Tuesday, October 24, 2017

শিরোনাম : দুর্ঘটনা ? / দূর্বা মিত্র


ইন্সপেক্টর সৌমাভ সান্যাল হাতের ফাইল থেকে চোখ তুলে জানলার বাইরে কাঠচাঁঁপা গাছটার দিকে তাকায় | নাহ - হিসেবে কোথাও গরমিল আছে | অংকের ছাত্র সৌমাভ সন্তুষ্ট হতে পারছে না ।ফাইল এর বর্ণনা অনুযায়ী সহজ সরল "দুর্ঘটনা" নামক উপসংহার এ সই করতে ও পারছে না |

সুনীল সরকার মানুষটি খুচরো গুঁড়ো মশলার ব্যবসায়ী, অবিবাহিত, হিসেবী, অনাড়ম্বর জীবন যাপন এ অভ্যস্ত | তিনতলার উপর থেকে পড়ে গিয়ে মাথা ও মেরুদন্ড ভেঙে মৃত্যু হয়েছে । পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট সহ ফাইল এসেছে সৌমাভর টেবিল এ - সই করে কেস ক্লোস করে দিলেই হলো |

সেখানেই সৌমাভ কোথাও হোঁচট খাচ্ছে | লোকটার চরিত্র ও জীবন যাত্রার সাথে শেষ দশ মিনিটের হিসেবে আকাশ পাতাল তফাৎ |

তিনতলার যে ঘরে থাকতো - সেটা তে তিনটে দরজা - দুটো জানলা | করিডোর দিয়ে ঘরে ঢুকলে ঘরের মাঝখানেএকটা সেকেলে খাটপার হয়ে যে দেওয়াল - তাতে দুটো জানলা | একটার সামনে একজোড়া টেবিল চেয়ার , আরেকটা জানলার পাশে একটাস্টিলের আলমারি | ব্যাস - আর কোনো আসবাব নেই | অন্য দুটি দেয়ালে দুটি দরজা | বাঁঁ দিকের দরজাটা বাথরুম |
ডানদিকের দরজাটা ই গোলমালের মূল সূত্র |

মাস ছয়েক আগেও ওই  ডানদিকের দেয়াল ঘেঁষে খাট থাকতো | ছাদে যেতে তিনটে তালা খুলতে হয় বলে সুনীল বাবুওই দেওয়াল কেটে একটা দরজা আর একটা ছোট ব্যালকনি বানিয়ে নেন | মাস তিনেক খুব খুশি ছিলেন - ওখানে বসেই চা খাওয়া,কাগজ পড়া,দাড়ি কামানো - সব করতেন |

হঠাৎ কর্পোরেশন থেকে নোটিশ আসে - ওই বারান্দা বেআইনী - ভেঙে ফেলতে হবে | সুনীল বাবু তাই করলেন | শুধু দরজা সরিয়ে দেওয়াল গেঁথে দেয়া বাকি ছিল |

জানলা খোলা থাকতো - সেদিকেই মাথা করে শুতেন |

রাতে একবার বাথরুম যেতেন - খাট থেকে নেমে ডান দিকের দরজা |

বাঁ দিকে কোনোদিন যান নি - দরজা খুললেই সোজা নিচের চাতাল এ পতন |

"দুর্ঘটনা" সেভাবেই ঘটলো | বাথরুমের দরজা ভেবে বাঁদিকের দরজা খুলে পা বাড়ালেন মৃত্যুর দিকে |

এইখানেই সমীকরণে ধাক্কা খাচ্ছে সৌমাভ | যে মানুষ কোনোদিন বাথরুম যেতে বাঁদিকের দরজা খোলেন না -- ওই রাতে কেন খুললেন ? আত্মহত্যা ? কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না ৬৭ বছর বয়েসী মানুষটার ফাইল এ |

সৌমাভ বেল বাজিয়ে জীপ্ বার করতে বলে নিজেই একবার বাথরুম যায় | তারপর ফাইল আর দুই সহকারী নিয়ে রওনা দেয় অকুস্থলের দিকে |

তিনতলার ঘরে ঢুকে ফাইল এ রাখা ফটোগুলির সাথে মিলিয়ে দেখতে থাকে সব কিছু | সহকারী দুজন টেবিল আর আলমারি দেখে নেয় | খাট টা একটু দেখে সৌমাভ | ভুরু কুঁচকে তাকায় মাথার আর পায়ের দিকের কারুকাজ করা রেলিং এর দিকে | উঁচু দিকটামাথা - নিচু দিকটা পা | সেটা জানালার দিকে ! বুট সমেত শুয়ে পড়ে বালিশে মাথা দিয়ে -- হাত দুটো লম্বা করে দুপাশে ছড়ায়ে তর্জনী উঁচু করে |

লাফ মেরে উঠে এক সহকারীকে বলে সব জানলা দরজা খুলে দিয়ে ঠিক ওর মতো করে শুয়ে পড়তে  - আরেকজন কে বলে দোতলা থেকে সুনীলবাবুর গোমস্তা সহদেব কে সপরিবারে ওপরে আসতে | মোবাইল এ খবর পাঠায়ে থানা থেকে মহিলা পুলিশ সহ আরো ফোর্স পাঠাতে |

দোতলায় সহদেব থাকে তার দুই ছেলে, স্ত্রী ও বড়ো ছেলের বৌকে নিয়ে | এক তলায় থাকে এক ঠাকুর ও এক চাকর - সেই পড়ে যাবার আওয়াজ শুনে বাইরে গিয়ে মৃতদেহ দেখে থানায় ফোন করে |

সিঁড়ির সব তলাতেই গ্রিলের গেট - রাতে তালা পড়ে - চাবি সহদেবের কাছে থাকে |
সহদেবরা বলেছে তারা কিছু শোনেনি, দেখেনি, কিছুই জানে না | পুলিশ যা বলেছে - তাই জানে যে দুর্ঘটনায় মৃত্যু |

তারা উপরে এসে দেখে সৌমাভ টর্চ নিয়ে খাটের তলায় উপুড় হয়ে প্রত্যেকটা পায়া দেখছে - একটি কনস্টেবল খাটে দু হাত ছড়িয়ে শুয়ে আছে | আরেকজন করিডোর এর দরজায় - হাত কোমরের পিস্তলে |

সৌমাভ উঠে দাঁড়ায় | সহদেবের বৌমাকে জিজ্ঞেস করে,"হাতে পিঠে খুব ব্যথা - তাই না ?"
মেয়েটি ঘাড় নেড়ে হাঁ বলেই চমকে আর সবার দিকে তাকায় -- সবার চোখে রাগ দেখে মাথা নিচু করে |

সৌমাভ হেসে ফেলে | সহদেব কে  বলে, " যে মানুষটা এতবছর ডান দিকের দরজা খুলে বাথরুম গেলো - সে হঠাৎ বা দিকের  দরজাটা বারান্দা জেনেও খুলবে কেন ? রোজ সকালে স্নানের পরে আলমারির
মাথায় রাখা লক্ষ্মী - গণেশ কে যে  পুজো দেয় -- সে হঠাৎ সেদিকে পা দিয়ে শোবে কেন ? জবাব দিন সহদেব বাবু !"

পাঁচ  জন নিশ্চুপ | থানা থেকে আসা মহিলা পুলিশ আর বাকি সহকারীদের সৌমাভ বলে ঘিড়ে দাঁড়াতে | সহদেবের দিকে ঘুরে বলে, "চলুন - বাকি কথা থানায় হবে |"

পাঁচ জন এবার আর্তনাদ করে ওঠে | সৌমাভ এক ধমক দেয়, " সে রাতে সুনীল বাবু ঘুমোনোর পরে পাঁচজন  এসে ওনার খাটের চারটে পায়া ধরে পুরো উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেন - মহিলারা দুজন একটা পায়া তুলেছিলেন - তাও ব্যথা করছে বৌমার পিঠে | পায়াগুলো এতবছর একভাবে থাকাতে যে দাগ পড়েছিল - ঘুরিয়ে দেওয়াতে দাগে দাগ মেলেনি |

 যে এখন শুয়ে আছে - তার ডান হাত ভাঙা দরজার দিকে - বা হাত বাথরুমের দিকে - পা ঠাকুরের আসনের দিকে | সেই রাতে সুনীলবাবু অভ্যেস মতো ডান দিকেই গেছিলেন | আপনারা ওনার সম্পত্তি আর ব্যবসার লোভেই "দুর্ঘটনা" ঘটার ব্যবস্থা করেন | চলুন - বাকি কথা থানায় হবে |"



রম্য রচনা / পুজো পরিক্রমা- সময়ের উল্টোরথে / -অরুণ চট্টোপাধ্যায়


রাত তখন দশটা। আমার দু’চাকাটা ঘড় ঘড় করে যাত্রার সূচনা করল। তারপর ফার্স্ট গিয়ার, সেকেন্ড গিয়ার থার্ড গিয়ারে ভর করে যেই চড়তে যাবে গতির পাহাড়ে অমনি এক রামধাক্কা। গলাধাক্কার থেকেও প্রবল এ ধাক্কার নাম প্রতিমা দর্শনার্থী। পুরীর সমুদ্রে যখন ঢেউয়ের পরে ঢেউ আসতে থাকে তখন মাথা উঁচিয়ে থেকেছেন কি? যিনি থেকেছেন তিনি ক্রমশ চলে যাচ্ছেন সমুদ্রগর্ভে অর্থাৎ বেলাভূমি থেকে অনেক দূরে। আমারও অবস্থা খানিকটা তেমনই। সেই মহাভীড়ের ভয়ে ভীত আমার দ্বিচক্রযান তার ইঞ্জিনকে পৌঁছে দিয়েছে থার্ড গিয়ার থেকে আবার ফার্স্ট গিয়ারে। আমার বাঁ পা যথারীতি মাথা নত করেছে মাটিতে।   
ক্লাচকে অতি কষ্টে চেপে ধরে অ্যাকসিলারেটর ঘোরাচ্ছি সন্তর্পণে। মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখছি খানিকটা গরুচোরের মত। কিন্তু ব্যাকগিয়ারেও (যদিও এটা কোনও দু’চাকার গাড়িতে থাকে না।) নো এন্ট্রি। ভীড় এসে ট্র্যাফিক পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ।
পুজো প্যান্ডেলকে বাঁ হাতে পাশ কাটিয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরেছি নিরূপদ্রব পরিভ্রমণের উদ্দেশ্যে। এখানে নেই আলোর উজ্জ্বলতা। কিন্তু সেই আধা-অন্ধকারে কলকাকলির কমতি নেই। আলোআঁধারির এই লুকোচুরিতে অভাব নেই হাস্যপরিহাসের। অভাব নেই যথেষ্ট রস নিনিময়েরও। আমার দু’চাকার গিয়ার সেকেন্ড হয়েই রইল থার্ড আর হতে পারল না।
গলি থেকে রাজপথ—কোনরকমে তো এসেছি। রাজপথে পা দিয়ে মাথা ঘুরছে বনবন করে। কোথায় পা রাখব আমি মানে আমার চাকা? কালো পিচের বদলে শুধুই কালো মাথা। এ সময় উপগ্রহ থেকে তোলা কোনও ভিডিও চিত্র দেখলে মনে হবে অসংখ্য কালির ফোঁটা বুঝি নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে।
ক্লাচের চাপুনিতে আমার গাড়ি রুদ্ধশ্বাসে ফুঁসছে। দুই থেকে এক নম্বরে আবার হয়েছে গিয়ারের অধঃপতন। পা ছুঁয়েছে মাটিকে (মাঝে মাঝে আবার চলতি মানুষের বিছোন পায়ের পাতার কার্পেটে। নিখঞ্জ আমি খোঁড়াতে খোঁড়াতে কেমন ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে চলেছি। আমার গাড়ির হর্ণের তারস্বর সম্মিলিত কোলাহলে ঢাকা পড়ে গেল। পদযাত্রিদের সতর্ক করার প্রয়াসে আমিই সর্বদা সতর্ক আর ভয়ে কাঠ হয়ে রইলাম। গাড়ি চালানোর মহাসুখ আমি টের পেলাম হাড়ে হাড়ে।  
নদীর স্রোতের মত ভিড় এগিয়ে চলেছে। রাস্তায় আলোর বিশেষ সমারোহ নেই। মাথার ওপর অদূর আকাশে বিছোন মিড়মিড়ে মিনিয়েচারের তারকামন্ডলী আর মাটির নিচে তার অস্পষ্ট কম্পিত ছায়া। এটাই নাকি এ যুগের ফ্যাসান। ভীড়ের ঘনত্ব এখানে তুলনায় অনেক কম। ছায়াছায়া সেই ভাবগম্ভীর পরিবেশে টুকরো টাকরা কথা। কেমন যেন আধি দৈবিক পরিবেশ।
কত গলি কত রাস্তা। আগে দেখিনি। কিংবা দেখেছি হয়ত খেয়াল করিনি। কিংবা খেয়াল করেছি মনে রাখিনি। দূরে প্যান্ডেল দেখা যাচ্ছে। না প্যান্ডেল নয়। এ তো একটা বিয়ে বাড়ি। বিশাল আলোকমালায় সজ্জিত এক প্রজাপতি। সানাই বাজছে। আশ্বিন মাসে বিয়ে হয় কিনা ভাবতে ভাবতেই আর এক বাধা। এখান থেকে শুরু হল ডিভাইডার। পথ মেপে দিল দড়ির বন্ধন গ্রন্থি। প্রবেশেচ্ছু আর নির্গমোনেচ্ছুদের আলাদা পথ। গাড়ি এখানে রেখে হয়ত সিকি কিলোমিটার হাঁটতে হবে।
ফিরে এসে আবার চলা (মানে গড়ানো আর কি)। কতদূর গেছি আর কত ঠাকুর দেখেছি মনে নেই। কেননা ভাবে হঠাৎ বিভোর হয়েছি আমি। অতি আধুনিকতার মাঝে অতিপ্রাচীনতাও আমাকে আবিষ্ট করে রেখেছে। হঠাৎ সোমনাথের মন্দির আমার সামনে। পুলকিত আমি মুহূর্তে অনুভব করি আমার সামান্য দু’চাকায় গুজরাট ভ্রমণ করছি আমি। তার মানে আমার সামনে একঝাঁক রিপোর্টার আর ক্যামেরা পার্সন। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে হাত-পা-মুখ নেড়ে আমি ব্যক্ত করছি আমার সুদীর্ঘ কষ্টকর ভ্রমণ কাহিনী। এই বয়েসে আমি সেলিব্রিটি হয়ে গেছি। আর আমাকে পায় কে।
--প্যান্ডেলটা দারুণ তাই না? মনেই হয় না এটা একটা প্যান্ডেল। আহা কি দারুণ টেকনিক!
কে যেন বলল পাশ থেকে। আর হয়ত আমার নীরবতাকে তার মতের সমর্থক ধরে নিয়ে চলে গেল আর সময় নষ্ট না করে। চলে গেল আমাকে পেছনে ফেলে। কারণ মুগ্ধতার রেশ তখনও কাটে নি আমার।
সত্যি তো। গুজরাটে নয় আমি রয়েছি এই বাংলাতেই। আর হুঁকোমুকো হ্যাংলার মতই অবাক বিস্ময়ে চোখ আমার ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। তারপর এক এক করে কোথাও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কোথাও অজন্তা ইলোরার গুহা আবার কোথাও খাজুরাহো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চোখের সামনে থিমের পর্দায়। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্থাপত্য, ভাস্কর্য সব কিছু যেন নিপুণ মোড়কে উপস্থাপিত। নকল যে আসলকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে এটা যেন আবার একবার উপলব্ধ হল।
থিমের এই আশ্চর্য মলম দু’চোখে মেখে আমার দু’চাকার রথ ভীড়ের মধ্যে দিয়ে শ্লথ গতিতে। হঠাৎ একটা বিশাল ঝাঁকুনি দিল গাড়িটা তারপর আবার চলতে লাগল। এই ঝাঁকুনিটা অবশ্যই ছিল থিমের এই জগৎ ছেড়ে অন্য কোনও জগতে যাওয়ার গিয়ার পরিবর্তনের ঝাঁকুনি।
বিশাল বিশাল প্যান্ডেল যেন আকাশকে ছোঁয়ার পাল্লায় নেমেছে। বিরাট বিরাট গেট। আধ কিলোমিটার জুড়ে আলোকের কেরামতি। রামরাবণের যুদ্ধ থেকে কারগিল যুদ্ধ কি নেই? যেন জেনারেল নলেজের সচিত্র প্রদর্শনী। প্যান্ডেলের গেটে পর্দা ঝোলান। মা এখানে পর্দানশিন। গেটের বাইরে আধ মাইল জুড়ে দর্শনার্থীদের সাগ্রহ সারিবদ্ধ অপেক্ষা। কচ্ছপকে লজ্জা দিয়ে এগিয়ে চলেছে সে লাইন। মনের মাঝে অচেনা পর্দাখানা কিন্তু উঠে গেল সহসা। আরে এ তো আমার চেনা চেনা যেন। হ্যাঁ আমার গাড়ির ঝাঁকুনি-গিয়ার আমাকে প্রায় দেড় দশকের বেশি পিছিয়ে দিয়েছে। স্মৃতির ডায়রিখানার পাতা কে যেন উলটে উলটে জানিয়ে দিল এটা ঠিক।  
আলো আলো আর আলো। প্যান্ডেলের বিশালতা আর বিস্ময়ভরা বৈচিত্র। এসব ছাড়িয়ে আমার গাড়ি আবার ঝাঁকুনি দিয়ে এগিয়ে (পড়ুন পিছিয়ে) চলেছে। ভীড় যেন বেশ একটু কমে গেছে। প্যান্ডেল যেন নয় আর বাক্সবন্দীও। মা এখানে বেশ খোলামেলা আবহে আছেন। আলোর তান্ডব বেশ একটু কম। প্যান্ডেলগুলোও আকারে আর উচ্চতায় বেশ একটু ছোট। মাইকে তারস্বরে বাজছে হিন্দিগান। ছেলেমেয়ে সব সে তালে মেতেছে। মেয়েদের থেকে ছেলেরাই সংখ্যায় অনেক বেশি। প্রতিমার মুখগুলিও যেন চেনা চেনা লাগছে। মনের চোখে ভেসে ওঠে কত বলিউডি দৃশ্য।
গাড়িতে আবার একটা ঝাঁকুনি। কারা যেন সমস্বরে বলাবলি করছে, ব্যাকগিয়ার! ব্যাকগিয়ার!!
আমার গাড়ির ঝাঁকুনি-গিয়ার আমাকে আবার নিয়ে গেল গত শতকের সাত দশকের এপার ওপার। প্যান্ডেলে ভীড় তখনকার হিসেবে গাদা হলেও এখনকার হিসেবে তেমন কিছুই নয়। ডিজে দূরে থাক, বক্স পড়ে থাক—চোঙা মাইকে আধুনিক গান বাজছে। লতা, আশা, সন্ধ্যা, হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, পিন্টু, তালাদ, কিশোর, আরতি, বনশ্রী, পান্নালাল, ধনঞ্জয়, পঙ্কজ, আরতি আরও আরও কত। কখনও মাইকে বাজছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের দরদী-ভরাট গলায় মহালয়ার চন্ডীপাঠ। তখন মহালয়ার ভোর থেকেই বাতাসে শিউলি, পদ্ম, শালুকের সঙ্গেই শুভ্র শারদীয়ার পুজো পুজো গন্ধ ভেসে বেড়াত।  
প্যান্ডেল ধূপ আর ধুনোর গন্ধে আমোদিত উৎফুল্ল। সোনাগলা রোদ্দুরটা কড়া হলেও মানুষ সইয়ে নিচ্ছে দিব্বি। কেননা শরৎ এসেছে, শারদীয়া হেসেছে। ঢাকের ডাক যেন মনের মধ্যে ছড়িয়ে দিত অদ্ভুত এক মাদকতা।  
সারা বছর যে সব জামাকাপড়ের দোকান মাছি খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়ে বেড়াত মারার জন্যে তারাই এখন গায়ে মশা বসলেও মারার সময় পাচ্ছে না। তখনও মাল্টি ন্যাশন্যাল হয় নি। প্রাইভেট সেক্টর বলে কোনও শব্দ আছে কিনা সে সব নিয়ে সাধারণ মানুষ মাথা ঘামাত না। ছেলেমায়েদের সারা বছরের জামাকাপড় হত এই সময়। তাও বছরে দুই বা তিনটির বেশি নয়। সেই নিয়েই উদবাহু হত। বাড়ি বাড়ি সবাই ঘুরে ঘুরে পুজোর জামাকাপড় দেখতে বেরোত। উৎসবের আগে সেও ছিল এক আকর্ষণীয় মহা উৎসব। নস্টালজিয়া শব্দটি তখনও কিছু প্রোথিতযশা সাহিত্যিকের কলমে আটকে ছিল। প্রবেশ করে নি সাধারণ্যে। প্রবেশ করার দরকার হয় নি। তখন পৃথিবীর ঘূর্ণন বেগ এখনকার মত প্রচন্ড ছিল না। জগৎ পাল্টাত খুব ঢিমেলয়ে।
তারপরে এক কান্ড। আবার এক প্রকান্ড ঝাঁকুনি। গাড়ি কোথায়? আমি শুয়ে আছি বাড়িতে। পাশে আমার মা। ঘুম ভেঙ্গেছে ‘দুর্গা মাইকি’ এই আনন্দ উচ্ছ্বল চিৎকারে। আমরা সবাই উঠে পড়েছি। এই পঞ্চমীর রাত আমাদের যেন এক মহা জাগরণের রাত। ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা পৌনে দুটো। হুড়মুড় করে সবাই সেই গভীর রাতেও বাইরে। ল্যাম্প পোস্টের অল্প আলোয় লড়িটা এগিয়ে আসছে ঢিমেতালে পিঠে প্রতিমা নিয়ে। লড়ির পিঠে ঠাকুর নয় যেন একটি গোটা বাঙালি পরিবার। মধ্যরাত থেকে তিনটে চারটের মধ্যে পাড়ার রাস্তা দিয়ে পিঠে মাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া লড়ির দল। এ পাড়া ওপাড়া সেপাড়া। এরা শুধু প্রতিমাই বয় না। বয়ে নিয়ে আসে আসন্ন শারদীয় আনন্দকেও।
প্রতিমা দেখার পর আমরা শুয়ে পড়েছি। গুরুজনের ভ্রূকুটির ধার এখন একটু কম। হাই এসেছে গন্ডায় গন্ডায় কিন্তু ঘুম আসে নি। মা বলল, দেখতে দেখতে পঞ্চমী এসে গেল। মনে হচ্ছে যেন এই তো সেদিন পুজো গেল।
বোন বলল, পঞ্চমী কি গো মা। মহালয়ার ভোর থেকেই তো পুজো লেগে গেল। ওঃ এই চারপাঁচ দিন যে কিভাবে কাটিয়েছি। শুধু ভেবেছি পঞ্চমী কবে আসবে। এই রাতে ঠাকুর দেখতে খুব মজা তাই না ভাই?
পঞ্চমীর সেই রাতটা কি আর ঘুমোতে পেরেছি? কখন যে ষষ্ঠীর সকালটা আসবে। কনমতে মুখটা ধুয়েই ছুটতে হবে প্যান্ডেলে। চা খাবার সময় পর্যন্ত থাকবে না। প্রতিমা কেমন হল দেখতে হবে। অসুরের মাসল গুলো কত ফুলো কিংবা সিংহের হাঁ টা কত বড় তা দেখার প্রবল বাসনা আমাদের। সরস্বতীর হাঁস কিংবা গনেশের ইঁদুর ঠিক দিয়েছে তো? মা লক্ষ্মীর প্যাঁচা বা কার্তিকের ময়ূর? সে পেখম ছড়িয়েছে বেশ। আমাদের কৌতূহলী কল্পনার সঙ্গে বাস্তবটাকে মিলিয়ে নিতে হবে তো?
এখনও প্রতিমা অসজ্জিতা। অস্ত্র আর গয়না বা অন্য সাজ পরান হবে আজ রাত্রে। এ ক’দিন আর বই খোলা নয়। আমাদের মাত্রাছাড়া পরিশ্রমের মধ্যে তাদের কিছু বিশ্রাম। এসে গেল সপ্তমী। কলাবৌকে কেমন দেখতে লাগছে দেখ পেট মোটা গনেশের পাশে। লাল শাড়ির ঘোমটা দেওয়া কলাবৌ। বাজছে ঢাক, বাতাসে উড়ছে ধূপ ধুনোর গন্ধ, ঢাকের আওয়াজ আর পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের গমগমে আওয়াজ।
সপ্তমী থেকে আবার প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে পুজো দর্শন। তখন গাড়িতে করে প্রতিমা দর্শন ছিল এক দুঃস্বপ্ন। গাড়ি বলতে তখন বোঝাত রিক্সাকেই। মোটর গাড়ি যাদের থাকত তাঁদের সংখ্যা ছিল তা হিসেব করার জন্য জোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগের কোনও দরকার ছিল না। একমাত্র খুব অসুস্থ বা ধনীদেরই রিক্সায় চেপে ঠাকুর দেখতে দেখেছি। তাদের সেই ঠাকুর দর্শনও ছিল আমাদের অবাক-দর্শনের তালিকাতেই। হেঁটে হেঁটে পা ব্যথা হয়ে গেলেও ঠাকুর দেখার আনন্দ কিছুতেই ম্লান হয়ে যেত না।
সপ্তমীর সন্ধ্যায় হত আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। অষ্টমীতে অন্ন চলবে না। লুচি, বেগুনভাজা, কুমড়োর ছক্কা আর সুজির হালুয়া। অষ্টমীর সন্ধিপুজো ছিল দেখার মত। রাত আড়াইটের সময় হুড়মুড় করে উঠে পড়েছি। আশ্চর্য! এত রাতেও পুজো দেখতে এত ভীড়! সেই ভীড়ের মধ্যে কোনও রকমে মাথা গলিয়ে দিয়েছি আর দেখছি এক মহা বিস্ময়কে। একশ আটটা প্রদীপ জ্বেলে সন্ধি পুজো হচ্ছে। পরে জেনেছি এই সময়টা হচ্ছে অষ্টমী আর নবমীর মহা সন্ধিক্ষণ। অষ্টমী যাচ্ছে আর নবমী আসছে। তাই নবমীতে বড় মন খারাপ হয়ে যেত। পুজোর শেষ।
দশমীর দিনটা হল দুঃখ আর আনন্দের এক সহাবস্থান। উৎসবের শেষ এই কারণে দুঃখ আবার এইদিন সবাই একসঙ্গে মিলিত হবে সেই কারণে বড় আনন্দের। এইদিন হল মিলনের দিন। (বর্তমানে হয়ত ডিজে বাজিয়ে অন্যের হার্ট আর কান ফুটো করার দিন)। এদিন মাংস খেতে হয়। তখন মুরগীর মাংসের চল তেমন ছিল না। আর ব্রাহ্মণদের তো নাম করা বা মনে আনাটাই ছিল গর্হিত কাজ। সেই হিসেবে মুরগী আমাদের বাড়িতে কোনদিন আসত না। এমন কি রেস্টুরেন্টেও বিশেষ সহজলভ্য ছিল না।
বিকেল থেকে শুরু হত আমাদের এক মহা অভিযান। এর দুটো অংশ ছিল। একটা হল যারা আসবেন আমাদের বাড়িতে প্রণাম করতে বড়দের বা সমবয়সীদের সঙ্গে কোলাকুলি করতে তাদের অভ্যর্থনা করা। আর দ্বিতীয়টা হল পাড়ায় আমাদের থেকে বয়স্কদের বাড়ি গিয়ে তাদের প্রণাম করা। এই কাজ খুব ভাল লাগত আমাদের। অধিকাংশ বাড়িতেই মিষ্টি তৈরি হত। নারকোলের ছাপা, নাড়ু। দোকানে হত বড় বড় গজা, মিহিদানা আর বোঁদে। আর হত সুন্দর ঘুঘনি। একটানা মিষ্টির মরুভূমিতে এটাই ছিল স্নিগ্ধ এক মরূদ্যান।
রাত বোধহয় ভোর হয়ে এল। ফেরার সময় দেখা সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে। যাবার সময় যিনি বলেছিলেন, একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন? শরীর টরির----
--হ্যাঁ, এলার্জিক ব্রংকাইটিস তো। শ্বাস যে বশে থাকে না আমার সব সময়।
ফেরার সময় তিনি বললেন, আপনাকে এখন বেশ চাংগা লাগছে। ঠাকুর দেখার একটা গুণ আছে কি বলেন?
--ঠাকুর দেখা নয়। একটা অপারেশন হল যে। আর তাতেই—
--অপারেশন! কি অপারেশন? কোথায়? লাঙে নাকি মশায়? খুব চিন্তিত সে ভদ্রলোক।
--লাঙে নয় লঙে। আশ্বস্ত করে আমি হাসতে হাসতে বলি, অপারেশন টাইম মেশিন। বোধহয় অন্তত অর্ধশতক পিছিয়ে গিয়েছিলাম। পৌঁছে গিয়েছিলাম আমার ছেলেবেলায়।
--টু হুইলারে ব্যাক গিয়ার পেলেন কোথায় দাদা? ভদ্রলোক হাসলেন। খুব রসিক কিনা।
--মনের ইঞ্জিনে সব থাকে মশাই। স্মৃতির পেট্রল ঢেলে চলে যান না মাইলের পর মেইল। যতদূর খুশি। তবে পেছনে যেতে যেতে একসময় ভীষণ ধাক্কা খাবেন। অনেক কিছু হারিয়ে ফেলার বেদনার ধাক্কা হজম করা খুব কষ্টকর জানেন? অতএব—
--অতএব টপ গিয়ার জিন্দাবাদ ব্যাক গিয়ার মুর্দাবাদ। হো হো করে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। খুব অমায়িক আর রসিক কিনা।
আমি ফার্ষ্ট গিয়ার থেকে আবার টপ গিয়ারে। বাড়ি ফিরতে হবে তো? সূর্য উঠে পড়েছে। ও বেচারির তো কোনও ব্যাক গিয়ার নেই।    



কবিতা /প্রথম ফাগুন / অর্পিতা ভট্টাচার্য


 ও আমার কিশোরী বেলা,
 ও আমার সবুজ মন,
 কেন ওমন আঁচল টানিস?
 হয় যে মন উচাটন।
                                         
 মনের ওই আগুন টুকু
 থাকনা ছাইতে চাপা।
 উড়িয়ে স্মৃতির ধুলো,
 কেন শুধু কষ্ট মাপা ?

 দিব্যি কাটছে জীবন,
জীবনের সত্যি ছুঁয়ে।
 তবে কি, খুঁজে বেড়াস,
 ফেলে আসা সেই সময়ে ?

 অবুঝ ওই পাগল মনে
 কেন তুই সময় পুষিস ?
 নতুন এই স্মৃতির ভিড়ে,
 কাউকে কেন খুঁজিস?

 হারানো সময় যেমন ,
 যায়না ফিরিয়ে আনা,
 তেমনি কারও মাঝে,
 কাউকে খুঁজতে মানা।

 স্মৃতিকে খুঁজে না ফিরে,
 ও আমার অবুঝ মন,
 ধরে রাখ মনের ঘরে,
 তোর প্রিয় প্রথম ফাগুন।





কবিতা / আত্মহত্যা / সোমা দে



এক তরঙ্গায়িত সাপ খেলা করে অতিনির্জনে,
মস্তিষ্ক থেকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে
পায়ের পাতায় বা আরো অনেক কিছুতে।
প্রতিলিপি লেখা হয় প্রতিদিন,
চোখ কখনও দেখে ; কখনও বা হৃদয়!
নিরুচ্চারে উড়ে যায় নীরব বসন্ত-
থেমে থাকে অনাবিল অপেক্ষা....
নীল নির্জনে জন্ম নেয় অনেক স্বপ্ন।
আর তারপর,
আস্ত একটি হৃদয়,
আত্মহত্যা করে প্রতিরাত্রে!

কবিতা / নতুন অধ্যায় /প্রজ্ঞা পারমিতা ভাওয়াল


এক ঝুড়ি বিষাদ নিয়ে বসলে  এসে গা এলিয়ে ,
যেন হৃদয় জুড়ে  খাচ্ছে  উঁই ;
এতো মেঘাচ্ছন্ন  মুখ বড্ডো বিরক্তিকর
আমার শাঁকচুন্নি হাসির আওয়াজে
আরো বিরক্তি ছেয়ে গেলো যেন।

বলি, হলোটা  কী ?
ক্ষতবিক্ষত? 
গড়ে দিলে কে ?  কি ভাবে?
বিষাদের, বিরক্তির ,অভিমানের ,দুঃখের আলপনা কখনো  হয় মনোরম।
ভালোবাসার মায়াপাশ কাটাও ;
ভুলচুকের কাহিনীগুলো বিসর্জন দেয়া যায়না?
ক্যারেক্টার এনালিসিস,মন এনালিসিস , মস্তিষ্কের চিন্তার এনালিসিস
ঊফফ চরম অসহ্য
উত্তাল সুনামি।
ধ্যাৎ।
ক্ষত কে পরিত্যক্ত করো  দক্ষতায়।
মনের  বিষাক্ত অসুখ সোজাসাপটা ভাবনার কোলাকুলিতে ভরিয়ে
ফোটাও  পারিজাত।
কণামাত্র কোঁদল নয়
চোখে  জ্বালা উঠুক ,বালিশ না ভেজে।
নিশ্চুপ থেকেই  উঠে দাঁড়ালে,
অপছন্দের হলো আমার বাচালতা। 
স্বপনের ঝড়, ছুঁড়ে ছেনে বিধস্ত তুমি ;
যেন পথটা গড়ে দিলে,
বাতলে দিলেই সা করে চলে যাবে, নতুন অধ্যায়ে ।


অনুগল্প / কংগ্রাচুলেশন / উৎসব দত্ত



প্রায় এক বছর আগে শুভর সাথে পায়েলের আলাপ চ্যাট করতে করতে সারা রাত কাটিয়ে দিত ওরা সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার শুভর ইনবক্সে মেসেজ ভেসে উঠত "উঠে পড়ো ভীতুরাম" মাঝে মধ্যে দেখাও করতো ওরা রবিবার করে সপ্তাহের মাঝে ছুটি পেতনা যেহেতু ভার্চুয়াল সম্পর্কের টানাপোড়েনে ধীরে ধীরে চ্যাটের শব্দগুলো কমতে থাকল পায়েলের ভীতুরাম আর ইনসোমনিয়া  তে ভোগে না একটা মিথ্যে তার পেছনে আরও একটা মিথ্যে অথচ দুজনেই সব কিছু বোঝে শুধু সত্যি বলার সত সাহসটুকু কেউ দেখাতে পারছেনা প্রেম হওয়া আর প্রেম করার মধ্যে যে তফাত সেটা ধীরে ধীরে শুভ বুঝতে পারছিল পায়েলের আবদার গুলো মেটাতে না পারা কিম্বা ভার্চুয়াল শুভর সাথে রক্তমাংসের শুভর তফাত পায়েলকে হতাশ করছিল কিন্তু পায়েল এই নিয়ে কোনোদিন অভিযোগ করেনি বরং ভালবেসে মেনে নিতে শিখেছিল আজ সত্যিটা বলতেই হবে শুভ মনে মনে ঠিক করে রেখেছে পায়েলকে বন্ধু হিসেবে সারাজীবন পেতে চায় কিন্তু প্রেম আর সম্ভব নয় এটা শুনে পায়েলের কি রিএকশন হবে সেই ভাবতে ভাবতে শুভ বুঝল ওর মনের কোনে এখনও সামান্যতম একটি জায়গা পায়েলের জন্য রয়ে গ্যাছে জিন্সের সাথে কালো চশমায় পায়েলকে আজ যেন একটু বেশি সুন্দরী লাগছে শুভকে দেখেই পায়েল হেসে বলল অ্যাই জানো তো কাল আমায় দেখতে এসেছিল বাবার অফিসের কলিগের ছেলে, মুম্বাইতে একটা অ্যাড এজেন্সিতে চাকরি করে সামনের মাসে বিয়ের দিন ফাইনাল করে ফেলবে ওরা শুভ কি বলবে বুঝতে না পেরে বলল্‌,"বাহ কংগ্রাচুলেশান।“




অনুগল্প / ইন্টার্ভিউ /সুজয় চক্রবর্তী


তারাপদ'র মেয়েটা ছোট থেকেই পড়াশোনায় ভালো। এম.এ তে ফার্স্টক্লাস। বি.এডে ভর্তি হল, সেখানেও ফার্স্টক্লাস। হাওয়ায় ভাসছিল কথাটা, "ওর চাকরি এবার পাক্কা।"
কনফিডেন্স বাড়ছিল কোয়েলের। সবাই যখন বলছে....।
আর আজই খবরটা দিল বাবা, মহাদেবপুর হাইস্কুলে ওরই সাবজেক্ট -এ ডেপুটেশন ভ্যাকেন্সিতে একজন টিচার নেওয়া হবে। বি.এড অগ্রগণ্য।  বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠলো কোয়েল।
পাড়াতুতো বৌদি তিথিকে সঙ্গে করে ইন্টার্ভিউ -এর দিন সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে হাজির কোয়েল। ইতিমধ্যেই অনেক প্রতিযোগী এসে ভিড় করেছে সেখানে। কোয়েল সেসবে পাত্তা দিচ্ছে না। তার তো বি.এড আছে, রেজাল্টও ভালো। বেশ খোশমেজাজেই। হঠাৎই কিছু স্থানীয় ছেলে কোয়েলকে ঘিরে ধরলো।
একজন দাঁত বার করে বললো, "ম্যাডাম, লোক ঠিক করাই আছে, বুঝলেন! আপনি আসতে পারেন।" অবাক হয়ে গেল কোয়েল। ইন্টার্ভিউই হল না, লোক ঠিক হয়ে গেল!
কোয়েল রাজনীতি বোঝে না। ধীরে ধীরে ইন্টার্ভিউয়ের সময় অতিক্রান্ত হল। বুকের ভেতর জেগে ওঠা স্বপ্নটাকে বুকেই চেপে রেখে তিথিকে বললো, " চলো বৌদি।"
বাড়ি ঢুকতেই মা বললো,         "কিরে, কেমন হল সব?"
---- খুব একটা খারাপ না। যাই, জামাকাপড় চেঞ্জ করে আসি।
কোয়েল এখনও জানে না এই রঙিন পৃথিবীটাই কখন যে কি রঙ ধারণ করে।
তবে এই মুহূর্তে সে ঘুটঘুটে  কালো রংটাই দেখছে।


ধারাবাহিক /দিয়ার ডায়েরী্ থেকে /৮ম পর্ব / পারমিতা চ্যাটার্জী


নিশ্চিন্ত সন্ধ্যার অবকাশে দিয়া মাঝে মাঝে ডায়েরী লিখতে লিখতে ভাবে তাদের সময় মেয়েরা কি ভাবে  লাঞ্ছিত হত তার কোন হিসাব কেউ রাখেনা। মানসিক নিগ্রহ তো বটেই কত মেয়েকে যে নির্মম ভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অসময়ে প্রাণ বলিদান দিতে হয়েছে তার কোন হিসাব নেই। খবরের কাগজে দু এক দিন লেখালেখি হল, কোর্টে কেস উঠ্‌ল, উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার সেই কেস ধামাচাপা দিয়ে পয়সার জোরে বেরিয়ে গিয়ে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াতে লাগল। ১৯৭৩ সালে এক নামকরা ইংরাজী মাধ্যম বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রিন্সিপালের স্ত্রীকে খা্বারে বিষ মিশিয়ে খুন করা নিয়ে খবরের কাগজে  খুব  খুব হইচই হয়, মধ্যবিত্ত বাড়ির উচ্চশিক্ষিতা মেয়েও সামাজিক নিগ্রহের হাত থেকে রেহাই পায়নি, তার উচ্চবিত্ত শ্বশুরবাড়ীর লোকেরা টাকার জোরে মামলা জিতে বেরিয়ে গেল। ৭০ দশক থেকে ৯০ দশক বা তার পরেও অনেকদিন সামাজিক পটভূমি খুব খারাপ ছিল, পণের জন্য কত মেয়েকে যে পুড়িয়ে মারা হয়েছে তার কোন হিসাব নেই । কটা বিচার হয়েছে, কজন জেল খেটেছে কেউ বলতে পারবেনা, সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে দিয়ার শ্বশুরবাড়ী তো ভালো।তারা আর যাই হোক শারীরিক নির্যাতনের কথা কখনও ভাবেনি, বা বৌকে মেরে ফেলব এ কথা চিন্তার মধ্যে আনেনি, সত্যি কথা বলতে দিয়ার শ্বশুরবাড়ী থেকে কি দিল কতখানি দিল এ নিয়ে কোনদিন মাথা ঘামান নি। তাদের মেজাজটা ছিল মধ্যযুগীয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মেজাজ, সমস্ত কাজ ঠিক সময়ে হবে যা চাইব তাই করে দিতে হবে মুখে রা কাটা যাবেনা বা মুখ গম্ভীর করা যাবেনা, বাড়ীতে যত অতিথি আসুক হাসিমুখে সবাইকে যত্ন করতে হবে, ইত্যাদি। নিজের জীবন বা নিজের পৃথিবী বলতে কিছু থাকবেনা, দিয়ার শশুড়বাড়ীতে বাড়ীর ছেলেমেয়েরা গান করেছে ফাংশন করত তারজন্য রিহার্সাল চলত বাড়ীর ছেলেমেয়েদের । দিয়া অসহায় ভাবে তাকিয়ে থাকত, তার মনও ডুবে যেত গান আর সংগীতের সুর ছন্দে, কিন্তু বাড়ীর সবাই যদি গান কবিতায় মত্ত থাকে তবে সংসারটা চলবে কি করে? দিয়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে অতিথিদের জন্য চা জলখাবারের ব্যবস্থা করত , রাতের রান্নার মেনু ঠিক করত । হয়ত অন্তরের  টানে মাঝে মঝে আসরে গিয়ে বসত ঠিক সেই সময় তার স্বামীই তাকে বলত তুমি কিছুই খেয়াল করনি , দেখছনা সন্তুদা এসেছে ওর চা জলখাবারটার ব্যবস্থা কর। আসর শেষ হলে কাজের মেয়েদের দিয়ে ঘর পরিস্কার করিয়ে বাসন পত্র নীচে নামিয়ে এনে ধোয়ার ব্যবস্থা করে নীচে নেমেছে , তখনি শ্বশুরমশাইয়ের আবার আর এক রাউণ্ড চায়ের ফরমাস হল সেইসাথে এক হাঁড়ি গরম জল কারণ তাঁকে বাথরুমে যেতে হবে তাই গরম জল চাই। তখন ঘরে ঘরে গিজারের ব্যবস্থা ছিলনা , তা হয়েছিল অনেক পরে।
বাথরুম থেকে ফিরে এসেই তিনি বললেন রাতের খাবারের কি ব্যবস্থা করেছ? তাঁর মেনু পছন্দ হলনা হয়ত, ছেলেকে ডেকে বললেন বাবু দু কিলো মাংস নিয়ে এসোতো , রাতে জামাইরা খাবে । রান্নার ঠাকুর বলল বৌদি এতো পারবনা তাহলে অন্য লোক রেখে দেবেন , দিয়া দেখল সর্বনাশ তাহলে সেতো আরো ঝামেলায় পড়ে যাবে , দিয়া তাড়াতাড়ি ঠাকুরকে ঠাণ্ডা করার জন্য বলল ঠিক আছে তোমায় করতে হবেনা আমি করে নিচ্ছি। খেতে বসে সবাই হয়ত বলল আঃ মাংসটা যা হয়েছে না , নিশ্চয় দিয়ার হাতের রান্না খেয়েই বোঝা যাচ্ছে। দিয়া নিজেকে নিজেই বোঝালো ,’দিয়া এইটুকুই তোমার প্রাপ্তি এর চেয়ে বেশী আর চেয়োনা’। সত্যি কি তাই ? দিয়া কি এতই সাধারণ ? দিয়ার বাবা্  কলকাতা তথা বাংলা দেশের শিক্ষিত সমাজের সাহিত্যিক এবং গবেষক হিসাবে স্বনামধন্য ছিলেন, কর্মজগতেও একজন উচ্চ পদস্থ অফিসার ছিলেন , সে নিজেও স্কুল কলেজে ভালো ছাত্রী বলে পরিচিত ছিল , মাত্র ২২ বছর বয়েসে বিয়ে হয়েছিল, তারি মধ্যে আবৃতি করে বেশ কয়েকটা প্রাইজ এনেছিল, তার কি আর কিছুই প্রাপ্য নেই শুধুই ভাল রাঁধুনি । দিয়া যে নিজের জগতটাকে প্রতিদিন একটু একটু করে মেরে ফেলছিল , তার সূক্ষ্ণ অনুভুতি গুলোকে মনের আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছিল অবসাদগ্রস্ততার শিকার হয়ে পড়ছিল , সে খবর কেউ রাখতনা, এমনকি তার স্বামীও না। মধ্যযুগীও প্রথাতেই সে বিশ্বাসী, বাড়ীর বউয়ের এটাই কাজ এটাই ধর্ম। অথচ নিজে সে বাইরের উন্মত্ত ক্লাব পার্টি নিয়ে ব্যস্ত, যেখানে অনেক মহিলা উগ্র আধুনিক সাজপোষাকে নিজেদের মেলে ধরত , দিয়ার প্রশ্নের উত্তরে সে বলত ওদের সাথে তোমার তুলনা কোর না। যার স্বামী নিজের স্ত্রীকে বোঝার এতটুকু চেষ্টা করেনি, সে অন্য কার কাছ থেকে কি আশা করবে? তাই লাঞ্ছনা অপমান গঞ্জনার মধ্যে দিয়ে তার জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল শুধু তার মধ্যেই সে একটা কাজ খুব জেদের সঙ্গে করত তা তার দুই মেয়ের ক্ষেত্রে, তাদের মানুষের মতন মানুষ করার জন্য আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়ে গেছে । সেখানে সে কোন রকম কার্পণ্য করেনি বা কারও কথায় কান দেয়নি।
বাংলা প্রতি ঘরে খুঁজলে এরকম অনেক দিয়া পাওয়া যাবে যারা শুধুমাত্র চোখের জলকে সম্বল করেই জীবন কাটিয়েছে, কেউ প্রতিবাদ করেছে , কেউ বা মেনে নিয়েছে, কেউ বা বেশী প্রতিবাদ করতে গিয়ে অসময়ে জীবনকে হারিয়েছে।
ক্রমশ


Monday, October 2, 2017

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া


সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় / গৌতম সেন

সম্পাদকীয় -
এ মাসের পত্রিকা প্রকাশ অনেকটাই এক শোকাচ্ছন্ন মনের বহিঃপ্রকাশ। সেপ্টেম্বর মাসের এক তারিখ, বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতই খবরটা এল – আমাদের অতি প্রিয় সদস্যা তনুশ্রীদি আমাদের সকলকে কাঁদিয়ে ইহলোক ত্যাগ করলেন। এমন সদালাপী, গুণী মানুষ চিলেকোঠা পরিবারের সকলের কাছে কতটা আপনজন ছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর কণ্ঠভরা সুর, মিষ্টি গানের ডালি আমাদের সবার কাছে ছিল এক পরম সম্পদ। এযাবৎ প্রায় সমস্ত অনুষ্ঠানে চিলেকোঠার দাবী বা অনুরোধ যাই বলি না কেন, তিনি হাসি মুখে মিটিয়ে এসেছেন। আমরা মুগ্ধ হতাম তাঁর সঙ্গীত পরিবেশনে। আজ আর তিনি আমাদের মাঝে নেই, তাঁর সেই সুরেলা উপস্থিতি হঠাতই স্তব্ধ হয়ে গেল।
গত ১৪ই সেপ্টেম্বর, আমাদের প্রিয় তনুশ্রীদিকে মনের নিবিড় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে তাঁদের সল্ট লেকের বাসভবনে এক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সে অর্থে শোকসভা যতটা নয়, সেদিনের সন্ধ্যা ছিল বরং এক আন্তরিক স্মৃতিচারণের ক্ষণ। চিলেকোঠার বেশ কিছু সদস্য-সদস্যা উপস্থিত হয়েছিলেন পরম শ্রদ্ধেয়, পরমপ্রিয় এই মানুষটি সম্বন্ধে তাঁদের মনের মাঝে জমে থাকা অনেক অনেক কথা প্রকাশ করার ইচ্ছায়। খুব সুন্দর করে বললেন সৈয়দ হাসমত জালাল মহাশয় তাঁর নিজের স্মৃতিচারণের অবকাশে। কবিগুরুর গান উদ্ধৃত করে তিনি জানালেন মৃত্যু বিচ্ছেদ ঘটালেও সে চলে যাওয়া কখনও ই চলে যাওয়া নয় – যিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান, তাঁর উপস্থিতি বেঁচে থাকে পিছনে ফেলে যাওয়া আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, আপনজনেদের উপলব্ধির মাঝে। জালালদার এই তাৎপর্যময় ব্যাখ্যা সমগ্র স্মরণসভার মূল সুর যেন বেঁধে দিয়েছিল। একে একে তনুশ্রীদির স্মরনে উপস্থিত সকলেই তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ব্যক্ত করলেন। তিনি গান ভালবাসতেন, তাঁর সেই ভালবাসাকে সম্মান জানিয়ে কিছু গানও পরিবেশিত হ’ল এই স্মরণসভা অনুষ্ঠানে। তনুশ্রীদির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা জানাই।
আসন্ন শারদীয়া উৎসব – দুর্গাপুজো ভাল কাটুক সবার। আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল ঘরে, সকল মনে। এই শুভকামনা জানিয়ে আজ শেষ করলাম এখানেই।


ধারাবাহিক / স্বপ্নস্বরূপ - ১০ / ন ন্দি নী সে ন গু প্ত


বর্ষার দীর্ঘ ধারাপাতের শেষে শরত প্রকৃতিতে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ। শরত আকাশের রূপ দেখে যে কোনও বাঙালি মনে মনে যে সুর গুণগুনিয়ে ওঠে, তা হল, ‘নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা’। যে ছন্দে নেচে ওঠে বাঙালির হৃদয় তা হল,
‘আজি কি তোমার মধুর মূরতি
     হেরিনু শারদ প্রভাতে!
হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ
     ঝলিছে অমল শোভাতে।’
কী ভাবে বাঙালি অগ্রাহ্য করতে পারে এই প্রকাশভঙ্গিমা? প্রকৃতির এই উৎসবকে আর কোনও কবি কি বাঁধতে পেরেছেন এত সুন্দর শব্দ দিয়ে, যা একই সঙ্গে সহজ অথচ দোলা দিয়ে যায় মন-প্রাণকে এক গভীর ভাবের স্পর্শে। শরতের এই মিশ্রভাবটি কবি নিজে অনুভব করেছেন বলেই প্রকৃতির উৎসবের আবেশ, উচ্ছ্বাস পৌঁছে দিতে পেরেছেন তার পাঠক/ পাঠিকাদের হৃদয়ে।

কবি বলছেন, ‘শরৎকালের মধ্যে আমি একটি নিবিড় গভীরতা, একটি নির্মল নিরতিশয় আনন্দ অনুভব করি’। এই যে গভীরতার মধ্যে আনন্দের অনুভব, অতি সংবেদনশীল মন না থাকলে তা সম্ভব নয়। কবি অনুভব করেন কাশফুলের  তন্তুপাপড়ির গায়ে মৃদুবাতাসের ছোঁয়াটুকু। অনুভব করেন বর্ষণশেষের হাল্কা হয়ে যাওয়া মেঘের চঞ্চল গতায়াত। রোদ্দুরের সোনার রেণু রেণু আলোর অলঙ্কারে সেজে ওঠা প্রকৃতিকে তিনি বিশেষভাবে দেখতে পান, তাই লেখেন তার নয়ন- ভোলানো রূপের কথা।
‘কোথায় সোনার নূপুর বাজে,
বুঝি আমার হিয়ার মাঝে-
সকল ভাবে, সকল কাজে পাষাণ-গালা সুধা ঢেলে।’

এই উৎসবঋতু কবিমানসে একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। কবি বলেছেন ‘চাষিদের ধান-পাকানো শরত, আমার গান-পাকানো শরত’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরতের গান কেবলমাত্র প্রকৃতির উৎসবমুখর রূপবর্ণনা নয়, এক অনুভবের গভীরে অবগাহন। ভাবটি বিশেষ পরিপক্ক রূপ ধারণ করেছে বেশিরভাগ গানে, কখনও আবার নিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রার এক ভাব; উদাহরণস্বরূপ ‘তোমার মোহন রূপে’ গানটিতে প্রকৃতির ধ্বংসের কথা, ঝড়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। প্রকৃতি সুন্দর হলেও তার ভীষণ, ভয়াল রূপটিকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা মানুষের আজো হয়নি। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, অশ্রুজলের মধ্য দিয়ে মানুষ এই ভয়ঙ্কর সুন্দরের পূজা সাঙ্গ করে। অদ্ভুতভাবে ‘শরত’ ঋতুর পর্যায়ের মধ্যেই কবি এই বিশেষ গানটিকে স্থান দিয়েছেন।  

শরত-উৎসব নিয়ে কবির বিভিন্ন লেখার মধ্যে যে কবিতাটি সম্ভবত বাঙালি কোনওদিন ভুলবে না, সেটি হল ‘পূজার সাজ’। শিশুপাঠ্য বইয়ে স্থান পেলেও, শিশুদের নীতিশিক্ষা মূলমন্ত্র হলেও, এই কবিতার ভাবনা সব্বার জন্য প্রযোজ্য। এই বিশেষ মূল্যবোধের শিক্ষা আমরা ভুলেছি বলেই হয়ত উৎসবের সুর আর সেভাবে আমাদের স্পর্শ করে জাগিয়ে তুলতে পারেনা অন্তরের আলো, আমরা হয়ত বুঁদ হয়ে থাকি বাইরের চাকচিক্যের দেখানেপনায়।
        
‘জীবনস্মৃতি’ তে একজায়গায় দেখি তিনি বাল্যকালের সঙ্গে বর্ষার এবং যৌবনের সঙ্গে শরতের তুলনা করছেন। কবি লিখছেন, ‘তখনকার জীবনটা আশ্বিনের একটা বিস্তীর্ণ স্বচ্ছ অবকাশের মাঝখানে দেখা যায়— সেই শিশিরে ঝলমল-করা সরস সবুজের উপর সোনা-গলানো রৌদ্রের মধ্যে মনে পড়িতেছে, দক্ষিণের বারান্দায় গান বাঁধিয়া তাহাতে যোগিয়া সুর লাগাইয়া গুন্‌ গুন্‌ করিয়া গাহিয়া বেড়াইতেছি—সেই শরতের সকালবেলায়।
আজি   শরততপনে প্রভাতস্বপনে
            কী জানি পরান কী যে চায়।’
উপরের এই গানটির রচনাকাল আশ্বিন, ১৮৮৬, অর্থাৎ সেই ‘তখনকার’ সময় কবির বয়স ২৫। শিশুকালের বর্ষা-প্রকৃতির উৎসবের মধ্যে মগ্ন হয়ে থাকা কবি যৌবনের শরতে এসে চিনতে শিখে গিয়েছেন মানুষের উৎসব। তিনি তখন মানুষে মানুষে সংযুক্ত থাকার উৎসব খুঁজে পেয়েছেন শরত-ঋতুর আলোতে। বলেছেন, ‘আমার কবিতা এখন মানুষের দ্বারে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে।’
কবি মানুষের জন্যই লিখেছেন। মাতৃভূমির মধ্যে দেবী দুর্গার রূপকল্পনায় লিখেছিলেন ‘অয়ি ভুবনমনমোহিনী’। হ্যাঁ, যদিও সে লেখা ফরমায়েশি লেখা ছিল। পরাধীন ভারতে দেশমাতৃকার প্রতি ভক্তিভাব জাগরিত করে মানুষকে একত্রিত করবার ব্রতের জন্য হেমচন্দ্র মল্লিক ও বিপিন পালের অনুরোধে লিখেছিলেন এই গান। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল বলেই নিজে পৌত্তলিক না হয়েও মাতৃ-আরাধনার একাধিক গান লিখেছিলেন তিনি।
উৎসবের কথা যেমন লিখেছেন, ভুলে যান নি উৎসব শেষের ভাঙ্গা হাটের কথাও। লিখছেন, ‘মাটির কন্যার আগমনী গান এই তো সেদিন বাজিল। মেঘের নন্দীভৃঙ্গী শিঙা বাজাইতে বাজাইতে গৌরী শারদাকে এই কিছু দিন হইল ধরা-জননীর কোলে রাখিয়া গেছে। কিন্তু বিজয়ার গান বাজিতে আর তো দেরি নাই ; শ্মশানবাসী পাগলটা এল বলিয়া — তাকে তো ফিরাইয়া দিবার জো নাই ; হাসির চন্দ্রকলা তার ললাটে লাগিয়া আছে কিন্তু তার জটায় জটায় কান্নার মন্দাকিনী।’ শেষ দুটি লাইনে শিবের রূপবর্ণনায় হাসি-কান্নার সহাবস্থান ঠিক যেন শরতের রৌদ্রছায়ার খেলার মত। উৎসবের সমারোহের মধ্যে পূর্ণতার পরবর্তী এই স্বপ্নভঙ্গ একজন কবির পক্ষেই দেখা সম্ভব। কারণ তিনি তার যাদুকলমে বন্দী করে রাখেন সেই স্বপ্নগুলো এবং তার ভাষায় মানুষের চোখে পরিয়ে দেন সেই স্বপ্নের মায়াকাজল।     

      


কবিতা / আগমণী / অনুপম দাশশর্মা


বখাটে মেঘেরা শান্ত, নদীর ধারে
ছেয়ে গেছে সাদা মাথার কাশফুল
রঙিন পশরায় ভরেছে দোকানের মুখ।
ভুলচুক যা কিছু ঘটেছে বর্ষার আক্রোশে
তা সব নরম রোদের সামিয়ানায়
সেঁকে নিচ্ছে আর্দ্রতা।

খোয়াইয়ের ধারে ধারে দেহাতি আহ্লাদ
বাঁধান মলাটের ভাঁজে জেগে
উঠেছে অক্ষরের পাঠশালা।

উপলক্ষের হাত ধরে বাঙালির ঘরে ঘরে 
বেজে উঠেছে আগমণীর সুর
সেরে উঠুক আহত মন
ঢাকের আওয়াজে গোটা বাংলা 
নিজেকেই আনন্দে ভাসাতে পারছে যখন।

প্রতিশোধ মধুরতর / -দূর্বা মিত্র






ইন্সপেক্টর সৌমাভ সান্যাল এগিয়ে আসেন রকিং চেয়ার এ বসে থাকা প্রস্তরমূর্তির দিকে, "চলুন ম্যাডাম,রাতটা আমাদের সাথেই কাটাবার অভ্যেস করুন আজকে থেকে | জরুরি দরকারি 
জিনিস একটা ব্যাগে নিতে পারেন - তবে কোনোরকম ইলেকট্রনিক গ্যাজেট নেয়া চলবে না | আশা করি পালাবার চেষ্টা করবেন না - তাই হাতকড়া লাগাচ্ছি না |"
সাদা শাড়ি আর সাদা চুলের দীর্ঘ ও ঋজু চেহারা সোজা উঠে দাঁড়ায় কেদারা ছেড়ে -" হাতকড়া লাগবে না ; ব্যাগ ও লাগবে না | চলুন আপনার জীপ্ এ |"
সৌমাভ বেরিয়ে যেতে যেতে অফিসারদের নির্দেশ দিয়ে যায় বাড়ি লক করতে |
মৃতদেহ আগেই সরানো হয়েছে মর্গে | ডাক্তার ডিক্টাফোন এ বলে যান - নারী শরীর, বয়েস ৩০+, কোনো দাগ নেই শরীরে, মৃত্যু এক বিষের প্রক্রিয়ায় |
সুতনুকা মিত্র কেই তুলে এনেছিল সৌমাভ | মৃতা লহরী সাহা - নর্তকী ও অভিনেত্রী - ওনার বাড়িতে এসেছিলো |
সুতনুকা দেখা মাত্র চিনতে পারেন অতীতের লতা সাহা কে | ওই বস্তির মেয়ের প্রেমে পড়ে ওনার একমাত্র ডাক্তারি পড়া ছেলে সৌজন্য | লতা ওর গায়ে লুটিয়ে পড়লেও তলায় তলায় চেষ্টা চালাতো বোম্বে যাবার | গেলো ও তাই - সৌজন্যের টাকা , ল্যাপটপ, ঘড়ি, মোবাইলচুরি করে |
সেসব কিনে দেয়া যেত | সুতনুকা বোটানি পড়ান - স্বামী প্রবর্তক নামী উকিল |
দরকার হলো না - পরের দিন সৌজন্য হাতের শিরা কেটে ফেললো | মর্গ থেকে বডি আনতে গিয়ে প্রবর্তক বাবুর সেরিব্রাল এটাক হলো | দুজনকেই পিস হ্যাভেন থেকে কেওড়াতলা নিয়ে গেলেন সুতনুকা - একসাথে !
লতাকে  খুঁজতে চেষ্টা করেছিলেন  - পান নি | বাড়িও বদলেছেন - নিজেও বদলেছেন | লতা শুধু নাম বদলেছে - সাথে উগ্র ফ্যাশন | ওনার বাড়িতে লতা পা রাখতেই ঘুমিয়ে থাকা মা আর স্ত্রী মেডুসা রূপ ধারণ করলো | সৌজন্যের পড়ার টেবিল থেকে তুলে আনলেন একটা সিরিঞ্জ - লহরী বসে পত্রিকা পড়ছিলো | ঘাড়ের পেছনে সিরিঞ্জ বিঁধিয়ে দেন - ভেতরে ভরা ছিল অর্ধেক ফিনাইল আর অর্ধেক হাওয়া |
শান্ত সুতনুকা থানা তে ফোনটাও নিজেই করেছিলেন - নাম ঠিকানা দিয়ে |
কঠিন ধাতুর সৌমাভ ও চোখের কোন টা মুছে নিলো ফাইল লেখা শেষ করে - নিজের বিধবা মায়ের মুখ ভেসে ওঠে সামনে |
মনে মনে বলে ওঠে ,'REVENGE IS SWEETER WHEN IT IS SERVED COLD.'


সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া

সম্পাদকীয় ও চিত্রাঙ্কন-গৌতম সেন ... সম্পাদনা ও কারিগরী সহায়তা - নূপুর বড়ুয়া