃশব্দের অহঙ্কার।

এসব জানো তুমি অভিরূপ। স্বতঃসিদ্ধ।
অথচ বেঁধে রেখেছ বর্ণ, একঘেয়ে চৌষট্টি কলায়।

এবার বেজে উঠুক বৃষ্টিবীণা
ঝরে পড়ুক দেহাতি শব্দে টিনের চালে।
বাসনা নয় হৃদয়ের শস‍্যখেত,
জীবনকে ভালবাসতে লাগে আত্মনিংড়ান দুঃখবোধ
পতিত সমাজের জন‍্য।  তোমার প্রেমিকা
থাক তোমার আত্মমগ্ন বুকে।
ক্লিষ্ট মুখে আলো ফেরাতে আমি অক্ষরে
ছবি এঁকে যাবই একে একে--

জানি, তথাকথিত প্রেম আসন পায়না
মনান্তরের ঘূর্ণিপাকে।


আস্তানা / শ্যামশ্রী চাকী





ছাদের দরজাটা ভালো করে দেখেই বন্ধ করেছিলেন প্রতুল বাবু, নাহ! কোনো ভুলচুক তো হয়নি, তালাটাও দুবার নেড়েচেড়ে  দেখেছিলেন, ওপরের খিলটা লাগিয়ে কড়াগুলো টেনে তালা লাগানো, তাহলে আজও ওই শব্দটা আসছে কোত্থেকে! এই এক জ্বালা হয়েছে !গত এক সপ্তাহ হল ঠিক মাঝরাতে ছাদে কারা যেন হেঁটে বেড়ায়, চোরের মত চুপিচুপি নয় বেশ গটমটিয়ে ধুপধাপ শব্দে। প্রথম প্রথম ভাবতেন মনের ভুল, এই ভাগাড়ে কে আসবে ছাদে চুরি করতে আর এলেও প্রতুলবাবুর আছেটা কি? ওই তো একটা ঝুরঝুরে ট্রাঙ্ক, আদ্দিকালের একটা তক্তাপোষ, আলনা আর একটা কেরোসিনের স্টোভ, দুটো বাসন । নিজেই দুমুঠো ফুটিয়ে খান প্রতুলবাবু সেগুলো নিতে আর যাই হোক ভাঙা কার্নিশ বেয়ে চোরের দল আসবেনা। কিন্তু গত তিন রাতে বার বার ঘুম ভেঙেছে প্রতুলবাবুর।
আজ তাই চারদিক ভালো করে দেখে তালাটা লাগিয়েছিলেন, কি বিপত্তি! এই মাঝরাতে কি শুরু হল রে বাবা! টর্চটা নিয়ে চটিতে পা গলান প্রতুলবাবু।কুলঙ্গিতে রাখা চাবির গোছাটা বের করে চুপিসারে ছাদে উঠে দরজা খোলেন, কোথাও কিচ্ছু নেই। দুদিন আগে পুর্ণিমা গেছে চাঁদের আলোয় ফুটফুটে ছাদ, সামনে কাঁঠাল গাছের পাতা দুলছে, বাতাবী লেবু গাছের ফুলের গন্ধ ম ম করছে, নাহ ছাদে এসে ভুল করেন নি, জ্যোৎস্নার এই হাড়পাঁজর বের হওয়া বাড়িটাকেও রাজপুরী মনে হচ্ছে।একটু পায়চারী করেন প্রতুলবাবু ছাদের উত্তরে ধানক্ষেত, ওদিক থেকে বেশ হাওয়া আসছে।হঠাৎ একটা আলো ধক করে জ্বলে আবার নিভে গেলো আর একটা রাতচরা পাখি ডানা ঝাপটে বিদীর্ণ চিৎকার করে মাথার ওপড় দিয়ে উড়ে গেলো। একটু কেঁপে উঠলেন প্রতুলবাবু, গ্রামে আলেয়ারআলো প্রায়ই দেখা যায় অনেকবার পড়েছেন, একটা গ্যাস জল কাদা থেকে উঠে বাতাসের সংস্পর্শে জ্বলে ওঠে,এই প্রথমবার আলেয়া নিজের চোখে দেখলেন প্রতুলবাবু। হঠাৎ কেমন শীত শীত করতেলাগলো, প্রতুলবাবু নীচে নেমে এলেন। 



পরেরদিন মাঝরাতে প্রতুলবাবুর ঘুম আর ভাঙেনি, একটা সলিড ঘুম দিয়ে সকাল ছ'টায় মর্নিং ওয়াকে বেরোলেন। ওদিকের ধানক্ষেতটা বেশ ভালো করে দেখে এলেন, কোথাও কিছু নেই! শুধু জলা জায়গার কিছুটা শুকিয়ে টান ধরেছে, শীত পড়বে পড়বে... ঠিকই ধরেছিলেন কাল আলেয়ার উৎপত্তি এখান থেকেই। জলার ধারে প্রচুর পরিযায়ী পাখি এসেছে। 
প্রতুলবাবু বাড়ি ফিরে দেখলেন ক্ষিদেটা বেশ চাগাড় দিচ্ছে। ভাতে ভাত বসিয়ে উত্তরের জানালাটা খুলতেই একটা কি পাখি না বাদুড়ের মত উড়ে চলে গেলো ঠিক তখনি একটা লেবু ফুলের গন্ধ টের পেলেন, এই গন্ধটা সেদিন ছাদেও পেয়েছিলেন। প্রতুলবাবুর মনে পড়লো বাতাবী লেবুর গাছটা তো গতবছর ঝড়ে পরে মরে গেছে তাহলে লেবুর গন্ধ এলো কোত্থেকে? এ তল্লাটে কোথাও লেবু গাছ নেই। যাহোক বাতাসে ভেসে এসেছে হয়ত দূর থেকে আবার মনের ভুলও হতে পারে, এই নিয়ে আর কিছু ভাবলেন না প্রতুলবাবু। পরদিন সকালে প্রতুলবাবু ঘুম ভেঙে দেখলেন ছাদের এক কোনে শুয়ে আছেন। রাতে কখন উঠে তালা খুললেন কখনই বা ছাদে এলেন কিছুই মনে করতে পারলেন না, তবে কাল রাতে বেশ গুমোট লাগছিল হয়তো ঘুমের ঘোরে এসেছেন। সারা গায়ে ব্যথা চোখ জবাফুলের মত লাল, এই শীতের শুরুতে খোলা ছাদে শোয়ার ফল, দুপুরে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো প্রতুলবাবুর।






রাতটা ঘোরের মধ্যে কাটলো, সকালে চোখে রোদ পড়তেই দেখলেন আবার ছাদের কোনে শুয়ে আছেন, শরীর এত দুর্বল উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই! কিভাবে এলেন ছাদে? এবার বেশ ভয় পেয়ে গেলেন প্রতুলবাবু। একটু বেলা যেতেই খানিকটা সুস্থ বোধ করলেন, কোনোমতে রেলিং ধরে ধরে নীচে নেমে এসে ধপাস উঠোনে বসলেন প্রতুলবাবু। ভাগ্যক্রমে সাইকেল নিয়ে পাড়ার একটি ছেলে যাচ্ছিলো প্রতুলবাবুকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে লোকজনকে খবর দিলো। প্রতুলবাবুর এক দুঃসম্পর্কের শরিক ওনাকে তার নিজের বাড়ি নিয়ে এলো খবরটা পেয়েই।  মাঝরাতে ঘুমভেঙে আবার সেই মিষ্টি গন্ধটা পেলেন প্রতুলবাবু এবার দেখলেন ঘর জুড়ে এক অস্পষ্ট ছায়া ক্রমে একটা মুখের আকার নিচ্ছে, গন্ধটা গাঢ় হতে হতে সেই ছায়ামূর্তি সামনে এগিয়ে এলো প্রতুলবাবু  ভয়ে জ্ঞান হারালেন।
পরদিন সকালে সবাই দেখলো প্রতুলবাবু এই অসুস্থ শরীরে নিজের বাড়ি ফিরে গেছেন শুধু ফিরেই যাননি ছাদের এক কোনে শুয়ে আছেন।
সেদিন বিকেল থেকে প্রতুলবাবুর কথা বন্ধ হলো, ভয় পেয়ে প্রতুলবাবুর শহরের বাড়িতে খবর  দিলেন ওনাদের শরিক।




কবিতা / ক্ষমা কোরো / পিনাকী দত্ত গুপ্ত






আজ এই বিদায়ের দিনে, রোমন্থনের ভরা আশ্বিনে,
যদি কিছু ফেলে যাই, যদি পিছনে তাকাই...
ক্ষমা কোরো। ক্ষমা কোরো।

শিউলি ঝরার রাতে যদি, ভুল করে ফুল তুলে রাখি...
যদি অবেলার পথে পিছু ডাকি...
ক্ষমা কোরো। ক্ষমা কোরো।

কুয়াশার আভরণে স্বত্বহীন যদি কিছু ভুলে যেতে চাই,
যদি অসমর্থিত কিছু ভালোবাসা পাই...
ক্ষমা কোরো। ক্ষমা কোরো।

বিসর্জনের ঢাক বেজে গেছে। যদিও বর্ষা খরতর...
পথের দুপাশে চেনা মাটি, চেনা গন্ধ, চেনা সঙ্কেত;
অনাবশ্যক স্মৃতি, দুটি পা জড়িয়ে কেন ধরো?
রেখে গেছি কিছু শব্দ, জেনো আজ আমি অনিকেত...
তবুও হেমন্ত এলে জ্বেলে রেখো আকাশ প্রদীপ!
অস্পষ্ট ছায়ালোকে যেন পথ চিনে নিতে পারি;
যে পথের শেষে খুঁজে পাবো এক পারিজাত দ্বীপ,
যে দ্বীপে নির্দ্বিধায় তুমি হ’তে পারো এক নারী...

হয়ত এমন কিছু ঘটবেনা, দীর্ঘশ্বাসে বুক ভোরো;
অনুষ্টুপের মতো বলে যাই – ‘ক্ষমা কোরো’!



কবিতা / বৃষ্টি / গৌতম সেন



জলের ধারা মেঘের দলে
ঝরলে তখন বৃষ্টি -
আকাশ কালো ওড়না ওড়ে,
তোমায় দেখতে কত মিষ্টি।

ভিজলে পরে সবুজ পাতা
হিংসে বড় হয় -
আমায় এসে ভেজাও না তো,
তুমি এমনই নির্দয়?

তোমায় নিয়ে জলকেলিতে
ধরার মাটি মত্ত -
নিজের ক’রে তোমায় পেতে
আমার তরে শর্ত!

আমিই হব সবুজ পাতা
আমিই ধরার মাটি-                  
ভিজব যখন তোমায় মেখে
বুঝবে আমিও খাঁটি ।

বৃষ্টিজলের বৃষ্টি রে তুই
শ্যামল মাটির কন্যে,
সবুজ পাতার আঁচল ভাসা
তোর মন আর কতকাল
করবে আমায় হন্যে?




সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া