Sunday, September 24, 2017

কবিতা / উৎসব / অর্পিতা ভট্টাচার্য


শিউলি ফুলের গন্ধমাখা
ভোরবেলাটা এসে,
ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে আমায়,
বললো যে আজ হেসে,
মায়ের আসার আনন্দতে
সাজিয়েছি আমায়।
তুমিও এমন সেজে ওঠো,,
মায়ের আসার, হলো সময়।
বর্ষার মেঘ সরে গিয়ে ,
আকাশে আজ নীলের মেলা।
শরৎ এসে ভাসায় তাতে,
শুভ্র পেঁজা মেঘের ভেলা।
সেই মেঘেরই মাঝে আমি,
দেখতে পেলেম মায়ের আদল।
আগমনীর সুরে সুরে,
বেজে উঠলো অনেক মাদল।
দিকে দিকে আলোর ছোঁয়া,
কাশের বনে লাগলো দোলা।
শিউলি গাছও ফুল ঝরিয়ে,
গাঁথতে বসে ফুলের মালা।
মায়ের পায়ে ঝরবে বলে,
পদ্ম তার পাপড়ি মেলে,
শিশির ফোঁটা, পদ্মপাতায়,
মুক্ত বিন্দু হয়ে দোলে।
শুরু হলো আগমনীর,
আলোর বেনু বাজার পালা।
আনন্দ ও উৎসবে মেতে,
সাজাই মায়ের বরণডালা ।.


গল্প / বিপন্ন শৈশব / পিয়ালী গাঙ্গুলি



পায়েস টা নাড়তে নাড়তে মেধা ভাবল একবার ঈশিতাকে ফোন করে দেখি কখন আসবে। তারপর ভাবল থাক, ছেলের জন্মদিনের পায়েস, কথা বলতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেলে পুড়ে যেতে পারে। দিনের বেলাটা পুরো বাঙালি মতে ডাল, ভাত, শুক্তো, পাঁচরকম ভাজা, মাছ, পায়েস এসব করে দেবে। রাতে সব বাইরে থেকে অর্ডার করা। ঋজু এসবে খুশি নয়। আজকাল নাকি  কারুর এভাবে বাড়িতে জন্মদিন হয় না। ওর বন্ধুদের সবার জন্মদিনে হোটেলে পার্টি হয়। ঋজুও অনেক বায়না করেছিল। মেধা বা  অপূর্ব কেউই রাজি হয়নি। ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে "অন্যরা কে কি করে তাতে আমাদের কি? আমরা আমাদের মত করে পালন করব। সবকিছু কি লোকের দেখাদেখি করতে হবে"? 

এসবে ছেলের মন ভরে নি। স্কুলে আর ওর 'প্রেস্টিজ' থাকবে না। মা বাবা যেন ইচ্ছা করেই এসব করে। সবসময় বন্ধুদের কাছে ওকে লজ্জা পেতে হয়। ওর বন্ধুরা 'ভ্যাকেশনে' 'ফরেন ট্যুর' করে আর ওরা প্রত্যেকবারই ভারতবর্ষের মধ্যেই কোনো জঙ্গল, হিল স্টেশন নয় সি বিচ। সেই কবে একবার মালয়েশিয়া আর সিঙ্গাপুর গেছিল। ব্যাস, ঐ শেষ। কতবার হং কং, মরিশাস, অস্ট্রেলিয়ার প্ল্যান হয়, তারপর সেসব প্ল্যানই থেকে যায়।

ঋজুর মনে একটা 'ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স' ক্রমশ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। পড়াশুনোয় ক্লাসের ফার্স্ট বয় হলেও বাকি সবকিছুতেই ও যেন পিছিয়ে। বন্ধুরা সবসময়ই 'ব্র্যান্ডেড' জামা, জুতো পড়ে, ওদের জন্মদিনে মা বাবারা দামি ঘড়ি, ট্যাব এসব গিফ্ট করে। ঋজুর মা এখনো সেই একঘেয়ে গল্পের বই নয় খেলনা দিয়ে চলেছে। কিছু চাইলেই হল, মায়ের সেই এক ডায়লগ " ঋজু আমরা মধ্যবিত্ত, তোমার বন্ধুদের সাথে তুলনা করলে আমাদের চলবে না। নিজেরটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে শেখ।" এইসব জ্ঞান শুনতে ঋজুর ভালো লাগেনা। তাই এবার ও সাফ বলে দিয়েছে জন্মদিনে ওর স্কুলের কোনো বন্ধুকে 'ইনভাইট' করার দরকার নেই। মেধা আর ব্যাপারটাকে বেশি পাত্তা দেয়ার প্রয়োজন মনে করে নি। ওরা ওদের মত করে জন্মদিন পালন করবে, দরকার নেই অত বড়লোক বন্ধুদের।

রান্নাবান্না প্রায় শেষ। এবার ঘরদোরগুলো চট করে একটু পরিস্কার করে নিতে হবে। ঋজুর গল্পের বইয়ের তাকে গুছাতে গিয়ে টেস্ট কপিগুলো চোখে পড়ল। গল্পের বইয়ের মধ্যে গোঁজা। ঋজু তো বলেছিল টেস্ট কপি এখনো বেরোয় নি। অঙ্কেতে বেশ কম পেয়েছে। অনেকগুলো ভুল করেছে। সবকটাই কেয়ারলেস মিসটেক। ইংলিশ টাতেও একটু কমই পেয়েছে। গ্রামারে ভুল। নির্ঘাত সেই হড়বড় করতে গিয়ে। সায়েন্স আর এস এস টি তে ভালো পেয়েছে। খাতাগুলো দেখে মেধা চেঁচাল "ঋজু এদিকে এসো"। ঋজু টি ভি দেখা ছেড়ে ওঠার কোনো লক্ষণও দেখাল না। বড্ড ধ্যাটা আর অবাধ্য হয়ে উঠছে ছেলেটা দিনদিন। নিজেই রেগে গড়গড় করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে মেধা খাতাগুলো ঋজুর মুখের সামনে ধরল।"এগুলো কি? তুমি যে বলেছিলে টেস্ট কপি বেরোয় নি? মিথ্যে কথা বলতে কোত্থেকে শিখলে?" ঋজুর স্পষ্ট উত্তর "তোমার থেকে"। এরকম একটা উত্তরের জন্য প্রস্তুত ছিল না মেধা। চোখ কপালে তুলে ছেলেকে প্রশ্ন করল,"আমার থেকে? আমি মিথ্যে কথা বলি?" ঋজুও ততধিক জোর গলায় বলল "হ্যাঁ বলোই তো"। মেধা প্রায় চিৎকার করে উঠল "কি মিথ্যে বলেছি রে আমি?"

সোজা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ক্লাস ফোরের ছেলে বলল "তুমি আমায় বলেছিলে তুমি আর বাবা সিদ্ধিবিনায়কে গণেশের ইঁদুরের কানে প্রে করেছিলে, আর তাই গনুদাদা আমায় তোমার পেটের মধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছিল। ওখানে আমি কিছুদিন খেলা করেছিলাম, তারপর একদিন সেভেন হিলসে ডক্টর পাণিকার আমায় তোমার পেট কেটে বার করে তোমার কোলে দিয়ে দিল। আসলে তো গড বা গনু দাদা আমাকে পাঠায় নি। তুমি আর বাবা সেক্স করেছিলে বলে আমি হয়েছি। কথাগুলো শুনে মেধার মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। মনে হল এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। প্রায় অস্ফুট স্বরে বলল "তোমাকে কে বলল এসব কথা?" "অংশুমান আর প্রাঞ্জল বলেছিল আর রোহনের বার্থডে পার্টিতে ওর ট্যাবে তো আমরা ছবিও দেখেছি।" মেধার সারা শরীর কাঁপছে। কি বলবে বা কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। ঋজু তখনও বলে চলছে "তুমি আমায় আরো মিথ্যে কথা বলে এসেছো। বাবা আর আঙ্কলরা পার্টিতে যেগুলো খায় তুমি বলতে ওগুলো বড়দের কোল্ড ড্রিঙ্ক, খুব ঝাল। ওগুলো তো আসলে হুইস্কি। এলকোহল বলে, খেলে নেশা হয়। আমি ইন্টারনেটে সব পড়েছি"। নেহাত আজ ওর জন্মদিন বলে কথা, নইলে মেধা ঠাস করে দুটো চড় লাগিয়ে দিত ঋজুর গালে। 

কোনোমতে নিজেকে সামলে ঘরে চলে গেল মেধা। দুহাতে মুখ ঢেকে  ডুকরে কেঁদে উঠল। জীবনে এত বড় আঘাত মেধা আগে কখনো পায় নি, বাবা মারা যাওয়ার সময়ও নয়। চাকরি ছেড়ে বাড়িতে বসে আছে ছেলেকে মানুষের মত মানুষ করবে বলে। ছোট থেকে গল্পের বই পড়ে শোনানো, ভালো ছবি, ভালো সিনেমা দেখানো, এক সুন্দর নির্মল জগৎ ছেলেকে তৈরি করে দিতে চেয়েছিল মেধা। কত কম বয়সেই কত জিনিস কত সরল ভাবে ঋজুকে শিখিয়ে দিয়েছিল। আজ যেন সবকিছু টুকরো টুকরো হয়ে গেল। ছেলে কি আর কোনোদিন ওকে ভরসা করবে? প্রযুক্তির ছোবল নষ্ট করে দিল ওর ছেলের শৈশব। অঝোরে কেঁদে চলেছে মেধা। ছেলের কাছে মিথ্যেবাদী প্রমাণিত হওয়ার দুঃখ না কি ছেলের শৈশব নষ্ট হয়ে যাওয়ার দুঃখ, মেধা জানে না। সত্যি আজকাল সন্তানকে সঠিকভাবে মানুষ করা কি কঠিন কাজ।

একেকজনের একেকরকম সমস্যা। ঈশিতার যেমন। টাটা ইন্টারেক্টিভ সার্ভিসেসের অত ভালো চাকরিটা ছেড়ে চলে আসতে হল। মেধার ছোটবেলার বন্ধু ঈশিতা। চিরকালই মেধাবী। ছেলের জন্য কেরিয়ার ব্রেক নিয়ে বসে ছিল। ছেলেটাও হয়েছিল তেমনি তুখড়। ওইটুকু বাচ্চা, কি না জানে। সাংঘাতিক বুদ্ধিমান আর তেমনি দুষ্টু। সারাক্ষণ মাথায় কোনো না কোনো দুষ্টুমি ঘুরছে। আর অনর্গল কথা বলত। যেখানেই যেত সকলকে মাতিয়ে রাখত। মেধাদের বাড়ি এসেছে অনেকবার। ঋজুদাদার সাথে বেশ ভালোই জমত। এতদিন বাড়িতে বসে থাকার পর অপ্রত্যাশিতভাবে এত ভালো একটা  চাকরি পাবে ঈশিতা নিজেও ভাবে নি। পোস্টিং ব্যাঙ্গালোর। অরণ্যকে যখন বলল কথাটা অরণ্য বলল "তুমি কি এখন ছেলেকে ছেড়ে ব্যাঙ্গালোর গিয়ে চাকরি করবে নাকি?" "না তা কেন, তুমিও ট্রান্সফার নিয়ে নাও না," আদুরে গলায় বলল ঈশিতা। অরণ্য সাফ জানিয়ে দিল ওর পক্ষে এই মুহূর্তে নিজের কেরিয়ার স্যাক্রিফাইস করা সম্ভব নয়। ঈশিতার ও জেদ চেপে গেল। ক্লাস ওয়ানে পড়া ছেলেকে নিয়ে একাই পাড়ি দিল ব্যাঙ্গালোর।

কম্পানির দৌলতে কোনো কিছুরই অসুবিধে হয়নি কিন্তু সমস্যা হল তাতানকে নিয়ে। অত প্রাণোচ্ছল, দুষ্টু ছেলে হটাৎ করে অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে গেল। শান্ত বলা ভুল, নিজেকে কেমন যেন গুটিয়ে নিল। অত অনর্গল কথা বলা ছেলে কারুর সাথে কথা বলে না, মেশে না, এমনকি টি ভি র নেশাটাও চলে গেছে। ওর স্কুলের টিচারের সাথেও কথা বলেছে ঈশিতা। উনি আশ্বাস দিয়েছিলেন তাতান ব্রাইট স্টুডেন্ট, ও ঠিক এডজাস্ট করে নেবে। এইটুকু বাচ্চা, নতুন পরিবেশে একটু সময় তো লাগবেই। 

একটু একটু করে ছ মাস কেটে গেল। ছেলের কোনরকম উন্নতি না দেখে বাধ্য হয়ে ব্যাঙ্গালোরের নামি চাইল্ড সাইকিয়াট্রিস্টের দ্বারস্থ হতে হল। মা ছেলের সাথে আলাদা করে কথা বলে ডঃ কৃষ্ণমূর্তি যা বললেন তার সারমর্ম হল তাতান ওর বাবাকে মিস করে আর বাবার অভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এর একটাই সমাধান, একসাথে থাকা, আর কোনো বিকল্প নেই। এত ছোট বয়স থেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে ভবিষ্যতে আরো নানারকম মানসিক জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। ঈশিতার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তাতানের ভিতরে এত কিছু চলছে ও কোনোদিন টের ও পায়নি। রোজ রাতেই অবশ্য বাবাকে ফোনে বাবাকে একই প্রশ্ন করত "বাবা তুমি কবে আসবে?" সেই ছোট থেকেই বাবা পাশে না শুলে তাতানের ঘুম হত না। সারাদিন ভুত প্রেত, রাক্ষস, খোক্ষসের গল্প শুনত আর রাত হলেই জিজ্ঞেস করত " বাবা শক্তিশালী তো? কেউ আমায় ধরতে এলে বাবা তাকে মারবে তো?"

সবকিছু শুনে অরণ্য বল টা ঈশিতার কোর্টেই ঠেলে দিল। বলল "দ্যাখো কি করবে"। একবারও নিজে ট্রান্সফার নেওয়ার কথা বলল না। ঈশিতাই পারল না। হাজার হোক, মা তো। ছেলের শৈশব, ছেলের ভবিষ্যৎ সব নষ্ট করে স্বার্থপরের মত নিজের কেরিয়ার টা আর করতে পারল না। ফিরে আসতে হল কলকাতায়। তবে এটাই আনন্দের কথা যে তাতান আবার আস্তে আস্তে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে। আজকে এলে ভালো বোঝা যাবে। ভাবতে ভাবতে মেধা ঈশিতার নম্বর টা ডায়াল করল "কি রে কখন আসছিস? দুপুর দুপুর চলে আয়, জমিয়ে আড্ডা মারা যাবে"। দুপুরে ভুরিভোজ করে অবশ্য ঋজুবাবুর মন একটু ভরেছে। মা ঠিক ততটা খারাপ নয়। তারপর যখন শুনল তাতান আসবে নিজেই সব খেলনা টেলনা বার করে রেডি করে রাখল। মেধারও মনটা খানিক শান্ত হল। ছেলের মনটা তাহলে একেবারে বিশিয়ে যায়নি, এখনো আশা আছে।

 দুপুরে মণি বাসন মাজতে এলে মেধা বলল "এই আজ ঋজুর জন্মদিন, সন্ধ্যাবেলায় মেয়েদের নিয়ে আসিস। রাতে এখানেই খাবি"। মণির বর ধনঞ্জয় আগে ওদের ফ্ল্যাটে কেয়ারটেকারের কাজ করত। ফ্লাটেরই একজন ওকে 'লার্সেন এন্ড টুব্রতে' কন্ট্রাক্টে জে সি বি চালানোর কাজে ঢুকিয়ে দেন। বেশ ভালোই মাইনে। কিছুদিনের মধ্যেই হটাৎ সে দুম করে আরেকটা বিয়ে করে এনে হাজির। কিছুদিন সহাবস্থান, তারপরেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে মনিকে বিদায় করে দিল। সেই থেকে মনি লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করে দুই মেয়েকে মানুষ করছে। কত আর বয়স হবে, বড়জোর পঁচিশ-ছাব্বিশ। মেয়েগুলো সকালে সরকারি স্কুলে পড়তে যায় আর বাকি সময় মায়ের হাতে হাতে কাজ করে। রোজ দুবেলা ভালো করে খাওয়াও জোটে না। মেয়েগুলো বেশ চালাক চতুর। ধনঞ্জয় এভাবে সংসারটা না ভাঙলে মেয়েগুলোর অনেক ভালো ভবিষ্যৎ হতে পারত।

সন্ধ্যেবেলা বৃহৎ কোনো পার্টি হয়নি, নিতান্তই ঘরোয়া ব্যাপার। হাতে গোনা কয়েকজন নিকট আত্মীয়, বন্ধু বান্ধব আর ফ্ল্যাটের কয়েকটা বাচ্চা। হই হই করে ভালোই কেটে গেল সন্ধ্যেটা। ঋজুর ও বোধহয় খারাপ লাগেনি। মেধা আর আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। ওর মাথায় এখন অন্য চিন্তা ঘুরছে। চারিপাশে শিশুদের কতরকম সমস্যা। নিজের ছেলের কথা, তাতানের কথা, মণির মেয়েদের কথা, সবার কথা ভাবছে। আরেকজনও আছে। নীচের ফ্ল্যাটের কুহু। শুনেছে ওর মা সাইকিয়াট্রিক পেশেন্ট। সিভিয়ার অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার। নিজের ছুঁচিবাই নিয়েই ব্যস্ত। মেয়েকে ঠিকমত রান্না করে বা টিফিন করেও দিতে পারেন না। কুহু নিজেই ঋজুদের কাছে দুঃখ করেছে ওর মা ওকে আদর করে না, ছোঁয় না, কাছে ঘেঁষতে দেয় না। মায়ের খাট, বিছানা, বাসন পত্র, তেল, সাবান, শ্যাম্পু, পেস্ট সব আলাদা। ওদের ছোঁয়ার অধিকার নেই। বাবা ভালোবাসেন কিন্তু কুহুর মায়ের অভাব মেটে না। একদিন নাকি কান্নাকাটি করে বলেছে ওর বাড়িতে থাকতে ভালো লাগে না, ও বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে। ছেলে ধরা ধরে নিয়ে গেলেও ভালো। আর সবচেয়ে ভালো হয় যদি রাস্তায় বাস চাপা পড়ে মরে যায়। তাহলে হয়ত পরের জন্মে ভগবান ওকে ভালো মা দেবেন।

ঋজু ঘুমিয়ে পড়েছে। সদ্য পাওয়া লাল রেসিং কার টা প্রায় বুকে জড়িয়ে। মেধার মনটা একটু ভারাক্রান্ত। চারিপাশের বাচ্চাগুলো ভালো নেই। এইভাবে ওদের শৈশব হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। কিছু একটা করতে হবে। ঋজু তো বড় হয়ে যাচ্ছে। সামনেই ক্লাস ফাইভ। মায়ের ওপর নির্ভরতা আরো কমবে, ও হাতে আরো অনেক সময় পাবে। আচ্ছা, একটা এন জি ও খুললে কেমন হয়? শুধু শিশুদের নিয়ে কাজ করবে, শিশুদের সমস্যা নিয়ে। মিডিয়ার প্রপাগ্যান্ড বা বিদেশী এড, ওসব চাই না। নিঃশব্দে কাজ করবে, যথার্থ কাজ। বন্ধুবান্ধব মহলে তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, মনোবিদ, উকিল সবই তো আছে। সবাই একটু একটু যদি সাহায্য করে। দ্বিধা কাটিয়ে অপূর্বকে কথাটা বলেই ফেলল। অপূর্ব স্পষ্ট কথার মানুষ। শুনে বলল "যদি মনে কর করবে, কর। ভেবে ভেবে সময় নষ্ট করো না। এগিয়ে চল, সামনে পথ ঠিক খুলে যাবে আর ভালো মানুষজনের সাহায্যও ঠিক পেয়ে যাবে।" সারাদিন পরে মেধার মনটা একটু শান্ত হল। রাতে শান্তিতে ঘুমোতে পারবে। সামনে অনেক কাজ।



অনু গল্প / মনের কাছাকাছি/ উৎসব দত্ত



সহেলি আর রাজীব ছমাস হল একসাথে থাকে সামনের বছর বিয়ে করতে পারে নাও পারে দুজনেই খামখেয়ালি । এটা ওদের প্রথম পুজো । অফিসের ব্যস্ততায় শপিং সারা হচ্ছিলনা। আজ Plan করা আছে অফিস থেকে আগে বেরোবে। সময় মতো ওরা চলে এসেছে। রাজীবের জন্য টি শার্ট পছন্দ করে দিয়েছে সহেলি আর দুটো ডেনিম জিন্স ।সাথে টুকটাক যা নেবার ছিল। সহেলি ওর সেই প্রিয় বুটিকটায় ঢুকেছে। ডানদিকে সেই পরিচিত লোকটা। "ম্যাডম কেমন আছেন ?নতুন শাড়িগুলো দেখুন , ব্র্যান্ডেড। এগুলো আমাদের এখানেই তৈরি কদিন পর বাইরে চলে যাবে " বেশ কয়েকটা পছন্দ হল। সহেলি শাড়ি গুলো নিয়ে ট্রায়াল রুম এ চলে গেল। রাজীব চুপচাপ বসে আছে। দু একবার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। রাজীবের একটা শাড়ি পছন্দ হয়েছিল একবার ভাবল সহেলি কে বলবে কিন্তু বলা হলনা। ট্রায়াল রুম থেকে বেরিয়ে এসে সহেলি জিগেস করল, "অ্যাই কেমন লাগছে"? রাজীব আর কি বলে "খুব ভালো"। কিন্তু সহেলির মনোমতো হচ্ছেনা কিছুতেই। আরও বার পাঁচেক শাড়ি দেখা হল। রাজীবকে যথারীতি ডজ করতে হচ্ছে। প্রতিবার কি ভালো বলা চলে আবার খারাপ লাগছেও বলা যাবেনা। অবশেষে পছন্দ হল। কিন্তু সহেলির কপাল খারাপ বুটিকের লোকটা জানালো ওটা অলরেডি সোল্ড। কি করা যাবে অন্য শাড়ি নিতে হল। ফেরার পথে সহেলি রাজীবের ওপর রাগ দেখাল "তোমার জন্য এতো দেরি করে এলাম কদিন আগে এলে ওই শাড়িটা পেয়ে যেতাম।" বাড়ি ফিরে এক এক করে সব বের করা হচ্ছে। "একি সেই শাড়িটা তো যেটা আমি পছন্দ করেছিলাম " অ্যাই রাজীব আমার পছন্দ করা শাড়িটা আমদের ব্যাগে এল কি করে " রাজীবের ছোট্ট জবাব "আমি পছন্দ করে রেখেছিলাম তোমার ট্রায়াল দেবার আগে" ।

v

কবিতা /মা - আসেন মর্তে ? / প্রজ্ঞা পারমিতা ভাওয়াল


শরৎ বলতে  শিউলি আর নতুন জামার গন্ধ ,
কাশ ফুলের  নাচনে  দিশেহারা ;
সোনালী রোদে চান করা সকাল
তুলো দিয়ে সাজানো মেঘের ভেলা ,
উধাও  হলো সব কোথা ;
মনের জ্বরের বিকার শুধুই ।


পথে যে এতো জনস্রোত , মা এর আগমনে
নেংটো শিশুর ক্ষুধার  চিৎকার তবুও ঝুপড়িতে ।
এতো  যে আনন্দমুখর শারদ উৎসব
তার মাঝেও  অন্নহীন সন্তানের মুখ।
এতো যে আলোর রোশনাই ,
আঁধার তবু  ছড়ানো ছিটানো ,আলো কই!


মাটির মায়ের কিলো কিলো সোনার  শাড়ী
পথেই বসে বৃদ্ধা মা জীর্ণ কাপড়ে হাতে ভিক্ষার ঝুলি।
মৃন্ময়ী মা সেজেছেন স্বর্ণালংকারে
পথের কোণে বালিকাটি একটু খাবারের খোঁজে !
পুজো এলেই আমার বুক জুড়ে  বিষন্নতা
ব্যাথাতে কুঁকড়ে যাই অযথা ।


প্রতিমা গড়ার শিল্পী কেই  করি শ্রদ্ধা 
শিল্পী মনের বহর দেখে ছেয়ে যায় মুগ্ধতা।
দেবীমহিমার কুটোটি আমাকে ছোঁয়েনা।
সোনালী রোদে
শুভ্র মেঘের অবয়বে
কী যেন খুঁজে বেড়াই।


মা এর পরিবার ,বাহন ,ঐশ্বর্য ,
শাড়ি, গয়নার বাহার ,
মন্ত্র ,অঞ্জলির ঘটা ,
ধুনোর ধোঁয়া , ফুল বেলপাতা শিকে তুলে
প্যান্ডেল এর কারুকাজ দেখি চরম বিস্ময়ে।
মা কী সত্যি এলেন এই মর্তে ?



কবিতা / আজ আমার মা দুগ্গার ভাসান / নারা-য়ণ রায়।


আজ আমার দুগ্গা মায়ের ভাসান
চারিদিকে কত আয়োজন।
মা গেছে আজও বাবুদের বাড়িতে
সেথায় অনেক কাজ। দিনে এবং রাতে।
একবার মা'র সাথে দেখেছিলাম গিয়ে...,
বাড়ি ঘর জম-জমাট; কুটুক আর আত্মীয়ে।
বাবুরা কোল্ডিং খায় সোফায় বসে,
কি সব বাহারী নক্সা করা গেলাসে।
একদিন সে কথা বলতেই মাকে,
ঠাস করে চড় মারলে গালে,
গজ গজ করে আপন মনেই বলে;
'বাপটা তো ম'ল, ওসব ছাই-পাস গিলে...।'
পূজো প্রায় শেষ, আজ বিজয়া;
তবু হয়নি আমার নতুন জামা পাওয়া।
এত কাজের চাপ, তাই মাকে দেয়নি মাইনে।
বলে, আগে দিলে টাকা আসবি না আর এদিক পানে,
চিনতে তোকে নেইকো আমার বাকি,
কাজের বেলায় সারাদিনই ফাঁকি।
সেবার তোর বর না কে ম’ল
অমনি সাত দিনের কামাই হ'ল।
তবে আমার নামও ঋতাভরি,
আমার কাছে খাটবে না তোর জারিজুরি !'
তাই কেটে নিলাম সাত দিনের টাকা
এ বছর তাই বেতনটাকে আটকে রাখা।
ওরা মাকে পুজোয় দেয় না কোন ছুটি,
সারাদিই মায়ের চলে ভীষন খাটা খাটি।
মা না থাকলে আমারও হয়না ঠাকুর দেখা;
ভয়ে ভয়েই বাড়িতে তাই বসে থাকি একা।
বস্তির পাশের বাড়ির হরেনকাকুর মেয়ে রত্না
আমার সঙ্গে ওকেও এখন মিশতে কেউ দেয় না।
বলে, 'তোরা ছোট জাত, পরের বাড়ি করিস কাজ
নেহাতই এক পাড়াতে থাকিস আজ।'
তবে হরেনকাকু একদিন ছিল একা,
তার সঙ্গেই হ'ল সেবার ঠাকুর দেখা।
লজেন্স দিল কিনে, ফুচকাও খাওয়ালো,
তবুও তার সঙ্গ তেমন লাগলো না ভালো।
কাকুটা যেন কেমনতর? ভিড় যত বাড়ে;
আমার বারো বছরের শরীরটাতে ততই যেন হামলে পড়ে।
এবারেও একদিন এসে বলল, 'চল মোহর
টোটোয় করে তোকে ঘোরাবো গোটা শহর।'
আমি বললাম, 'না থাক', তাতেই বাবু গেল ভেগে
আমার উপরে রেগে।
তবে আজ মা বলেছে মাইনে পাবে,
জামা কিনতে, দোকানে যাবে;
রাতভর দেখব ভাসান, দুহাত ভরে প'রব চুড়ি,
প্রাণ ভরে খাব ফুচকা আর মশলামুড়ি।
তবে রাততো ক্রমেই বাড়ে,
তবু এখও মা এলো না ঘরে।
বড্ড ঘুম পায়, কি যে করি ?
উঃ যাই একটুখানি শুয়ে পরি।
খট খট খট......। ওই নিশ্চই মা এলো
কখনই বা সকাল হ'ল?
এ কি; বাইরে এত আলো কেন,
অনেক লোকের ভিড় যেন...?
তোমরা কারা সাত সকালে...!
আমার মাকে কোথায় রেখে এলে?
কি বলছ? মৃতদেহ? জামবাগানের মোড়ে?
রক্তাক্ত ধর্ষিতা? পাওয়া গেছে আজ ভোরে?
দুর তোমরা কি সব পাগল হ'লে !
আবোল তাবোল বকেই গেলে ?
আজ যে মা বলেছে মাইনে পাবে,
জামা কিনতে, দোকানে যাবে;
রাতভর দেখব ভাসান, দুহাত ভরে প'রব চুড়ি,
প্রাণ ভরে খাব ফুচকা আর একটু মশলামুড়ি।।


Photography / Making of Goddess Durga by Santanu Bose










Drawing by Rishijeet



Thursday, August 24, 2017

সম্পাদনা ও চিত্রাঙ্কন – গৌতম সেন / কারিগিরী সহায়তা – নূপুর বড়ুয়া..


সম্পাদনা ও চিত্রাঙ্কন – গৌতম সেনগুপ্ত

কারিগিরী সহায়তা – নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় / গৌতম সেন..


এখন আগষ্ট মাস – শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্র এল। বাতাসে শরতের অপেক্ষা তবু বিগত মাসখানেকের কিছু কম সময়েই মাতাল শ্রাবণ তার উদ্দামতার যে বিপর্যয়ের চিহ্ন রেখে গেল গোটা বাংলায়, ভাবলে শিউরে ওঠে মন। ঘোর প্লাবনের অশুভ ছায়ায় বিপর্যস্ত আজ সমগ্র বাংলা – প্রথমে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা বর্ধমান, হাওড়া, হুগলী, পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ন অঞ্চল জলের তলায়, বিশেষতঃ ঘাটালে জল এতটাই বেড়েছে যে অবস্থা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এরপর বৃষ্টির প্রাবল্য আরও বেড়ে ভাসাল উত্তরবঙ্গের বহু অঞ্চল – ডুয়ার্স, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়ি,ফালাকাটা, আলিপুরদুয়ার এমন বহু অঞ্চল এখন বানভাসি। সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন – সড়ক, রেলপথ বেশ কিছুদিন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আশার কথা এই যে সম্প্রতি গত দুদিন বৃষ্টির  তান্ডব একটু স্তিমিত হওয়ায়, জল নামতে শুরু করেছে এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ পূনস্থাপিত হয়েছে। দূর্গতদের অঞ্চলে ধীরে ধীরে সরকারী, বেসরকারী ও নানান স্বয়ংসেবক সংস্থা গিয়ে পৌঁছেছে, এখনও দলে দলে পৌঁছচ্ছে।
এরই মধ্যে বিষাদগস্থ মনে পালন হয়ে গেল দেশের একাত্তরতম স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠান। দেশের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সাধন কল্পে নতুন করে অনেক শপথ, প্রতিশ্রুতি যথারীতি মহা সমারোহে উচ্চারিত হল। আপামর দেশবাসীর মনে আশা জমা রইল সুদিনের জন্য।
শরতকাল আগতপ্রায়, শিউলি, কাশে আর কদিনের মধ্যেই ভরে উঠবে বাংলার মাঠ-ঘাট। মনে বাজতে শুরু করে দিয়েছে আগমনী সুর – বাংলার সর্বোৎকৃষ্ট উৎসব দূর্গা পুজো প্রায় এসে পড়ল, বাকি মাত্র হাতে গোনা কটা দিন।
উৎসবের দিন ভাল কাটুক আপনাদের সবার – একটাই আন্তরিক আবেদন জানাই, আনন্দের মাঝে চিন্তা-ভাবনার ভিতর সেই সব দূর্গত বানভাসিদের কথা একটু স্থান দেবেন। যে যেমন ভাবে পারেন, বাড়িয়ে দিন আপনাদের সহৃদয় সাহার্যের হাত। মনে রাখবেন এ আমাদের এক নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
অন্যান্যবারের মতই এ সংখ্যার জন্য ভাল সংখ্যায় আপনাদের লেখা জমা পড়েছে। সমস্ত রচনাকার ও বিপুল পাঠককুলকে চিলেকোঠা ওয়েবজিনের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

আসন্ন শারদীয়া উৎসবে সকলকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে আজকের মত শেষ করলাম।

ধারাবাহিক / স্বপ্নস্বরূপ - ৯ / ন ন্দি নী সে ন গু প্ত ..


     শ্রাবণ বিদায় নিয়েছে কিছুদিন হল। ভাদ্র মানেই কি বিরহ? ‘ভরা বাদর, মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির  মোর’... না, এই পদ রবীন্দ্রনাথের নয়; বিদ্যাপতির। তবে এই পদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের চরিত্র নিখিলেশের এই বিরহী উচ্চারণ শুনে প্রথমে চমকে উঠেছিলাম। অদ্ভুত এক ঘটনাপ্রবাহের বাঁকে ব্যবহৃত হচ্ছে এই পঙক্তিগুলি। বিশ্ববরেণ্য কবি তিনি; ইচ্ছে করলেই কি নিজে দুটি প্রাসঙ্গিক পঙক্তি লিখে উপন্যাসে ব্যবহার করতে পারতেন না সেই কবিতা? সেরকম ত করেছেন আমরা  দেখতে পাই ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে। একাধিক কবিতা নেমে এসেছে উপন্যাসের পাতায়। কিন্তু না; তিনি যে শুধুই কবি নন। তিনি সত্যদ্রষ্টা। চরিত্র নির্মাণ কিভাবে করবেন, কোন চরিত্রের ভাবনায় কেমন বীজ  বুনে দেবেন, এ কথা তার থেকে ভালো আর কে বা জানে? বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও নিখিলেশের দেশীয় সংস্কার প্রবল। সে ভারতবর্ষকে আত্মস্থ করতে চেয়েছে স্বদেশী স্বনির্ভরতার  মধ্য দিয়ে; বিদেশী বর্জনের অসহযোগের মধ্য দিয়ে নয়। ভারতবর্ষের আত্মার অনুভব রয়েছে তার চরিত্রের গভীরে। তাই প্রাচীন কবি বিদ্যাপতির পদ বারম্বার উচ্চারিত হয় উপন্যাসের এই সন্ধিক্ষণে, যখন নিখিলেশের সঙ্গে বিমলার দুরত্ব প্রকট হয়ে উঠছে। ভরা ভাদ্রের প্লাবনের মাঝে শূন্যতার হাহাকার জাগিয়ে তোলেন রবীন্দ্রনাথ আদি কবির পদ আশ্রয় করে।  
রবীন্দ্রনাথের বিশেষ প্রিয় ছিল এই পদটি। দেখতে পাই ‘জীবনস্মৃতি’ তে কবি লিখছেন... ‘আমার গঙ্গাতীরের সেই সুন্দর দিনগুলি গঙ্গার জলে উৎসর্গ-করা পূর্ণবিকশিত পদ্মফুলের মতো একটি একটি করিয়া ভাসিয়া যাইতে লাগিল। কখনো বা ঘনঘোর বর্ষার দিনে হারমোনিয়াম-যন্ত্র-যোগে বিদ্যাপতির ‘ভরা বাদর মাহ ভাদর’ পদটিকে মনের মতো সুর বসাইয়া বর্ষার রাগিণী গাহিতে গাহিতে বৃষ্টিপাতমুখরিত জলধারাচ্ছন্ন মধ্যাহ্ন খ্যাপার মতো কাটাইয়া দিতাম; কখনো বা সূর্যাস্তের সময় আমরা নৌকা লইয়া বাহির হইয়া পড়িতাম— জ্যোতিদাদা বেহালা বাজাইতেন, আমি গান গাহিতাম;’ এই সময়ে কবি তার জ্যোতিদাদার সঙ্গে চন্দননগরে কিছুদিন ছিলেন গঙ্গার ধারের একটি বাগানবাড়িতে। সময়কাল ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দ। অসাধারণ এক সুরসঞ্চার করেছিলেন কবি এই পদটিতে।  বিরহের এই পদ যেন এক অন্য মাত্রা পেয়েছে এই গানে। ‘দেশ’ রাগের  আশ্রয়ে বর্ষা এবং বিরহ মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে এই সঙ্গীতে। বিদ্যাপতি নিজেও কি জানতেন যে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর পরে এক কবি তার এই পদে সুর দিয়ে এটি একটি গানে রূপান্তরিত করবেন? প্রবল বারিপাতের মাঝে অসীম তৃষ্ণা- ‘ফাটি যাওত ছাতিয়া’, এই হাহাকারকে সঙ্গীতে পরিণত করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন প্রবল দুঃখের আঁধারের মাঝখান থেকেই উত্থিত হয় মধুর সঙ্গীত।
তবে কি কেবল বিরহ আর দুঃখের আঁধারের স্মৃতি কবির ভাদ্রমাসে? না, এতখানি একপেশে হলে আর তাকে ‘বিশ্বকবি’ বলি কেন? উচ্ছ্বাস নিয়ে আসে তার পঙক্তি, যখন সঙ্গীতে বেজে ওঠে ‘রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা’। ভাদ্র রেখে যায় এক অনির্বচনীয় আবেশ, কবি উচ্চারণ করেন, ‘মনে মনে ভাবি এসেছিল সে কে!’
শিশুপাঠ্য কবিতায় দেখি ভাদ্রমাসের আনন্দ। শুধুই কি ‘পাগলা বাঁদর’ এর সাথে অন্ত্যমিল টানার জন্য কবিতায় তিনি ‘পয়লা ভাদর’ এর অবতারণা করেছেন? মনে হয় না।  বর্ষা ঋতু শেষ হয়ে যাবার পরে শরতের আগমনের এই সন্ধিক্ষণের মুহূর্তগুলিই যেন ঝনঝনিয়ে বেজে ওঠে তার ছড়ার প্রতি ছত্রে। চিঁড়ে কোটার গল্প আসে, আসে ইলিশের ডিমভাজার গন্ধ। জীবনযাপনের রঙরস খেলাচ্ছলে এভাবেই তিনি লুকিয়ে রাখেন এক শিশুপাঠ্য কবিতায়। এই সন্ধিক্ষণের উপলব্ধি বারে বারে মূর্ত হয়ে উঠেছে তার অজস্র সঙ্গীতে...
‘আজ শরতের ছায়ানটে
      মোর রাগিণীর মিলন ঘটে
সেই মিলনের তালে তালে বাজায় সে কঙ্কণ।’
                 


কবিতা / সিঞ্চনের ঋণ../অনুপম দাশ শর্মা..



জল শুষে নেওয়া মূলরোম ভুলে যায়
সিঞ্চনের ঋণ
বদলে গেলে হাওয়ার মন
আমি নীরবতার চাষ করি তখন

কব্জিতে উপচে পড়ে কচি 
সবুজ পাতার আদুরে নিঃশ্বাস

আবার ওদের পিঠে হাত বুলিয়ে দিই
ততক্ষণ....

যতক্ষণ না ফুঁসে ওঠে 
কৃতজ্ঞতা হারানোর প্রবল জলোচ্ছ্বাস

কবিতা / ভ্রম / গৌতম সেন..



মাটির রসে যেমন উদ্ভিদ
বর্ষার সুধারসে যেমন নদী,
চাঁদের জ্যোৎস্নায় ভিজে তারাদের পরিবারও
মেতে ওঠে জীবনের গানে।
মাটি, জল, আলো
সবই তো আমার আছে,
ওরা যদি মাতে, তবু আমি মাতি কই?
মন কেন শুধু ধেয়ে চলে,
নিশিদিন ভালবাসা পানে?
উদ্ভিদ, নদী, তারারা -
তাদেরও তো মন আছে বলে জানি,
তারা বৃথা খুঁজে মরে না তো ভালবাসা!
মৃত্তিকা-রস, বরষার জল, জোৎস্নালোক
জোগায় তাদের প্রাণ ও ভালবাসা।
আমি তুমি সবাই মানুষ
আমরা যে বিশাল ব্যতিক্রম -
তাই আজীবন এই অন্বেষণ।
তার প্রতি ভরসা, সম্ভ্রম ভুলে মন

শুধু এ পথচলা পথে করে চলে ভ্রম!

কবিতা /প্লাবন / পিনাকী দত্ত গুপ্ত..



শিউলি ঝরার সময় এখনও আসেনি
 শরৎ এখনও গায়নি শিশির-গান,
বাধ ভাঙা জলে ভেসেছে জন-অরণ্য,
 ডুবে গেছে যত বিজাতীয় অভিমান!

শ্রাবনে শ্রাবনে বিষাদের ঘনঘটা;
তবুও বৃষ্টি নামুক নগর প্রান্তে,
যারা ভিজেছিলো রুক্ষ শরীর জুড়াতে,
বানভাসি ঢেউ তারা কি পেরেছে জানতে?

অচকিতে আজ ডুবেছে মানুষ, ঈশ্বর।
কেউ কি জানতো একদিন বাঁধ ভাঙবেই?
পরতে পরতে জমেছে পলিও বিস্তর,
 কেউ কি মানতো শ্রাবন মৃত্যু আনবেই?

কেউ কি শুনেছো মৃত্যু নামার শব্দ?
কেউ কি গুনেছো শবদেহ কত ভাসছে?
কেউ চিৎকার ক'রে কি কখনও বলেছো?
সাবধান হও, দানবী সুনামি আসছে?

আমরা সবাই মিথ্যার জাল বুনেছি!
যুগ-যুগান্ত নারকীয় খেলা চলছে;
ভূমিহীন শিশু একবিংশের শতকে ক্ষীণকায়,
তবু দৃষ্টি ওদের জ্বলছে।

মৃত্যুমিছিলে কেন আমি নেই, তুমি নেই?
সমতলে ব'সে আমরা লিখেছি 'কাব্য',
জলের গভীরে মশালের লাল আগুনে 
পুড়ছে কবিতা,পুড়ছে নদীর নাব্য।।

কবিতা / ভাল থাকা / অর্পিতা ভট্টাচার্য ..



ভালো থাকা যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিলে,
" ভালো থেকো "।
 সেই থেকে আমি ভালো আছি।
 হাসতে হাসতে আমি ভালো থাকি।
 কাঁদতে কাঁদতে আমি ভালো থাকি।
 বিরহ যন্ত্রনায় ছটপট করতে করতে আমি ভালো থাকি।
অপমানের আগুনে জ্বলতে জ্বলতেও আমি ভালো থাকি।
ভালো থাকার জন্যই আমি ভালো থাকি।
আমি জানি আমি ভালো আছি।
ভালো থাকাটা আমার অভ্যেস হয়ে গেছে।
 অনেক বছর পরে তোমার সাথে দেখা হলো।
 তুমি জিজ্ঞেস করলে " কেমন আছো "?
 আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
একটা দলা পাকানো কষ্ট আমার গলা চেপে ধরলো।
 " ভালো আছি " বলতে আমার এতো যন্ত্রনা কেন হচ্ছে ? কেন ?
এরকম হওয়ার তো কথা ছিলো না।
 আমি তো ভালোই ছিলাম, ভালো আছি, ভালোই থাকবো।
 তবে " ভালো আছি " বলতে কেন এই কষ্ট ?

 তবে কি এতো ভালো থাকার আরেক নাম "কষ্ট "?

কবিতা / অগন্তব্য সুখ/ অজেয় বিক্রম শিবু










কষ্টের দলাদলিতে অবাধ্য সময়ের কাছে হেরে যায়
 সুখসময়
আজকাল সুখ বার্তারা ডুব দিয়েছে যন্ত্রণাগ্রস্ত হয়ে।
জানো, মাঝরাতে যখন ঘুমাতে যাই চোখ দুটিকে 
এক করে
ঠিক তখন ঘনকালো অন্ধকারে সুখগুলো এলোপাতাড়ি 
চলতে থাকে অগন্তব্যে।
বুকের ভেতরে থমকে দাঁড়ায় তুমি বিষয়ক আশ্চর্য 
যন্ত্রণারা!
বারবার আমাকে তাড়া করে আবেগ; ভীতরে কষ্টক্ষরণ।
শুধু অবাক সাক্ষী থেকে যায় মাঝরাতে অন্ধকার ভেদ 
করে আসা আলো গুলো।

অনু কল্পগল্প / আদর্শ বনীকরণ / অরুণ চট্টোপাধ্যায়









এক লপ্তে বিশাল মাপের একটা জমি পেয়ে গেল রথীন। দেড়শ বছর আগের একটা পোড়ো জমিদার বাড়ি। এখন বাড়িটা আর আশপাশের জমিদারি জঙ্গলে পরিণত হয়েছে আর তেনারা মানে, লোকে বলে ভূতেরা তাদের খাশ দখলে নিয়েছে। ভূতেদের কাছ থেকে জমি পাওয়া সহজ কাজ নয়। অনেক কসরত করে এক ভৌতিক উত্তর পুরুষের হাত থেকে জমিটা ম্যানেজ করেছে সে।
হোক না আম, জাম, জামরুল, অশ্বত্থ, বট, শাল পিয়ালের জঙ্গল। প্রমোটারি বিজনেসে জমিই হল আসল মূলধন। টাকা ব্যাংক থেকে লোন চাইলেই পাওয়া যায়। কিন্তু জমি? তাছাড়া ভূতের জমি বলে খুব সস্তা। জলের না হলেও একেবারে ভুতের দরে। কী হবে এখানে জমি রেখে? আর মাথায় ভূত না চাপলে কি কেউ এখানে ফ্লাট করার কথা ভাবে?
কিন্তু এমন জঙ্গলে ফ্ল্যাট বাড়ি কি করলে সেগুলো কিনবেই বা কে? সবাই যখন ভেবে আকুল হচ্ছে তখন রথীন বলেছে, দেখবে না এখানে একেবারে ওয়ান্ডার ল্যান্ড বানিয়ে ছাড়ব। ফ্ল্যাট কেনার জন্যে বিশাল লাইন পড়বে। দশগুণ দামে বিকোবে সেগুলো।
সরকারী আধিকারিক কিছুতেই অনুমতি দেবে না। বলেন, জঙ্গল ধ্বংস করলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। পরিবেশ আইনে দেওয়া যাবে না।
--কিছু ধ্বংস হবে না স্যার। আমি আবার সব এনে দেব। দেখবেন পরিবেশকে একেবারে হাজির করে এনে দেব মাথার ওপর। মাথায় করে রাখব দেখে নেবেন স্যার।
এই নেতিবাচক বিষয়টাও ইতিবাচক হয়ে গেল। কোন মন্ত্রে আর কোন ফুলে রথীন পুজো করেছিল একমাত্র সেই জানে। ইষ্টনাম আবার মনে মনে না জপলে কাজ দেয় না। তাই বাইরের অন্য কেউ শুনতে পেল না।
ফ্ল্যাট হল। রাস্তা হল, লন, পোর্টিকো, শপিং মল, কী না ছিল সেই কমপ্লেক্সে। সবাই একেবারে তাক লেগে গেল। কে বলবে এখানে একটা জঙ্গল ছিল কিছুদিন আগেও?
ফ্ল্যাট আগে থেকে বুকিং হয় নি। রথীন বলেছিল, আগে দেখবেন তারপর বুকিং করবেন।
কিন্তু কমপাউন্ডে ঢোকার আগেই কমপ্লেক্স দেখে তো সবার চোখ চড়কগাছ হয়ে আকাশে চড়ল। সেই সঙ্গে চড়ল ফ্ল্যাটের দামও। পরিচিত মহল খুশি হয়ে বলল, দেখলে রথীনের ব্যবসা বুদ্ধি? এ ছেলের হবে।
মন্ত্রী, সান্ত্রী, সাংবাদিক সবাই দেখতে এল। এই চমৎকারিত্বের কথা ফলাও করে লিখতে হবে কাগজের পাতায়। দেখাতে হবে টিভির পর্দায়।
খাতিরে সন্তুষ্ট হয়েও কিছু সাংবাদিক বেয়াড়া প্রশ্ন তুলল, কিন্তু পরিবেশের অনেক ক্ষতি হল রথীনবাবু। এ আপনাকে স্বীকার করতেই হবে। হাজার হাজার গাছ কাটা পড়ল। কত অক্সিজেন কমল। কত কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাড়ল। কত জীবজন্তু মরল। ইকো সিস্টেম ঘা খেল। কত পাখি উড়ে গেল। শ্রুতিনান্দনিকতা ব্যহত হল---
বাকিটা আর বলতে দিল না রথীন। শুধু বলল, সঙ্গে আসুন।
লিফটে চড়ে দশতলা ফ্ল্যাটের মাথায়। সবাই যে বিস্ময় কী ভাবে প্রকাশ করবে ভেবে পাচ্ছে না। বিশাল একটা বন। গহন অরণ্য। পাখি কিচকিচ করছে। পাহাড়ের মাথা ঝিকমিক করছে। ঝরণা কলকল করছে। এমন কী বাঘ ভালুক, শেয়াল, বন বেড়াল, বেঁজি, ময়াল কী নেই। আর সব জীবন্ত।  
কে বলে সিন্থেটিকে প্রাণ নেই? বিজ্ঞান আছে তবে কী করতে?


অনু গল্প / আমি ভয় করবনা ভয় করবনা' / উৎসব দত্ত


'রোববার সকালে বারান্দায় বসে আছি। পাশের বাড়ির প্রশান্ত জেঠুর গলার আওয়াজ ভেসে আসছে। পাশাপাশি বাড়ি। প্রায় এবাড়ি ওবাড়ির মতো। কথা বললে সব শোনা যায়। জেঠুকে মনে হল খুব উত্তেজিত হয়ে ফোন করছেন কাউকে। বোধহয় শালা বাবু হবেন জেঠুর জিগরি দোস্ত। 'এই ভাবে আর চলতে পারেনা। আমার পক্ষে আর মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। যা বলেবে তাই করতে হবে নাকি? আমারও একটা মতামত আছে। তোমার দিদির সব কথা আমি আর মানবনা ভাই। এইভাবে আর চলতে পারেনা। কি ভেবেছে কি? আমার বাড়ি এবার থেকে আমার কথা মতো চলবে।' হঠাৎ ফোন বন্ধ হতে কৌতহল বশত জানলা দিয়ে উঁকি মারলাম। দেখি বাজারের ব্যাগ হাতে জেঠীর আগমন। গর্জন শুরু হতে বুঝলাম সকালের বাজার হয়নি তখনও - 'সারাদিন ফোনে বকবক করলে হবে ? বলি বেলা দশটা বাজে। বাজারটা কি বাড়ি এসে দিয়ে যাবে?' জেঠীর কথা শেষ হতে না হতেই জেঠু প্রায় পরিমড়ি করে জেঠীর হাত থেকে ব্যাগটা ছোঁ মেরে নিয়ে বাজারের দিকে দিলেন এক ছুট।

অনু গল্প / হঠাৎ / সুজয় চক্রবর্তী




বাড়ির পাশের মাঠে একটা বাচ্চা মেয়ে খেলছে। নিজে নিজেই। বয়স তিন কি চার। ওর নাম পামেলা। অফিস যাওয়ার সময় এদৃশ্য রোজ দেখে অনিন্দ্য। নতুন চাকরি। বাড়ি  থেকে বেরোয় কাটায় কাটায়। অফিস ফেরতও সেই এক ছবি। মিষ্টি একটা মেয়ে। খালি গা। সারা পায়ে ধুলো।
মাঝেমাঝে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে বাচ্চাটার মা। কখনও চোখাচোখি হয়। কখনও নি:শব্দে বেরিয়ে যায় অনিন্দ্য। আসলে এ পাড়ায় সে নতুন।
আজ যাওয়ার সময় দেখলো বাচ্চা মেয়েটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। থেমে গেল সে।
---- কি হয়েছে তোর, কাঁদছিস কেন?
---- মা মেরেছে।
---- নিশ্চয় দুষ্টুমি করেছিস!
---- না, আমি কিছু করিনি...
---- আচ্ছা, দাঁড়া তোর মা'কে বকে দিচ্ছি।
নিচু হয়ে ওর চোখদুটো মুছে দিল অনিন্দ্য।
খেয়াল করেনি সে। সামান্য তফাতেই দাঁড়িয়ে শিউলি। বাচ্চাটার মা। সব শুনেছে! অনিন্দ্য দেখলো লজ্জামাখা মুখটা। বেশ মোহময়ী।
বকা তো দূর অস্ত। কোনও কথাই বলতে পারলো না অনিন্দ্য।
বিয়ের বছর খানেকের মাথায় বাইক অ্যাক্সিডেন্ট হল তরিতের। চিকিৎসা চললো ছ'মাস। সরকারি হাসপাতালে। প্রথম দিকে কিছুটা ভালোর দিকে ছিল। শেষে কিনা ভুল চিকিৎসায় মারা গেল! শিউলির পেটে তখন পামেলা। সেই থেকে বাপের বাড়ি।
আসলে গীতা দে'র মতো যার শাশুড়ি কপালে, তার সংসার জীবনে তো অনেক কষ্ট!  শিউলিও ঝড়ে পড়লো অকালে; মা-বাবার সংসারে।
অনেক অনেক দিন, তাকে কেউ বকেনি। শুধু সান্ত্বনা দিয়ে গেছে সবাই।
আজ হঠাৎ শিউলির মনে হল  এবার তাকে কেউ বকুক।


একটি ছোট গল্প / পিকুর স্বপ্ন /নারায়ণ রায়।




ছোটবেলায় পিকুরা ছিল বেশ গরীব। সাতজনের সংসার বাবার সামান্য বেতনের উপর নির্ভরশীল। সেই সাত বছরের পিকু বাবার সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে দেখত, কি সুন্দর ছোট্ট শহর ! রাস্তার দু'ধারে ছোট ছোট দোকানগুলি কত রকমের রঙ্গীন পসরায় সাজানো। কাচের বয়ামে থরে থরে রাখা সাধারন গুলি লজেন্স, লেবু লজেন্স থেকে শুরু করে রঙ্গীন কাগজে মোড়া চকোলেট। পিকুর খুব ইচ্ছে হ'ত অমন সোনালী রাংতায় মোড়া চকোলেট একটা খেয়ে দেখতে, ওগুলো নিশ্চই খেতে খুবই সুস্বাদু হবে।


সেই সময়ে একটা ভালো চকলেটের দাম বড়জোর আট আনা, কিন্তু চাইলে বাবা বলতেন ওসব খেতে নেই। খেলে পেটের অসুখ হয়, দাঁত পচে যায় ইত্যাদি। পিকু অবাক হয়ে ভাবতো যে জিনিস খেলে পেটের অসুখ হয় কিম্বা দাঁত পচে যায়, সে জিনিস দোকানদাররা বিক্রি করে কেন? আবার ঐ দোকান থেকেই তো বাবা তেল মশলা ডাল কেনে? সেগুলো খেয়ে তো আমাদের পেটের অসুখ করে না কিম্বা দাঁত পচেও যায় না? আর এই না পাওয়া থেকে সেই সাত বছর বয়সে শিশু পিকুর মনে একটা জেদ চেপে গিয়েছিল। একদিন পিকু মনে মনে ঠিক করল, পড়াশোনা করে চাকরি পেলে জীবনের প্রথম মাসের বেতনের পুরো টাকাটা দিয়ে প্রচুর চকোলেট কিনবে আর সে একা একা সব খাবে। বাবা চাইলে একটাও দেবে না। এর পর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। দিদিদের বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইরাও সবাই কিছু না কিছু উপার্জন করছে।


স্কুল কলেজের পড়া শোনা শেষ করে গ্রামের ভোদাই পিকুও একদিন কলকাতায় একটা চাকরি পেল। কিন্তু কি আশ্চর্য? সে আজও ভোলেনি সেই চকোলেটের কথা। শিশু পিকু বুঝতো না যে এক মাসের বেতনে এক বস্তা চকোলেট হয়, অতো চকোলেট খাওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তবে প্রথম মাসের বেতন পেয়ে ২৪ বছরের পিকু ঠিক করল অন্তত আজ একটা খুব ভাল চকোলেট খেয়ে জীবনের প্রথম বেতন পাওয়ার দিনটি সেলিব্রেট করবে। যেমন কথা তেমনই কাজ। জীবনের প্রথম মাসের বেতন পাওয়ার উন্মাদনা আর তার সঙ্গে সন্ধ্যে ছ'টার অফিসপাড়ার কলকাতার ফুটপাথের ভীড়। ধর্মতলার একটা ফুটপাথের ধারের একটা ছোট্ট দোকান থেকে একটা বেশ ভাল মিল্কবার কিনে তার মোড়কটি ছিঁড়ে সবে মুখে এক কামড় দিয়েছে এমন সময় একজন ব্যক্তির কনুই-এর ধাক্কায় মিল্কবারটি ছিটকে গিয়ে পড়ল একেবারে ফুটপাথের একপাশে। আর গ্রামের ভোদাই পিকু বোকার মত তাকিয়ে দেখল যে একেই বলে কলকাতা শহর !! যার হাতের ধাক্কায় ওর জীবনের এত বড় স্বপ্নটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল সে দেখেও না দেখার ভান করে দৌড়ে একটা চলন্ত বাসে উঠে পড়ল।


পিকু এক দৃষ্টিতে আধ খোলা আধ কামড়ানো মিল্কবারটির দিকে তাকিয়ে যখন কি করবে ভেবে উঠতে পারছে না ঠিক তখনই একটা বছর সাতের অত্যন্ত জীর্ন চেহারার মলিন বসনের ছেলে কোথা থেকে দৌড়ে এসে মিল্কবারটি হাতে তুলে নিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর মিল্কবারটি সমেত হাতটা তুলে পিকুকে ফেরত দিতে চাইল। পিকু ওর হাতটা ধরে টানতে টানতে ফুট পাথের এক পাশে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালো। ছেলেটি ভয় পেয়ে ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করল। ঠিক এই সময়ে ছেলেটির চেয়ে বছর খানেকের ছোট ওই রকমই জীর্ন চেহারার মলিন বসনের একটি মেয়েও কোথা থেকে দৌড়ে এসে ছেলেটির হাত থেকে মিল্কবারটি কেড়ে নেওয়ার জন্য কান্না-কাটি শুরু করলো। ওদের নিজেদের মধ্যে কান্না-জড়ানো কথা থেকে পিকু বুঝতে পারলো মেয়েটি ওই ছেলেটিরই বোন। তখন সে ছেলেটির হাত থেকে মিল্কবারটি নিয়ে পকেটে রেখে দিল এবং পাশের দোকান থেকে ঐ একই রকম আরও দুটি মিল্কবার কিনে মোড়কটা একটু করে খুলে ওদের দুজনের হাতে দিয়ে পরম আদরে ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “তোরা দুজনে এই চকোলেট দুটো পুরোটাই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাবি আর বলবি কেমন খেতে? আমি তোদের এই খাওয়া দেখব।”


বাচ্চা দুটি কেমন যেন ঘাবড়ে গেল। রাস্তায় বাবুদের কাছে কিছু চাইলে তারা তো বকা ঝকা করে এমনকি মারধোরও করে কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন বাবু এই ভাবে দামী চকোলেট কিনে দিয়ে আদর করে বলেনি “তোরা খা আর আমি তোদের খাওয়া দেখব।” বাচ্চাদুটির চোখে জল। কিন্তু যে মুহুর্তে তারা চকোলেটে কামড় দিল এক স্বর্গীয় আনন্দে ভরে গেল তাদের মুখমন্ডল। আর ভাইবোন পরস্পরকে উদ্দেশ্য করে বলল, “কি সুন্দর খেতে তাই না ? ইস কি মিষ্টি।” তাদের খাওয়া যখন প্রায় শেষ সেই সময়ে একজন অতি শীর্ন দেহের মহিলা হন্ত দন্ত হয়ে দৌড়ে এসে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “আরে পিকু তুই বোনকে নিয়ে এতদুর চলে এসেছিস, আর আমি তোদের সেই কখন থেকে খুঁজে চলেছি।”


পিকু ভদ্রমহিলাটিকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার ছেলের নাম কি বললে?” 
মহিলাটি বলল, “আজ্ঞে, আমার ছেলে নাম পিকু।”
পিকু আরও জিজ্ঞেস করল, “ওর বয়স কত?”
মহিলাটি বলল, “আজ্ঞে সাত বছর।”
বা্চচাদুটির মায়ের উপস্থিতিতে পরম নিশ্চিন্ত হয়ে পিকু আস্তে আস্তে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো। কিছুটা গিয়ে একটা ডাস্ট-বীন দেখতে পেয়ে সেই পড়ে যাওয়া মিল্কবারটি পকেট থেকে বের করে ডাস্ট-বীনে ছুড়ে ফেলে দিল।।


সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া